মহাসড়কের 'অন্ধকার বাণিজ্য': কড়া নজরদারির জালে চাঁদাবাজি ও অবৈধ সিন্ডিকেট
অর্থনীতির লাইফলাইনে বিষাক্ত কালো ছায়া
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সড়ক-মহাসড়কগুলো কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এগুলো দেশের 'লাইফলাইন'। দেশের অভ্যন্তরে পণ্য ও যাত্রী পরিবহনের প্রায় ৯০ শতাংশ নির্ভর করে এই সড়কপথগুলোর ওপর। কিন্তু সাম্প্রতিককালে এই গুরুত্বপূর্ণ করিডোরগুলো এক ভয়াবহ 'অন্ধকার বাণিজ্য'-এর শিকার। এই অন্ধকার বাণিজ্য বলতে বোঝানো হচ্ছে—মহাসড়কে বেপরোয়া চাঁদাবাজি, অবৈধ টোল আদায়, নিষিদ্ধ যানবাহন চলাচলের সুযোগ সৃষ্টি এবং পরিবহন খাতে জেঁকে বসা এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট, যার প্রমাণ এখন কর্তৃপক্ষের হাতে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে এবং ভুক্তভোগীদের অভিযোগের ভিত্তিতে এই অবৈধ কারবারের ভয়াবহ চিত্র উঠে আসার পর, পুলিশ ও অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থা নড়েচড়ে বসেছে। মহাসড়ক নিরাপদ ও শৃঙ্খলিত রাখতে শুরু হয়েছে কড়া নজরদারি ও শুদ্ধি অভিযান।
মহাসড়কের অন্ধকার বাণিজ্যের স্বরূপ: কীভাবে চলে এই অবৈধ কারবার?
বাংলাদেশের সড়ক-মহাসড়কগুলো যেন একটি সুসংগঠিত চাঁদাবাজির রুট। দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পণ্য পরিবহনের সময় একটি ট্রাককে ন্যূনতম ১৫ থেকে ২০টি পয়েন্টে চাঁদা দিতে হয়। এই 'চাঁদার রেট' পথের দূরত্ব এবং পণ্যের ধরনের ওপর নির্ভর করে।
০১. চাঁদাবাজির 'রেট চার্ট' ও ভুক্তভোগীর অভিজ্ঞতা
ট্রাকচালকরা বলছেন, নওগাঁ থেকে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে সবজি নিয়ে আসতে একটি ট্রাকে ন্যূনতম ২,৭৫০ থেকে ৩,০০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি 'চাঁদা' গুনতে হয়। এই টাকা সরাসরি কোনো রসিদ বা সরকারি টোলের মাধ্যমে নেওয়া হয় না; এটি একটি অঘোষিত 'মাসোহারা', যা হাইওয়ে পুলিশ, ট্রাফিক পুলিশ, শ্রমিক-মালিক সংগঠনের নেতা এবং কিছু রাজনৈতিক দলের নাম ভাঙিয়ে তোলা হয়।
পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি: এই অবৈধ চাঁদার কারণে স্বাভাবিকভাবেই পণ্যের পরিবহন ব্যয় বেড়ে যায়। যেমন, তিন টনের একটি ট্রাক থেকে মেহেরপুর থেকে কারওয়ান বাজার পর্যন্ত প্রায় ৩,০০০ টাকা চাঁদা আদায় হলে, এর সরাসরি প্রভাব পড়ে ভোক্তা পর্যায়ে। অর্থাৎ, চাঁদার টাকা যোগ হয়ে যায় পণ্যের চূড়ান্ত দামে।
চাঁদাবাজির শিকার: ভুক্তভোগী ১৩ জন ট্রাকচালকের সাক্ষ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন শুধু সবজির ট্রাক থেকেই লাখ লাখ টাকা অবৈধভাবে চাঁদাবাজি হচ্ছে, যার একটি বড় অংশ যাচ্ছে অসাধু পুলিশ সদস্য এবং রাজনৈতিক প্রশ্রয়প্রাপ্ত সিন্ডিকেটের পকেটে।
০২. চাঁদাবাজির সিন্ডিকেট ও জড়িত পক্ষসমূহ
এই অন্ধকার বাণিজ্যের মূল হোতারা একটি শক্তিশালী ত্রিমুখী সিন্ডিকেট:
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাংশ: বিশেষ করে হাইওয়ে পুলিশের কিছু অসাধু সদস্যের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির সুস্পষ্ট প্রমাণ মিলেছে। উদাহরণস্বরূপ, অবৈধ পণ্য পরিবহনের অভিযোগ তুলে ৮০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলের খাঁটিহাতা হাইওয়ে থানার ওসিসহ ছয় পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়।
রাজনৈতিক ও স্থানীয় প্রভাবশালী: স্থানীয় রাজনৈতিক দলের কিছু নেতাকর্মী এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিরা এই চাঁদাবাজির শেল্টারদাতা হিসেবে কাজ করেন। তাদের ছত্রছায়ায় টার্মিনাল, বাসস্ট্যান্ড ও গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে নিয়মিত মাসোহারা আদায় হয়।
শ্রমিক-মালিক সংগঠনের নাম ভাঙিয়ে চাঁদাবাজি: বিভিন্ন শ্রমিক ও মালিক সংগঠনের নাম ব্যবহার করেও বহু পয়েন্টে চাঁদা তোলা হয়, যা পরিবহন শ্রমিকদের বৈধ কল্যাণ তহবিলের বিপরীতে ব্যক্তিগত পকেটে যায়।
শুরু হলো 'কড়া নজরদারি': শুদ্ধি অভিযানের গুরুত্ব
মহাসড়কের এই লাগামহীন বিশৃঙ্খলার পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ সদর দপ্তর এবং হাইওয়ে পুলিশ কঠোর অবস্থান নিয়েছে। মহাসড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে এবং চাঁদাবাজির লাগাম টানতে শুরু হয়েছে বিশেষ নজরদারি।
হাইওয়ে পুলিশের ওপর গোয়েন্দা নজরদারি
স্বয়ং হাইওয়ে পুলিশের অভ্যন্তরেই শুদ্ধি অভিযান শুরু হয়েছে। চাঁদাবাজি ও নানা অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তিন শতাধিক হাইওয়ে পুলিশ সদস্যের ওপর গোয়েন্দা নজরদারি চলছে। ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের তথ্যকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে অভিযুক্তদের চিহ্নিত করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি, কিছু রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের ওপরও নজরদারি চলছে, যারা এই অবৈধ চাঁদাবাজিতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত।
পুলিশ সদর দপ্তরের ৬ দফা নির্দেশনা
পুলিশের ভাবমূর্তি রক্ষায় এবং কার্যক্রমে স্বচ্ছতা আনতে হাইওয়ে পুলিশের জন্য নিম্নলিখিত ৬ দফা নির্দেশনা জারি করা হয়েছে:
বডিওর্ন ক্যামেরা ব্যবহার: ডিউটি চলাকালে হাইওয়ে পুলিশের কাছে থাকা বডিওর্ন ক্যামেরা সার্বক্ষণিক চালু রাখতে হবে, যেন প্রতিটি কার্যকলাপের স্বচ্ছতা বজায় থাকে।
অযথা চেকপোস্ট নিষিদ্ধ: দিনের বেলা হাইওয়েতে অযথা কোনো চেকপোস্ট বসানো যাবে না।
নিরাপদ স্থানে কাগজপত্র চেক: দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যকে অবশ্যই ইউনিফর্মে রাস্তার পাশে নিরাপদ স্থানে দাঁড়িয়ে কাগজপত্র চেক করতে হবে।
পিকআপ বা ভ্যানে চেক করা নিষিদ্ধ: কোনো অবস্থাতেই কাগজপত্র নিয়ে পুলিশ ভ্যান বা পিকআপে বসে চেক করা যাবে না।
জনগণের সাথে সম্মানজনক আচরণ: পরিবহন চালক, যাত্রী ও সাধারণ জনগণের সাথে সম্মানজনক ও পেশাদার আচরণ করতে হবে।
দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ: চাঁদাবাজি বা অন্যান্য অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে হবে।
এই নির্দেশনাগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে মহাসড়কে পুলিশের কার্যক্রমে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে বলে আশা করা যায়।
অন্যান্য অবৈধ কর্মকাণ্ড: মহাসড়ককে মৃত্যুফাঁদে পরিণত করা
চাঁদাবাজির পাশাপাশি মহাসড়কে আরও দুটি গুরুতর সমস্যা বিদ্যমান, যা সড়ক নিরাপত্তাকে চরম ঝুঁকিতে ফেলছে:
০১. নিষিদ্ধ থ্রি-হুইলারের অবাধ চলাচল
আইন অনুযায়ী ঢাকা-চট্টগ্রাম বা ঢাকা-সিলেট-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কগুলোতে সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত রিকশা, নসিমন, করিমন-এর মতো তিন চাকার যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কিন্তু কিছু অসাধু চক্রের যোগসাজশে ও চাঁদাবাজির বিনিময়ে এই নিষিদ্ধ যানবাহনগুলো হাইওয়ে পুলিশের চোখের সামনেই অবাধে চলাচল করছে।
ভয়াবহ পরিণতি: এই ধীরগতির যানবাহনগুলো দ্রুতগতির বাস ও ট্রাকের সাথে পাল্লা দিতে গিয়ে প্রায় প্রতিদিনই দুর্ঘটনার জন্ম দিচ্ছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মিরসরাই থেকে সিটি গেট পর্যন্ত এলাকায় এই কারণে বহু মূল্যবান প্রাণহানি ঘটছে, যা মহাসড়ককে কার্যত 'মৃত্যুফাঁদে' পরিণত করেছে।
০২. সড়ক ও ফুটপাত দখল করে অবৈধ বাণিজ্য
মহাসড়কের পাশে থাকা বাজার, বাসস্ট্যান্ড ও পৌরসভার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টের সড়ক ও ফুটপাত দখল করে চলছে রমরমা অবৈধ বাণিজ্য। শায়েস্তাগঞ্জ, কালিয়াকৈরের মতো অনেক এলাকায় দেখা যায়, প্রভাবশালীরা দোকানপাট বসিয়ে, বাজারের মালামাল রেখে বা অবৈধ যানবাহনের স্টেশন বানিয়ে সড়ক সংকুচিত করে ফেলেছে।
তীব্র যানজট ও দুর্ভোগ: এই দখলদারির ফলে নিয়মিতভাবে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে এবং পথচারীরা বাধ্য হয়ে মূল হাইওয়ে দিয়ে হাঁটছেন, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। এক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসন, এমনকি পুলিশও অনেক সময় নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে বলে অভিযোগ রয়েছে।
করণীয় ও প্রত্যাশা: শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার পথ
মহাসড়কের এই 'অন্ধকার বাণিজ্য' বন্ধ করা এবং শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া, যার জন্য প্রয়োজন 'জিরো টলারেন্স' নীতি।
প্রযুক্তিগত সমাধান: বডিওর্ন ক্যামেরা চালুর পাশাপাশি, মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা (CCTV) স্থাপন করে কেন্দ্রীয়ভাবে নজরদারি বাড়াতে হবে। (এই সংক্রান্ত নজরদারির চিত্র যোগ করা যেতে পারে: )
আইনের কঠোর প্রয়োগ: চাঁদাবাজিতে জড়িত পুলিশ সদস্য বা প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তি যেই হোক না কেন, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। শুধু প্রত্যাহার বা বদলি যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন ফৌজদারি মামলা ও কঠোর আইনি পদক্ষেপ।
পরিবহন সংগঠনের স্বচ্ছতা: পরিবহন শ্রমিক-মালিক সংগঠনগুলোর চাঁদা আদায়ের প্রক্রিয়াকে একটি বৈধ, স্বচ্ছ ও ডিজিটাল পদ্ধতির আওতায় আনতে হবে, যাতে মাসোহারার নামে ব্যক্তিগত চাঁদাবাজি বন্ধ হয়।
জনসচেতনতা ও ৯৯৯-এর ব্যবহার: সাধারণ পরিবহন চালক ও মালিকদের ৯৯৯ হটলাইনে অভিযোগ জানাতে উৎসাহিত করতে হবে। অভিযোগকারীর পরিচয় গোপন রেখে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার মাধ্যমে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে।
বাংলাদেশের সড়ক-মহাসড়কের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগটি নিঃসন্দেহে একটি সাহসী পদক্ষেপ। কারণ, এই খাতে বিদ্যমান অনিয়ম ও চাঁদাবাজি কেবল আর্থিক ক্ষতি নয়, এটি সড়ক দুর্ঘটনা বৃদ্ধির একটি অন্যতম কারণ এবং সামগ্রিকভাবে দেশের আইনশৃঙ্খলার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই 'কড়া নজরদারি' কি কেবল সাময়িক উদ্যোগ নাকি এটি একটি টেকসই পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে?
কর্তৃপক্ষের এই কঠোর পদক্ষেপের মাধ্যমে এটাই প্রত্যাশিত যে, দেশের অর্থনীতির লাইফলাইন অর্থাৎ সড়ক-মহাসড়কগুলো আবার নিরাপদ, শৃঙ্খলিত ও চাঁদামুক্ত হবে। প্রতিটি পরিবহন যেন কোনো বাধা বা অন্যায় চাঁদা ছাড়া গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে, সেই লক্ষ্যেই এই 'অন্ধকার বাণিজ্যের' মূলোৎপাটন করা জরুরি।

মন্তব্যসমূহ