সংবিধান সংস্কার বিতর্ক: জনগণের মতামতের ভিত্তিতেই হোক মৌলিক পরিবর্তন

ব্যাঙেরছাতা

২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান (?) এর পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে রাষ্ট্র ও সংবিধান সংস্কারের বিষয়টি এক নতুন মাত্রা পেয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হওয়ার পর থেকেই এই আলোচনা জোরদার হয়েছে যে, গত পাঁচ দশকে সংবিধানের বারবার সংশোধনের কারণে যে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা সৃষ্টি হয়েছে, তা দূর করতে মৌলিক সংস্কার অপরিহার্য। এই পটভূমিতে, দেশের সংবিধান প্রণেতাদের অন্যতম ড. কামাল হোসেন জাতীয় প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত এক আলোচনা সভায় যে বার্তা দিয়েছেন, তা এই সংবেদনশীল বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে। তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল স্পষ্ট: সংবিধান সংস্কার অবশ্যই জনগণের মতামতের ভিত্তিতে পরিচালিত হওয়া উচিত এবং কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী এককভাবে তা পরিবর্তন করার অধিকার রাখে না। অন্যান্য জাতীয় দৈনিক ও সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত এই সম্পর্কিত সংবাদগুলো বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, সংবিধান সংস্কারের প্রক্রিয়া এবং এর মাত্রার ওপর একটি গভীর জাতীয় ঐকমত্য জরুরি, যা অর্জন করা বর্তমান পরিস্থিতিতে একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

ড. কামাল হোসেনের অবস্থান: সংবিধান ধ্বংস নয়, সংস্কার হোক জনগণের ইচ্ছায়

গত ০৬ নভেম্বর, ২০২৫ তারিখে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, গণফোরামের ইমেরিটাস সভাপতি ড. কামাল হোসেন সংবিধানকে 'রাষ্ট্র পরিচালনার দলিল' এবং 'স্বাধীন বাংলাদেশের ভিত্তি' হিসেবে উল্লেখ করেছেন, যা ৩০ লাখ শহীদের রক্ত ও জাতির ঐক্যের ফসল। বিগত ৫৩ বছরে সংবিধানে অসংখ্য পরিবর্তন এলেও, তিনি এই পরিবর্তনের দায়ভার শুধু সংবিধানের ওপর চাপানোর বিরোধী। তাঁর মতে, সরকারের স্বৈরতান্ত্রিক আচরণ এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে গণতন্ত্রের চর্চার অভাবই মূল সমস্যা। তাই, তিনি বর্তমান সংবিধানকে সম্পূর্ণভাবে বাতিল করে নতুন সংবিধান রচনার ধারণাকে 'ভুল' এবং 'সংবিধানকে ধ্বংস করার একটি পথ' বলে আখ্যায়িত করেছেন।

ড. কামাল হোসেন জোর দিয়েছেন যে, সংবিধান সংস্কার একটি সংবেদনশীল বিষয় এবং এটি অবশ্যই জনগণের ইচ্ছা ও মৌলিক মূল্যবোধের প্রতিফলন ঘটাতে হবে। তিনি দলীয়করণের ফলে জন–আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হওয়া সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারকে জরুরি বলে মনে করেন। তাঁর মতে, এই বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা না গেলে বাংলাদেশে গণতন্ত্র কখনোই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করবে না।

ড. কামাল হোসেনের এই বক্তব্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ তিনি সংবিধানের একজন প্রণেতা হিসেবে এর মূল চেতনাকে অক্ষুণ্ন রেখে সংস্কারের পক্ষে মত দিয়েছেন। এটি সংবিধান পুনর্লিখন বা নতুন সংবিধান রচনার পক্ষে যারা মত দিচ্ছেন, তাদের থেকে একটি পরিষ্কার ভিন্ন অবস্থান।

অন্যান্য সংবাদে সংস্কারের বহুমাত্রিক বিতর্ক

ড. কামাল হোসেনের বক্তব্যের পাশাপাশি অন্যান্য পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদগুলো সংবিধান সংস্কার নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে চলমান বিতর্কের গভীরতা তুলে ধরে।

অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ইতিমধ্যেই সংবিধান সংস্কার কমিশন (CRC) গঠন করেছে, যা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ পেশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতা হ্রাস, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, এবং জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিল (NCC) গঠনের প্রস্তাব। কমিশনের সুপারিশে গণভোটের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনী পাসের প্রস্তাবও রয়েছে। এমনকি, কোনো কোনো মহল থেকে সংবিধানের মূল নীতি, যেমন ধর্মনিরপেক্ষতা বাদ দেওয়ার সুপারিশের খবরও এসেছে (আনন্দবাজার)।

এই সংস্কারের পদ্ধতি ও মাত্রা নিয়ে দেশে তীব্র মতপার্থক্য রয়েছে।

নতুন সংবিধানের পক্ষে: কেউ কেউ মনে করছেন, 'জোড়াতালি দিয়ে যদি সংবিধান সংশোধন' করা হয়, তবে স্বৈরতন্ত্র রোধ করা সম্ভব হবে না। তাদের দাবি, মৌলিক পরিবর্তন অপরিহার্য।

সংশোধনের পক্ষে: ড. কামাল হোসেনের মতো অনেকে মনে করেন, যেহেতু ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নতুন দেশ গঠিত হয়নি, তাই সংবিধানের আমূল পুনর্লিখন অপ্রয়োজনীয় ও অযৌক্তিক। তাদের মতে, ব্যাপক পরামর্শ ও জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে কেবল প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনা যেতে পারে। গণফোরামের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সুব্রত চৌধুরীও সংস্কারের বিষয়গুলো একটি নির্বাচিত জাতীয় সংসদের ওপর ছেড়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন, যা সংসদ ছাড়া এই ধরনের মৌলিক পরিবর্তনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

রাজনৈতিক দলগুলোর ভিন্নমত: বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্ক্সবাদী)-এর মতো রাজনৈতিক দলগুলো সংবিধান সংস্কার কমিশন এবং নাগরিক সমাজের খসড়া প্রস্তাবগুলোর কিছু অংশের সঙ্গে একমত হলেও, সেগুলোকে অনেক ক্ষেত্রে 'অসম্পূর্ণ, ভুল এবং খানিকটা বিভ্রান্তিকর' বলে মন্তব্য করেছে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, সংস্কার নিয়ে সর্বদলীয় ঐক্য এখনও সুদূর পরাহত।

জাতীয় ঐক্যের অনুপস্থিতি ও সংস্কারের পদ্ধতিগত চ্যালেঞ্জ

সংবিধান সংস্কারের আলোচনায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এর পদ্ধতিগত বৈধতা এবং জাতীয় ঐক্যের অভাব। সংবিধানের ব্যাপক সংশোধনী পাস করার জন্য জাতীয় সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমানে সংসদ বিলুপ্ত থাকায়, প্রস্তাবিত সংশোধনী বা নতুন সংবিধানের বৈধতা কীভাবে নিশ্চিত হবে, তা একটি বড় প্রশ্ন (প্রথম আলো)। গণপরিষদ (Constituent Assembly) নির্বাচন একটি উপায় হতে পারে বলে কেউ কেউ মত দিয়েছেন।

দ্বিতীয়ত, জনগণের মতামতের প্রতিফলনের বিষয়টি। ড. কামাল হোসেন যে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন চেয়েছেন, তা বাস্তবায়নে গণভোট একটি উপায় হলেও, তার আগেও প্রয়োজন রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ এবং সমাজের সকল স্তরের মানুষের মধ্যে ব্যাপক সংলাপ ও সদিচ্ছা। সংস্কারের প্রক্রিয়া যদি কেবল একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর বা অন্তর্বর্তী সরকারের ইচ্ছার প্রতিফলন হয়, তবে তা দেশের দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। সুব্রত চৌধুরীর অভিযোগ যে ছাত্র আন্দোলনকে 'তৃতীয় শক্তি' বানিয়ে বিপথগামী করা হয়েছে এবং তারা এখন 'নিয়োগ-বাণিজ্য' করছে—এটিও সংস্কার প্রক্রিয়া নিয়ে মানুষের আস্থার সংকটকে আরও গভীর করে।

বাংলাদেশের সংবিধান সংস্কারের ঐতিহাসিক মুহূর্তে ড. কামাল হোসেনের সতর্কবাণী অত্যন্ত জরুরি। সংবিধান আমাদের জাতিসত্তার প্রতীক, একে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীগত স্বার্থে ব্যবহারের সুযোগ থাকা উচিত নয়। সংস্কার জরুরি, কিন্তু তা হতে হবে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে, জনগণের মতামতের ভিত্তিতে এবং জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। সংবিধানের মূল কাঠামোকে অক্ষুণ্ণ রেখে, দলীয়করণের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা ফিরিয়ে আনতে এবং নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করতে সংস্কার আনা যেতে পারে। এই সংবেদনশীল বিষয়ে কোনো প্রকার তাড়াহুড়ো বা একতরফা সিদ্ধান্ত জাতির জন্য বয়ে আনতে পারে নতুন সংকট। তাই, জাতীয় ঐক্যই হোক সংবিধান সংস্কারের মূল চালিকাশক্তি।

মন্তব্যসমূহ