মধ্যরাতে কেন এই 'তুলে নেওয়া'? আইনের শাসন, বাকস্বাধীনতা ও এক বিতর্কিত এনইআইআর (NEIR) প্রকল্প

ব্যাঙেরছাতা

সম্প্রতি গভীর রাতে ডিবি (গোয়েন্দা পুলিশ) পরিচয়ে একজন সাংবাদিক ও একজন ব্যবসায়িক নেতাকে তাদের বাসা থেকে তুলে নেওয়ার ঘটনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিমণ্ডলে এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। দৈনিক ভোরের কাগজের অনলাইন প্রধান মিজানুর রহমান সোহেল এবং মোবাইল বিজনেস কমিউনিটি বাংলাদেশের (MBCB) সেক্রেটারি আবু সাঈদ পিয়াস-কে মধ্যরাতে তাদের বাসা থেকে গোয়েন্দা কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। যদিও সাংবাদিক সোহেলকে কয়েক ঘণ্টা পর ছেড়ে দেওয়া হয়, তবে পুরো ঘটনাটি দেশের গণমাধ্যমের নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।

ঘটনার পটভূমি: মধ্যরাতের নীরবতা ভঙ্গ

মঙ্গলবার দিবাগত রাত প্রায় ১২টা। রাজধানীর নতুন বাড্ডার বাসায় কাজ করছিলেন সাংবাদিক মিজানুর রহমান সোহেল। হঠাৎ কলিংবেল বেজে উঠলে দরজা খুলে দেখতে পান ডিবি জ্যাকেট পরিহিত পাঁচ-ছয়জন ব্যক্তি। তারা তাকে জানায়, ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) প্রধান তার সঙ্গে কথা বলতে চান এবং "অল্প সময়ের মধ্যেই ফেরত দিয়ে যাবেন"। এই কথা বলে তাকে জোর করে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।

সাংবাদিক সোহেলের স্ত্রী সুমাইয়া সীমা এবং পরবর্তীতে প্রবাসী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়েরের ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে ঘটনাটি দ্রুত জনসমক্ষে আসে। একই রাতে মোবাইল বিজনেস কমিউনিটি বাংলাদেশের (MBCB) সেক্রেটারি আবু সাঈদ পিয়াসকেও তার মিরপুরের বাসা থেকে তুলে নেওয়া হয়।

ডিবি হেফাজতে অভিজ্ঞতা

দীর্ঘ প্রায় সাড়ে ১০ ঘণ্টা ডিবি হেফাজতে থাকার পর সাংবাদিক মিজানুর রহমান সোহেলকে সকালে তার বাসায় পৌঁছে দেওয়া হয়। ছাড়া পেয়ে তিনি নিজের ফেসবুক পোস্টে তার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন, যা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। তিনি লেখেন:

"বিনা অপরাধে প্রায় সাড়ে ১০ ঘণ্টা ডিবি হেফাজতে থাকার পর তারা আমাকে সসম্মানে মাত্র বাসায় পৌঁছে দিয়েছে। ডিবিতে নিয়ে আসামির খাতায় আমার নাম লেখা হয়। জুতা-বেল্ট খুলে রেখে গারদে আসামিদের সঙ্গে আমাকে রাখা হয়।"

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, যারা তাকে তুলে এনেছিলেন বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কেউই তার আটকের সুনির্দিষ্ট কারণ বলতে পারেননি। এই প্রক্রিয়াটি কোনো সাধারণ 'জিজ্ঞাসাবাদ' বা 'ভুল বোঝাবুঝি' নয়, বরং এটিকে 'মনস্তাত্ত্বিক চাপ' দেওয়ার একটি কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে।

নেপথ্যের কারণ: এনইআইআর বিতর্ক ও ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ

সাংবাদিক সোহেল এবং ব্যবসায়িক নেতা পিয়াসকে গভীর রাতে তুলে নেওয়ার ঘটনার মূল কারণ হিসেবে মোবাইল হ্যান্ডসেট ব্যবসায়ীদের একটি আসন্ন সংবাদ সম্মেলনকে চিহ্নিত করা হয়।

ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (NEIR)

আগামীকাল (বুধবার) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (NEIR) বাস্তবায়ন পরিকল্পনা নিয়ে মোবাইল হ্যান্ডসেট ব্যবসায়ীদের সংগঠন 'মোবাইল বিজনেস কমিউনিটি বাংলাদেশ (MBCB)'-এর একটি সংবাদ সম্মেলন করার কথা ছিল। এই NEIR প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের ২৫ হাজার ক্ষুদ্র ও মাঝারি মোবাইল ফোন ব্যবসায়ী এবং সাধারণ গ্রাহকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন বলে ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন।

সাংবাদিক সোহেল এই সংবাদ সম্মেলনের মিডিয়া পরামর্শক হিসেবে যুক্ত ছিলেন। তার অভিযোগ, সরকারের একজন উপদেষ্টার ইশারায় মাত্র ৯ জন মোবাইল ফোন ব্যবসায়ীকে মনোপলি ব্যবসার সুযোগ দেওয়ার জন্যই এই সংবাদ সম্মেলনটি বন্ধ করার মূল লক্ষ্য ছিল। এই ৯ জনের একজন নাকি ওই উপদেষ্টার স্কুল-বন্ধু বলেও তিনি অভিযোগ করেন।

ডিবি ও মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য

এই ঘটনায় ব্যাপক সমালোচনার মুখে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) এবং ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা দেওয়া হয়:

ডিবি: ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম প্রথমে জানান যে "একটি বিষয়ে কথা বলার জন্য তাকে ডেকে নেওয়া হয়েছিল" এবং পরে বিষয়টি পরিষ্কার হলে তাকে বাসায় পৌঁছে দেওয়া হয়। ডিএমপির মুখপাত্র বলেন, "আটক করা হয়নি, তথ্য যাচাইয়ের জন্য তাঁকে আনা হয়। তাঁর ফোন নম্বরটি একটি সংবেদনশীল জায়গায় ব্যবহার করা হয়েছিল।" আরেক কর্মকর্তা জানান, "রাষ্ট্রীয় কিছু বিষয় আছে। যেহেতু উনারা একটা প্রতিষ্ঠান, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও নীতির বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন করতে যাচ্ছেন। রাষ্ট্র এটা নিয়ে তো জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারে।"

মন্ত্রণালয়: প্রধান উপদেষ্টার ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব-কে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযোগ উঠলে মন্ত্রণালয় একটি বিবৃতি প্রকাশ করে। বিজ্ঞপ্তিতে এই অভিযোগকে ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করা হয়। ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব বলেন, "রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার স্বার্থেই আমরা NEIR বাস্তবায়ন করছি," এবং এই আটকের ঘটনার সঙ্গে তার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।

আইনের শাসন ও বাকস্বাধীনতার প্রশ্ন

এই ঘটনাটি কয়েকটি মৌলিক বিষয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে:

০১. 'তুলে নেওয়া' বনাম 'আইনানুগ আটক'

ডিবি কর্তৃপক্ষ একে 'তথ্য যাচাই' বা 'জিজ্ঞাসাবাদ' বললেও, সাংবাদিক সোহেলের বর্ণনা অনুযায়ী তাকে ওয়ারেন্ট ছাড়া গভীর রাতে জোর করে তুলে নিয়ে যাওয়া, আসামির মতো গারদে রাখা এবং কোনো সুস্পষ্ট কারণ না দেখানো — এগুলো দেশের প্রচলিত আইনের যথাবিহিত প্রক্রিয়া (Due Process) এবং নাগরিকের মৌলিক অধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

প্রশ্ন ওঠে, যদি কেবল 'কথা বলার' প্রয়োজনই থাকে, তবে কেন দিনের বেলায় আনুষ্ঠানিক নোটিশের মাধ্যমে তাকে ডাকা হলো না? গভীর রাতের এই পদক্ষেপ কীসের ইঙ্গিত দেয়? অতীতের বহুল সমালোচিত 'গুম' বা 'অজ্ঞাত স্থান থেকে তুলে নেওয়ার' মতো পদ্ধতির পুনরাবৃত্তি নয় তো এটি?

০২. গণমাধ্যম ও বাকস্বাধীনতার ওপর আঘাত

সাংবাদিক মিজানুর রহমান সোহেল একটি সংবাদ সম্মেলনের পরামর্শক হিসেবে যুক্ত ছিলেন, যেখানে একটি রাষ্ট্রীয় নীতির সমালোচনা করার কথা ছিল। তাকে আটকের পর তিনি নিজেই অভিযোগ করেন যে, "সেই প্রেস কনফারেন্স বন্ধ করাই তাদের প্রধান টার্গেট ছিল।"

যদি কোনো সাংবাদিককে কেবল একটি বিতর্কিত রাষ্ট্রীয় নীতি নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ভূমিকা রাখার কারণে গভীর রাতে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়, তবে তা দেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও স্বাধীন মতপ্রকাশের অধিকারকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে। এটি একটি সেন্সরশিপের কৌশল যা সাংবাদিকদের মধ্যে ভয় এবং সেলফ-সেন্সরশিপের জন্ম দিতে পারে।

ডিবি কর্মকর্তার যে বক্তব্য, "সরকারি প্রতিষ্ঠান ও নীতির বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন করতে যাচ্ছেন। রাষ্ট্র এটা নিয়ে তো জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারে,"— তা কি এই ইঙ্গিত দেয় না যে, রাষ্ট্রীয় নীতি বা সরকারের সমালোচনা করা মানেই কি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যাওয়া? একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় গঠনমূলক সমালোচনা বা উদ্বেগ প্রকাশ করা নাগরিক ও গণমাধ্যমের অধিকার।

০৩. রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ

সাংবাদিক সোহেলের সরাসরি অভিযোগ— "সরকারের একজন উপদেষ্টার ইশারায় মাত্র ৯ জন মোবাইল ফোন ব্যবসায়ীকে মনোপলি ব্যবসা করার সুযোগ দেওয়ার জন্যই আমাকে আটক করা হয়েছিল।" যদিও মন্ত্রণালয় এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে, তবে এই ঘটনার ফলে একটি ক্ষমতাশালী গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষায় রাষ্ট্রীয় সংস্থাকে ব্যবহার করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। যদি সামান্য একটি সংবাদ সম্মেলন বন্ধ করার জন্য রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাকে মধ্যরাতে ব্যবহার করা হয়, তবে তা দেশের আমলাতন্ত্র ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর সন্দেহ তৈরি করে।

শেষ কথা: উত্তরণের পথ

সাংবাদিক সোহেলকে মুক্তি দেওয়া হলেও, আবু সাঈদ পিয়াস এখনও ডিবি হেফাজতে আছেন (এই আর্টিকেল লেখার সময় পর্যন্ত)। ঘটনাটি সাংবাদিক মহল, সুশীল সমাজ এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র নিন্দা ও উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

এই বিতর্কিত ঘটনাটি বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। দেশের আইনের শাসন, মানবাধিকার ও স্বাধীন মতপ্রকাশের সাংবিধানিক অধিকারকে সমুন্নত রাখতে হলে:

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহিতা: কেন গভীর রাতে, ওয়ারেন্ট ছাড়া একজন সাংবাদিককে আসামির মতো তুলে নিয়ে যাওয়া হলো, তার পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্ত করা জরুরি।

স্বচ্ছতা ও ব্যাখ্যা: ডিবি কর্তৃপক্ষকে কেবল 'ভুল বোঝাবুঝি' না বলে, ঘটনার পেছনের উদ্দেশ্য ও আইনি ভিত্তি সম্পর্কে স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যা দিতে হবে।

বাকস্বাধীনতার সুরক্ষা: রাষ্ট্রীয় নীতির সমালোচনা করা বা কোনো ব্যবসায়িক সম্প্রদায়ের উদ্বেগ প্রকাশ করা যেন কোনোভাবেই রাষ্ট্রদ্রোহ বা অপরাধ হিসেবে বিবেচিত না হয়, সেই নিশ্চয়তা দিতে হবে।

অন্যথায়, গভীর রাতে নাগরিকদের 'তুলে নেওয়ার' এই সংস্কৃতি ভয় ও নিরাপত্তাহীনতার জন্ম দেবে এবং একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মূল ভিত্তিকেই দুর্বল করে দেবে। গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের একটাই দাবি— রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার এমন অপব্যবহার অবিলম্বে বন্ধ হোক।


মন্তব্যসমূহ