‘জুলাই সনদ’ ও গণভোট: সংবিধানের কাঠামোর ওপর এক চরম আঘাত

ব্যাঙেরছাতা

দেশের চলমান রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও একটি জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নে গণভোটের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর উপর এক চরম আঘাত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা পরিবর্তনকে ন্যায্যতা দেওয়ার একটি চেষ্টা হিসেবে ‘জুলাই সনদ’ প্রণীত হলেও, এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া এবং আনুষঙ্গিক গণভোটের উদ্যোগ দেশের সর্বোচ্চ আইন, অর্থাৎ সংবিধানের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। এটি কেবল একটি আইনি দুর্বলতা নয়, বরং একটি অসাংবিধানিক পথে রাষ্ট্রের মৌলিক চরিত্র পরিবর্তনের এক বিপজ্জনক ইঙ্গিত।

সংবিধানের সার্বভৌমত্ব বনাম ‘জুলাই সনদের’ ক্ষমতা

বাংলাদেশের সংবিধান রাষ্ট্রের ভিত্তি ও সর্বোচ্চ আইন। সংবিধানের ৭(১) অনুচ্ছেদ স্পষ্টভাবে ঘোষণা করে: “প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার উৎস জনগণ এবং তাহাদের পক্ষে এই সংবিধানের আওতাধীনে ও কর্তৃত্বে কেবল এই সংবিধানের বিধানাবলী অনুসারে প্রযুক্ত হইবে।”

কিন্তু, ‘জুলাই সনদ’ নামে যে দলিলটি স্বাক্ষরিত হয়েছে, তা সংবিধানের বাইরে, শুধুমাত্র কিছু রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে তৈরি একটি রাজনৈতিক অঙ্গীকারপত্র। এটিকে সাংবিধানিক বৈধতা দিতে একটি ‘আদেশ’ জারির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, যা বিদ্যমান সংবিধানকে পাশ কাটানোর একটি অপপ্রয়াস। সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও আইনজীবীদের মতে, সংবিধান পরিবর্তন বা সংস্কারের একমাত্র প্রক্রিয়া হলো সংসদের মাধ্যমে, সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুসরণ করে। যেহেতু বর্তমানে কোনো সংসদ নেই এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ক্ষমতার একটি নির্দিষ্ট সীমারেখা রয়েছে, তাই একটি রাজনৈতিক সনদকে সরাসরি সাংবিধানিক মর্যাদা দেওয়ার কোনো আইনি ভিত্তি নেই।

ড. শাহদীন মালিকের মতো সংবিধান বিশেষজ্ঞগণ স্পষ্টত বলেছেন, জুলাই সনদের সংস্কার প্রস্তাবগুলো বিদ্যমান সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক এবং জুলাই সনদের অবস্থান সংবিধানের উপরে বা সমান্তরাল হতে পারে না। এটিকে গায়ের জোরে সাংবিধানিক বৈধতা দিতে চাওয়াটা আইনের শাসনের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

গণভোটের অপব্যবহার: অসাংবিধানিক পথে ক্ষমতা দখলের হাতিয়ার

জুলাই সনদকে বাস্তবায়ন করার জন্য যে গণভোটের প্রস্তাব করা হয়েছে, তা বাংলাদেশের বিদ্যমান আইনি কাঠামোতে সম্পূর্ণ অসাংবিধানিক ও অবৈধ।

গণভোটের বিধান বাতিল: 

সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের জন্য গণভোটের বিধান বাতিল করা হয়েছে (১৪২ অনুচ্ছেদ)। যদিও অতীতে সামরিক শাসকের অধীনে গণভোট হয়েছে, কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট সেগুলোর বৈধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। ১৯৯১ সালের গণভোট ছিল সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের মতো একটি প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক ঐকমত্যকে সাংবিধানিক রূপ দেওয়া, যা বর্তমান পরিস্থিতি থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন।

ক্ষমতার অপব্যবহার: 

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাজ হলো কেবলমাত্র একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনে সহযোগিতা করা। তাদের সাংবিধানিক সংস্কারের মতো দূরগামী ও মৌলিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া বা জনগণের উপর চাপিয়ে দেওয়ার কোনো এখতিয়ার নেই। সংবিধানে স্বীকৃত নয় এমন একটি বিষয়ে গণভোটের আয়োজন করা অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষমতার সুস্পষ্ট অপব্যবহার।

ভোটারদের বিভ্রান্তি: 

গণভোটের মাধ্যমে সাধারণত একটি একক, সুনির্দিষ্ট বিষয়ে জনগণের মতামত চাওয়া হয়। কিন্তু জুলাই সনদে সংবিধান সংশোধনের ৪৮টি প্রস্তাবসহ রাষ্ট্র পরিচালনার নানা মৌলিক বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এই বহুমুখী ও জটিল প্রস্তাবগুলোকে একটি একক প্রশ্নে গণভোটে উপস্থাপন করা ভোটারদেরকে বিভ্রান্ত করার নামান্তর। এটি জনগণের প্রকৃত ও সচেতন মতামত গ্রহণের একটি প্রক্রিয়া নয়, বরং একটি পূর্বনির্ধারিত রাজনৈতিক এজেন্ডাকে জনগণের সম্মতির মোড়কে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা মাত্র।

রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের কূটকৌশল

জামায়াতে ইসলামীর মতো বিতর্কিত রাজনৈতিক দলের গণভোটের দাবি থেকে সরে আসার আহ্বান এবং বিএনপির ধন্যবাদ জ্ঞাপন—এই সবকিছুই প্রমাণ করে যে, এই গণভোট মূলত রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের একটি কৌশল।

জামায়াত এবং তাদের সমমনারা নির্বাচনের আগে গণভোট চেয়েছে, কারণ তারা নির্বাচনের মাধ্যমে নয়, বরং একটি অসাংবিধানিক পদ্ধতির মাধ্যমে নিজেদের এজেন্ডাকে সাংবিধানিক ভিত্তি দিতে আগ্রহী। অন্যদিকে, বিএনপি একটি বৃহৎ জোটের অংশ হিসেবে গণভোটকে সমর্থন জানালেও, তাদের অসন্তোষ এবং অন্যান্য দলের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ (ভিন্নমত) এই প্রক্রিয়াটির দুর্বলতা তুলে ধরে। এটি দেখায় যে, জাতীয় ঐকমত্যের নামে যে সনদটি প্রণীত হয়েছে, তা আসলে রাজনৈতিক বিভাজনকেই আরও বাড়িয়ে তুলছে।

অসাংবিধানিক উপায়ে সনদের বাস্তবায়ন হলে, ভবিষ্যতে যেকোনো নির্বাচিত সরকার খুব সহজেই এটিকে বাতিল করে দিতে পারে, যা দেশে নতুন করে রাজনৈতিক সংকট ও দীর্ঘমেয়াদী অস্থিরতা সৃষ্টি করবে। এটি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার পরিবর্তে, রাষ্ট্রকে আরও গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দেবে।

‘জুলাই সনদ’ একটি রাজনৈতিক অঙ্গীকার হিসেবে জনগণের প্রত্যাশাকে প্রতিফলিত করতে পারে, কিন্তু এটিকে সংবিধানের ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া একটি মারাত্মক ভুল। বিদ্যমান সাংবিধানিক বিধানকে উপেক্ষা করে গণভোটের মাধ্যমে একটি রাজনৈতিক সনদকে সাংবিধানিক বৈধতা দিতে চাওয়াটা কেবল অসাংবিধানিকই নয়, এটি আইনের শাসনের পরিপন্থী এক বিপজ্জনক প্রবণতা।

রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামোকে পরিবর্তন করতে হলে, জনগণের ভোটে নির্বাচিত একটি সার্বভৌম সংসদকে দিয়েই তা করা উচিত। এই অন্তর্বর্তী সরকারের উচিত ছিল সংবিধানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করা, যার মধ্য দিয়ে গঠিত হবে নতুন সংসদ। সংবিধানের পবিত্রতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা না করে, একটি অসাংবিধানিক পথে গণভোটের আয়োজন করে রাষ্ট্রকে এক গভীর অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, যা গণতন্ত্রের জন্য শুভ নয়।

মন্তব্যসমূহ