জাতীয় স্বার্থ বনাম বিদেশি অপারেটর: চট্টগ্রাম বন্দর ঘিরে তীব্র বিতর্ক ও শ্রমিক আন্দোলন
বিতর্কের মূল কেন্দ্রবিন্দু: কোন টার্মিনালগুলো ঝুঁকিতে?
সাম্প্রতিক প্রকাশিত সংবাদগুলো থেকে স্পষ্ট, সরকার চট্টগ্রাম বন্দরের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনাল পরিচালনার জন্য আন্তর্জাতিক অপারেটরদের সঙ্গে চুক্তির প্রক্রিয়া প্রায় চূড়ান্ত করে ফেলেছে। এর মধ্যে প্রধানত রয়েছে:
নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি):
এটি একটি চালু এবং অত্যন্ত লাভজনক টার্মিনাল। অভিযোগ উঠেছে যে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের ডিপি ওয়ার্ল্ড-এর কাছে এটি বিনা দরপত্রে হস্তান্তরের উদ্যোগ চলছে।
লালদিয়ার চর কনটেইনার টার্মিনাল:
এই নতুন টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্ব ৩৩ বছরের জন্য ডেনমার্কের এপিএম টার্মিনালস-এর হাতে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। এর নির্মাণে এপিএম প্রায় ৫৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করবে। উপদেষ্টা কমিটির সভায় এর অনুমোদনও হয়ে গেছে।
পানগাঁও নৌ টার্মিনাল:
কেরানীগঞ্জের এই টার্মিনালটিও সুইজারল্যান্ডের মেডলগ এসএ-এর হাতে তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
অন্যান্য টার্মিনাল:
এর পাশাপাশি বে-টার্মিনাল ও মোংলা বন্দরের কিছু অংশও বিদেশিদের হাতে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
আন্দোলনের আগুন: শ্রমিকদের কঠোর হুঁশিয়ারি
বিদেশি সংস্থার কাছে টার্মিনাল হস্তান্তরের প্রতিবাদে শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ), চট্টগ্রাম কঠোর আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। ১৫ নভেম্বর চট্টগ্রামে বিশাল মশাল মিছিল করেছে শ্রমিকরা। তাদের মূল দাবি হলো: বন্দরকে কোনোভাবেই বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়া যাবে না।
হুঁশিয়ারি: স্কপ নেতারা স্পষ্ট জানিয়েছেন, এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন না হলে তারা হরতাল-অবরোধের মতো কঠোর কর্মসূচিতে যাবেন। ২২ নভেম্বর চট্টগ্রামে শ্রমিক কনভেনশন আয়োজনের ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে।
শ্রমিক ছাঁটাইয়ের আশঙ্কা: শ্রমিকদের প্রধান উদ্বেগের একটি হলো, বিদেশি কোম্পানি পরিচালনার দায়িত্ব নিলে সেখানে দেশীয় কর্মীদের ছাঁটাই করা হতে পারে।
প্রশ্নবিদ্ধ বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত: রাজস্ব ও মাশুল বৃদ্ধি
এই বিতর্কের মধ্যে একটি বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে বন্দরের মাশুল (ট্যারিফ) বৃদ্ধি নিয়ে। সরকার সম্প্রতি বন্দর ব্যবহারে ৪১ শতাংশ পর্যন্ত মাশুল বৃদ্ধি করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। এ নিয়ে ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা ঘোর আপত্তি জানিয়েছেন।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ: চট্টগ্রাম পোর্ট ইউজার্স ফোরামসহ ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, লাভজনক বন্দরকে আরও লাভজনক করার বদলে হঠাৎ করে এই মাশুল বৃদ্ধি করা হয়েছে বিদেশি অপারেটরদের বাড়তি সুবিধা দেওয়ার জন্য। তাদের বক্তব্য, বিদেশি কোম্পানিকে আকর্ষণ করতেই এই পদক্ষেপ।
অর্থনীতিবিদদের উদ্বেগ: অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ-এর মতো অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ৪১ শতাংশ মাশুল বৃদ্ধির কোনো যুক্তি নেই। এর ফলে আমদানি ও রপ্তানি পণ্যের দাম বাড়বে, যা মুদ্রাস্ফীতি আরও বাড়িয়ে দেবে এবং দেশের অর্থনীতির সক্ষমতা কমাবে।
জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও সক্ষমতার প্রশ্ন
বন্দরকে বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার পক্ষে সরকারি মহল থেকে বন্দরের আধুনিকায়ন, বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির যুক্তি দেখানো হলেও সমালোচকরা তা মানতে নারাজ।
লাভজনক প্রতিষ্ঠান:
বিগত কয়েক বছরে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় করেছে এবং বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে নিজস্ব অর্থায়নে হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে চট্টগ্রাম বন্দর ৪,৪৩৮ কোটি টাকা আয় করেছে। প্রশ্ন উঠেছে, যদি দেশি অপারেটররা (যেমন সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেড) দক্ষতার সঙ্গে বন্দরের ৬০ শতাংশ কনটেইনার হ্যান্ডলিং করতে পারে, তাহলে একটি চালু ও লাভজনক টার্মিনাল কেন বিনা দরপত্রে বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়া হবে?
অস্বচ্ছ চুক্তির ঝুঁকি:
সমালোচকরা বলছেন, জনমত উপেক্ষা করে দ্রুততার সঙ্গে এই চুক্তিগুলো সম্পন্ন করার চেষ্টা চলছে। আদানির মতো অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় চুক্তি হচ্ছে কি না, সেই আশঙ্কাও প্রকাশ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে এরকম চুক্তিতে 'টেক অর পে' cláusula (অর্থাৎ নির্দিষ্ট পরিমাণ কার্গো না এলেও রাষ্ট্রকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে) থাকার ঝুঁকি থাকে, যা শ্রীলঙ্কা বা কেনিয়ার মতো দেশকে বিপদে ফেলেছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের এখতিয়ার:
রাজনৈতিক ও পেশাজীবী সংগঠনগুলো প্রশ্ন তুলেছে—একটি অন্তর্বর্তী সরকারের কি এত বড় জাতীয় অর্থনৈতিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদী সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার আছে? তারা মনে করেন, এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত একটি নির্বাচিত সরকারের।
জাতীয় স্বার্থ অগ্রাধিকার পাক
চট্টগ্রাম বন্দর শুধু একটি বাণিজ্যিক কেন্দ্র নয়, এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ এবং জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রতীক। বন্দরের টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশি সংস্থার হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত দেশের অর্থনীতিতে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে। সরকার যদি সত্যিই বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে চায়, তবে দেশীয় সক্ষমতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের প্রয়োজন থাকলেও, তা অবশ্যই হতে হবে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে, যেখানে জাতীয় স্বার্থ, দেশীয় শ্রমিকদের নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্বাধীনতা সর্বাধিক গুরুত্ব পাবে। শ্রমিকদের কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে—জনমতকে উপেক্ষা করে এই ধরনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হলে দেশে চরম অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। এই জটিল পরিস্থিতিতে সরকারের উচিত সবপক্ষের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে একটি স্বচ্ছ ও জাতীয় স্বার্থবান্ধব সমাধান খুঁজে বের করা।
এই ব্যাপারে আপনার মতামত কী, তা কমেন্টে লিখে জানান।

মন্তব্যসমূহ