শিক্ষকের আসনে 'অন্ধকার'-এর চাষ: রোকেয়াকে 'মুরতাদ কাফির' আখ্যা, কোথায় দাঁড়িয়ে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা?

ব্যাঙেরছাতা

বাংলাদেশে নারী জাগরণের পথিকৃৎ এবং সমাজ সংস্কারক বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে 'মুরতাদ কাফির' আখ্যা দেওয়ার মতো ধৃষ্টতাপূর্ণ মন্তব্য দেশের শিক্ষাব্যবস্থা, মুক্তচিন্তা এবং প্রগতিশীল সমাজের ওপর এক গভীর প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে।

নারীমুক্তির প্রতীক ও শিক্ষাঙ্গনের অশুভ কণ্ঠস্বর

বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন (১৮৮০-১৯৩২)। এই নামটি কেবল একটি ইতিহাস নয়, এটি হলো বাংলার নারী জাগরণ ও মুক্তির এক জ্বলন্ত ইশতেহার। প্রায় এক শতাব্দী আগে যখন সমাজ ছিল কূপমণ্ডুকতা ও পুরুষতান্ত্রিকতার লৌহকঠিন শৃঙ্খলে আবদ্ধ, তখন তিনি পর্দার অন্তরাল থেকে আলোর মশাল হাতে বাঙালি মুসলিম নারীদের অন্ধকার থেকে মুক্তি দিতে এগিয়ে এসেছিলেন। তাঁর হাতেই রচিত হয়েছিল 'অবরোধবাসিনী', 'সুলতানার স্বপ্ন'-এর মতো কালজয়ী সাহিত্য, যা আজও আমাদের সমাজে নারীর অধিকার, শিক্ষা এবং সমতার জন্য নিরন্তর সংগ্রামের প্রেরণা।

অথচ, এই একুশ শতকে, যেখানে আমরা রোকেয়ার দেখানো পথে হেঁটে স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখি, সেই সময়েই দেশের অন্যতম শীর্ষ বিদ্যাপীঠ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের একজন সহযোগী অধ্যাপক খন্দকার মুহাম্মদ মাহমুদুল হাসান রোকেয়া দিবস উপলক্ষ্যে প্রকাশ্যে তাঁকে 'মুরতাদ কাফির' আখ্যা দিয়েছেন। এই মন্তব্য নিছক একটি ব্যক্তিগত মতামত নয়, এটি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার গভীরে প্রবেশ করা এক অশুভ, পশ্চাৎপদ মানসিকতার বিষাক্ত প্রতিফলন। এই ঘটনা কেবল ধিক্কারের যোগ্য নয়, এটি জাতিকে একটি জরুরি আত্মসমালোচনার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।

আলোচিত ঘটনার মূল স্রোত: মন্তব্যের ধৃষ্টতা ও তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া

বেগম রোকেয়া দিবসের মতো একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিনে রাবির ওই শিক্ষক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট শেয়ার করে লেখেন, "আজ মুরতাদ কাফির বেগম রোকেয়ার জন্মদিন।" একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, যিনি আধুনিক বিজ্ঞান পড়ান এবং তরুণ প্রজন্মকে জ্ঞান ও যুক্তির পথে চালিত করার দায়িত্বে নিয়োজিত, তাঁর মুখ থেকে একজন মহীয়সী নারী সম্পর্কে এমন চরমপন্থী ও উসকানিমূলক ভাষা নিঃসন্দেহে এক 'বুদ্ধিবৃত্তিক সন্ত্রাস'।

সংবাদটি প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের প্রতিটি প্রগতিশীল মহল, শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক, ছাত্রসমাজ এবং সাধারণ মানুষ তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন। প্রায় সবকয়টি জাতীয় পত্রিকায় খবরটি গুরুত্ব সহকারে স্থান পেয়েছে, যা প্রমাণ করে সমাজ এই ধরনের পশ্চাৎপদতাকে আর মেনে নিতে প্রস্তুত নয়।

শিক্ষাবিদদের ক্ষোভ: দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদরা মন্তব্য করেছেন, যে ব্যক্তি ইতিহাসের এমন একজন কিংবদন্তী ব্যক্তিত্বকে সম্মান করতে শেখেননি, তাঁর শিক্ষক হিসেবে থাকার কোনো নৈতিক অধিকার নেই।

ছাত্রসমাজের প্রতিবাদ: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলো তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করে এবং ওই শিক্ষকের অপসারণ দাবি করে। তারা প্রশ্ন তুলেছে, যে শিক্ষক নারী জাগরণের প্রতীককে 'কাফির' বলতে দ্বিধা করেন না, তাঁর ক্লাসে নারী শিক্ষার্থীরা কতটা নিরাপদ?

ধর্মীয় ব্যাখ্যার বিকৃতি: রোকেয়াকে 'মুরতাদ' আখ্যা দেওয়াটা ধর্মীয় ব্যাখ্যার চরম বিকৃতি। রোকেয়া তাঁর লেখায় মূলত ধর্মীয় গোঁড়ামি ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে কথা বলেছিলেন, যা ইসলাম ধর্মের মৌলিক চেতনার পরিপন্থী নয়। একজন শিক্ষক যখন নিজস্ব মনগড়া, ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে এমন বিভ্রান্তি ছড়ান, তখন তা সমাজের জন্য আরও বেশি বিপজ্জনক।

শিক্ষকের ভূমিকা বনাম নৈতিক স্খলন: প্রতিষ্ঠান কি দায় এড়াতে পারে?

শিক্ষক একটি সমাজের মেরুদণ্ড। তাঁরা কেবল জ্ঞান বিতরণ করেন না, তাঁরা মূল্যবোধ, যুক্তিবাদিতা এবং সহনশীলতার আদর্শও স্থাপন করেন। একজন অধ্যাপক, যিনি রাষ্ট্রের অর্থায়নে পরিচালিত একটি শীর্ষ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত, তাঁর কাছ থেকে এমন মন্তব্য আসা প্রতিষ্ঠানের সুনাম এবং উদ্দেশ্যের ওপর আঘাত হানে।

বিশ্ববিদ্যালয় হলো মুক্তচিন্তা, বিতর্ক এবং বহুমুখী ধারণার আদান-প্রদানের সর্বোচ্চ কেন্দ্র। এখানে যেকোনো মতাদর্শের আলোচনা হতে পারে, কিন্তু একটি প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে ধর্মীয় স্লোগান ব্যবহার করে অপমান করা মুক্তচিন্তা নয়, বরং এটি চিন্তার স্বাধীনতাকে রুদ্ধ করার প্রচেষ্টা।

নৈতিকতার প্রশ্ন: শিক্ষকতার মূল শর্ত হলো নৈতিকতা। একজন আদর্শ শিক্ষক সমাজের বিভাজনকারী নয়, বরং ঐক্যের প্রতীক হন। এই ঘটনা শিক্ষকের নৈতিক দায়িত্ব এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা উভয়কেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

নিরাপত্তার উদ্বেগ: মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় অনেক নারী শিক্ষার্থী ও প্রগতিশীল চিন্তার শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা তাদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের প্রশ্ন, মত-পথের বিরুদ্ধে যারা আছেন, তাদের জন্য এই শিক্ষক এবং এই ধরনের মানসিকতা কি আদৌও নিরাপদ? 

বেগম রোকেয়ার প্রাসঙ্গিকতা: মৃত্যুর প্রায় এক শত বছর পরেও কেন তিনি জরুরি?

বেগম রোকেয়া তাঁর সময়ে সমাজকে যে প্রশ্নগুলো করেছিলেন, দুর্ভাগ্যবশত সেই প্রশ্নগুলো আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। তিনি কেবল নারী শিক্ষার কথা বলেননি, তিনি চেয়েছিলেন নারী-পুরুষের সম অধিকার ও সম মর্যাদা, যা একটি আধুনিক, সভ্য সমাজের ভিত্তি।

তাঁর কাজগুলো ছিল মূলত:

নারী শিক্ষা প্রসার: তিনি মুসলিম সমাজে নারী শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা প্রথম দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করেন।

কুসংস্কারের বিরোধিতা: তিনি ধর্মের নামে প্রচলিত ভুল ব্যাখ্যা ও কুসংস্কারের তীব্র সমালোচনা করেন।

অর্থনৈতিক স্বাধীনতা: নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতার গুরুত্ব তুলে ধরেন, যাতে তারা পুরুষের মুখাপেক্ষী না হয়।

সমতা ও মুক্তি: রোকেয়া নারীর জন্য 'অর্ধেক আকাশ' দাবি করেছিলেন—এক কথায়, নারীর পূর্ণ মানবিক মর্যাদার দাবিদার ছিলেন তিনি।

মৃত্যুর প্রায় এক শত বছর পরেও যখন তাঁর মতো একজন মহীয়সীকে এমন জঘন্য উপাধিতে ভূষিত হতে হয়, তখন বোঝা যায়, তাঁর কাজ এখনও শেষ হয়নি। বরং তাঁর আদর্শের বিরুদ্ধে একদল মানুষ এখনও সক্রিয়, যারা নারীকে ঘরে বন্দী করে রাখতে চায়।

সমাধান ও করণীয়: বিশ্ববিদ্যালয়ের দায় এবং রাষ্ট্রের ভূমিকা

এই ঘটনাটি কেবল অভিযুক্ত শিক্ষককে শাস্তি দিয়ে শেষ করে দেওয়া যথেষ্ট নয়। এটি আমাদের সমাজ ও শিক্ষাব্যবস্থার গভীর ক্ষতকে উন্মোচন করেছে।

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের করণীয়:

দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা: দ্রুততম সময়ে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ও কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো শিক্ষক এমন হীন কাজ করার সাহস না পান।

নৈতিক ও পেশাগত প্রশিক্ষণ: শিক্ষকদের জন্য নিয়মিতভাবে নৈতিকতা, সামাজিক মূল্যবোধ এবং পেশাগত আচরণবিধি বিষয়ক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা জরুরি।

শিক্ষাঙ্গনে মুক্তবুদ্ধি চর্চার পরিবেশ নিশ্চিতকরণ: বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে যেন সব ধরনের পশ্চাৎপদ ও উগ্র মতাদর্শ মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে, তা নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক।

রাষ্ট্রের এবং সমাজের করণীয়:

জাতীয় আদর্শের সংরক্ষণ: রাষ্ট্রীয়ভাবে বেগম রোকেয়ার মতো জাতীয় আদর্শের প্রতীকদের মর্যাদা ও সম্মান রক্ষায় আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।

পাঠ্যসূচিতে জোর: পাঠ্যসূচিতে রোকেয়ার দর্শন ও কাজকে আরও বিস্তারিতভাবে অন্তর্ভুক্ত করে তরুণ প্রজন্মকে তাঁর প্রগতিশীল চিন্তা-চেতনায় অনুপ্রাণিত করতে হবে।

গণসচেতনতা বৃদ্ধি: সমাজের সর্বস্তরে মুক্তচিন্তা, সহনশীলতা এবং নারীর অধিকার নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে, যাতে এই ধরনের কূপমণ্ডুক মানসিকতা আর স্থান না পায়।

অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলোর সংগ্রাম

বেগম রোকেয়াকে 'মুরতাদ কাফির' আখ্যা দেওয়াটা হলো অন্ধকার ও আলোর চিরন্তন সংগ্রামের একটি নতুন পর্ব। শিক্ষক নামের আড়ালে থাকা এই মানসিকতা প্রকারান্তরে নারীমুক্তি, আধুনিকতা এবং মুক্তবুদ্ধির চর্চার ওপরই আক্রমণ।

আমরা যদি এই আক্রমণকে সামান্যতম প্রশ্রয় দিই, তবে তা আমাদের সমাজকে আরও কয়েক দশক পিছিয়ে দেবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠগুলো যদি জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র না হয়ে পশ্চাৎপদতার আঁতুড়ঘরে পরিণত হয়, তবে জাতির ভবিষ্যৎ চরম সংকটে পড়বে।

এই সময়ে এসে আমাদের সম্মিলিতভাবে আওয়াজ তুলতে হবে: জ্ঞান এবং নৈতিকতার আসনে বসে কেউ যদি এমন অশুভ বার্তা ছড়ায়, তবে সমাজ তাকে ক্ষমা করবে না। বেগম রোকেয়ার আদর্শকে বুকে ধারণ করে মুক্তচিন্তার পথকে আরও সুগম করাই হোক এই ধিক্কারের যোগ্য মন্তব্যের উপযুক্ত জবাব।

আপনার মন্তব্য কী? আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় এই ধরনের নৈতিক স্খলনকে কীভাবে মোকাবিলা করা উচিত? নিচে কমেন্ট বক্সে আপনার মতামত জানান।

মন্তব্যসমূহ