মহান বিজয় দিবস, ২০২৫: পরাজিত অপশক্তির সফল ষড়যন্ত্রে দিবসটি উৎযাপনে সর্বস্তরের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ নেই

ব্যাঙেরছাতা

১৬ ডিসেম্বর। বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি কেবল একটি তারিখ নয়; এটি কোটি মানুষের আত্মত্যাগ, নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম, মা-বোনের সম্ভ্রম এবং সর্বোপরি, স্বাধীনতার স্বপ্নের সফল পরিণতি। ১৯৭১ সালের এই দিনে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের মাধ্যমে বাঙালি জাতি অর্জন করেছিল তার বহু কাঙ্ক্ষিত সার্বভৌমত্ব। এটি ছিল ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে একটি গণযুদ্ধের চূড়ান্ত জয়, যা বিশ্ব মানচিত্রে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছিল।

কিন্তু ৫৪তম বিজয় দিবস উদযাপনের প্রাক্কালে এসে আজ মনে এক গভীর প্রশ্ন জাগে: সেই বিজয়ের সর্বজনীন উৎসবমুখরতা কোথায়? কেন যেন এই দিনে দেশের সর্বস্তরের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও আবেগ কিছুটা ম্লান, কিছুটা বিভক্ত। শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর আনুষ্ঠানিকতা হয়তো পালিত হচ্ছে, কিন্তু সেই গণ-উচ্ছ্বাস, সেই আবেগিক বন্ধন যেন ক্ষীণ হয়ে আসছে।

এই ম্লানতা কি কেবল সময়ের ব্যবধান? নাকি এটি স্বাধীনতা বিরোধী পরাজিত অপশক্তির সুদূরপ্রসারী এবং সফল ষড়যন্ত্রের ফল? এই প্রবন্ধের মূল প্রতিপাদ্য হলো সেই গভীর ষড়যন্ত্রের স্বরূপ উন্মোচন করা, যা একদিকে যেমন উৎসবের আমেজ কেড়ে নিচ্ছে, তেমনি অন্যদিকে ইতিহাসের প্রতিষ্ঠিত সত্যকে আঘাত করে জাতিকে বিভ্রান্ত করতে চাইছে। বিজয় দিবসের এই প্রেক্ষাপটে আমাদের অবশ্যই স্বীকার করতে হবে—পরাজিত শত্রুরা তাদের মতাদর্শিক সংগ্রাম থামায়নি, বরং নতুন কৌশলে তারা আজ আমাদের জাতীয় জীবনে সফলভাবে বিভেদ সৃষ্টি করেছে।

বিজয়ের চেতনা, উদযাপনের বাস্তবতা: কেন এই দূরত্ব?

বিজয়ের চেতনার মূল ভিত্তি ছিল চারটি রাষ্ট্রীয় মূলনীতি: জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র (অর্থনৈতিক মুক্তি) এবং ধর্মনিরপেক্ষতা (অসাম্প্রদায়িকতা)। কিন্তু গত পাঁচ দশকের পথচলায় এই মূল স্তম্ভগুলো থেকে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক পর্যায়ে বারবার বিচ্যুতি ঘটেছে।

প্রথমত, গণতন্ত্রের বারবার ব্যাহত হওয়া এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক মেরুকরণ দেশের মানুষকে বিভক্ত করে দিয়েছে। যখন একটি জাতীয় উৎসব কেবল 'সরকার-দলীয়' বা 'বিশেষ গোষ্ঠীর' কর্মসূচিতে পরিণত হয়, তখন সাধারণ মানুষ নিজেদেরকে সেই উদযাপনের অংশ মনে করতে পারে না। বিজয় দিবস তখন আর জাতির সম্মিলিত উৎসব থাকে না, এটি হয়ে দাঁড়ায় একটি আনুষ্ঠানিক ইভেন্ট।

দ্বিতীয়ত, মুক্তিযুদ্ধের মূল লক্ষ্য ছিল অর্থনৈতিক মুক্তি ও সমতা। সমাজে আজ যে ব্যাপক অর্থনৈতিক বৈষম্য বিরাজমান, তা কোটি মানুষের ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার স্বপ্নকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। একজন সাধারণ মানুষ যখন জীবনধারণের কঠিন সংগ্রামে লিপ্ত, তখন শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিক উদযাপনে তার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ কমে যাওয়া খুবই স্বাভাবিক।

তৃতীয়ত, ঐতিহাসিক স্মৃতির দুর্বলতা ও বিকৃতি। বিজয়ের সঠিক ইতিহাস, শহীদদের আত্মত্যাগ এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনার শিক্ষা নতুন প্রজন্মের কাছে সঠিকভাবে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়ে গেছে। পাঠ্যপুস্তক থেকে শুরু করে সাংস্কৃতিক অঙ্গন পর্যন্ত ইতিহাসকে বারবার রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা হয়েছে। এর ফলে, নতুন প্রজন্ম বিজয়ের তাৎপর্য অনুধাবন করতে ব্যর্থ হচ্ছে, যা উদযাপনের আবেগকে শীতল করে দিয়েছে। পরাজিত অপশক্তি ঠিক এই দুর্বলতার সুযোগই গ্রহণ করেছে। তারা জানে, মানুষকে ইতিহাস ভুলিয়ে দিতে পারলে বা বিকৃত করতে পারলেই তাদের ষড়যন্ত্র সফল হবে।

ইতিহাস বিকৃতির নতুন কৌশল: বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড বিতর্ক

পরাজিত অপশক্তির সফল ষড়যন্ত্রের সাম্প্রতিক ও সবচেয়ে ভয়ংকরতম উদাহরণ হলো ইতিহাস পুনর্লিখনের দুঃসাহস।

১৪ ডিসেম্বর, ১৯৭১। এটি ছিল বাঙালির ইতিহাসে এক কালো অধ্যায়। দেশ স্বাধীন হওয়ার ঠিক আগে, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং তাদের স্থানীয় দোসর—বিশেষত আল-বদর ও আল-শামস—এর যৌথ পরিকল্পনায় দেশের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সাংবাদিক ও সাহিত্যিকদের নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল। এটি ছিল সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত একটি জাতিকে মেধা ও মননশূন্য করে দেওয়ার একটি সুপরিকল্পিত এবং সর্বজনস্বীকৃত যুদ্ধাপরাধ।

সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, জনৈক প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ এবং একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ১৪ ডিসেম্বরের এই গণহত্যার দায় অস্বীকার করে এটিকে 'ভারতের ষড়যন্ত্রের অংশ' বলে অভিহিত করেছেন। তারা তাদের বক্তব্যের সপক্ষে কোনো ধরনের দালিলিক প্রমাণ বা ঐতিহাসিক তথ্য উপস্থাপন করতে পারেননি।

এই ধরনের মন্তব্য কেবল ইতিহাসের প্রতিষ্ঠিত সত্যের প্রতিই আঘাত নয়, এটি পরাজিত অপশক্তির এক ধরনের 'সাইকোলজিক্যাল ওয়ারফেয়ার'।

প্রতিষ্ঠিত সত্য: আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে, দেশি-বিদেশি অসংখ্য গবেষকের (যেমন ড. এম এ হাসান, রফিকুল ইসলাম বীর উত্তম, অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন) দালিলিক গবেষণা এবং প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণে প্রমাণিত হয়েছে, এই হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা ছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তাদের সহযোগী আল-বদর ও আল-শামস। এই হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত পাকিস্তানি বাহিনীর তালিকা ও জড়িত স্থানীয় ঘাতকদের নাম বহু আগেই প্রকাশিত।

অপপ্রচারের উদ্দেশ্য: প্রমাণবিহীনভাবে এই জঘন্যতম অপরাধের দায় ভারতের ওপর চাপানোর মূল উদ্দেশ্যগুলো অত্যন্ত পরিষ্কার:

মুক্তিযুদ্ধের মূল সত্যকে বিতর্কিত করা: একাত্তরের গণহত্যা ও বুদ্ধিজীবী হত্যার ঘটনাকে 'ষড়যন্ত্র তত্ত্ব' হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে পুরো মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা।

বিভাজন সৃষ্টি: সমাজে ভারত-বিদ্বেষকে উসকে দিয়ে গভীর রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভাজন তৈরি করা।

ঘাতকদের দায়মুক্তি: স্থানীয় ঘাতক ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকে নস্যাৎ করে তাদের নৈতিক দায়মুক্তি দেওয়ার পথ প্রশস্ত করা।

এই অপপ্রয়াসটি প্রমাণ করে যে, পরাজিত শক্তি শুধু মাঠের রাজনীতিতে নয়, তারা এখন ইতিহাসের মূল ভিত্তিকে দুর্বল করার জন্য প্রকাশ্যে দুঃসাহস দেখাচ্ছে। যখন জাতির মেধা ও মননের উৎস বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড নিয়ে এমন বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়, তখন স্বাধীনতার পক্ষের শক্তিগুলোর ঐক্য দুর্বল হয় এবং উৎসবের চেতনা স্বাভাবিকভাবেই সংকুচিত হয়। এটি সেই সফল ষড়যন্ত্র, যা মানুষকে বিজয়ের আদর্শ থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।

সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রের স্বরূপ ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসন

পরাজিত অপশক্তির ষড়যন্ত্র ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরেই শেষ হয়ে যায়নি। তারা রাষ্ট্রের কাঠামো ও সমাজদেহের ভেতরে ধীরে ধীরে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করেছে।

১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তনের মাধ্যমে তারা রাষ্ট্রক্ষমতার কাছাকাছি আসে এবং দীর্ঘ সময় ধরে মুক্তিযুদ্ধের মূলনীতিগুলোকে বদলে দেয়। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ইতিহাসের বিকৃতি ঘটানো হয়, যার ফলস্বরূপ নতুন প্রজন্মের একাংশ বিভ্রান্তির শিকার হয়।

এই ষড়যন্ত্রের আরেকটি দিক হলো সাংস্কৃতিক আগ্রাসন। বিজয়ের চেতনা প্রগতিশীলতা, মুক্তচিন্তা এবং অসাম্প্রদায়িকতার ওপর প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু ষড়যন্ত্রকারীরা সমাজের মধ্যে অসহিষ্ণুতা, গোঁড়ামি এবং মুক্তচিন্তার প্রতি বিদ্বেষ ঢুকিয়ে দিয়েছে। তারা শিক্ষা ও সংস্কৃতির মাধ্যমে সেই আদর্শিক বীজ রোপণ করেছে, যা বিজয়ের চেতনা থেকে সম্পূর্ণ বিপরীত। যখন সমাজে মৌলবাদ ও অসহিষ্ণুতা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, তখন বিজয়ের উৎসব কেবল একটি 'প্রগতিশীল' গোষ্ঠীর অনুষ্ঠানে পরিণত হয়, যেখানে সাধারণ জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ সংকুচিত হতে থাকে।

এই সব কিছুই সেই সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রের অংশ, যার চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি দুর্বল করে দেওয়া এবং একটি দুর্বল ভিত্তির ওপর 'বিজয়ের' আনুষ্ঠানিকতাকে সীমাবদ্ধ করে রাখা।

ঘুরে দাঁড়ানোর আহ্বান

মহান বিজয় দিবস, ২০২৫-এর এই দিনে এসে আমাদের বুঝতে হবে, উদযাপনের ম্লানতা কেবল আবেগের অভাব নয়; এটি একটি সফল ষড়যন্ত্রের প্রতিচ্ছবি। এই পরিস্থিতি থেকে ঘুরে দাঁড়ানো আবশ্যক।

যদি আমরা সর্বস্তরের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে চাই, তবে প্রথম ও প্রধান কর্তব্য হলো ইতিহাসের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড বা মুক্তিযুদ্ধের যেকোনো প্রতিষ্ঠিত সত্য নিয়ে যে কোনো প্রকার মিথ্যাচার বা অপপ্রচারের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র ও সমাজকে কঠোর ও ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নিতে হবে। ইতিহাস বিকৃতিকে অবশ্যই একটি গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, বিজয়ের মূল আদর্শ—গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার এবং অর্থনৈতিক সমতা—প্রতিষ্ঠায় সরকারকে আরও বেশি মনোযোগী হতে হবে। জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি না এলে উৎসব কেবল মুষ্টিমেয় মানুষের জন্য রয়ে যাবে।

তৃতীয়ত, নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনাকে দালিলিক প্রমাণ ও অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধের ভিত্তিতে তুলে ধরতে হবে। শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক চর্চার মাধ্যমে সেই চেতনাকে ছড়িয়ে দিতে হবে।

বিজয় দিবসের এই শুভক্ষণে, আমাদের দৃঢ় শপথ হোক—পরাজিত অপশক্তির সকল অপপ্রচারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে রুখে দাঁড়াব। আনুষ্ঠানিকতা নয়, চাই বিজয়ের আদর্শের সঠিক বাস্তবায়ন। কেবল তবেই ৫৪ বছর পরেও বিজয়ের পতাকা সগৌরবে উড়বে, আর প্রতিটি নাগরিক স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই উৎসবে শামিল হবে।

বিজয় উদযাপনে যেখানে সর্বস্তরের গণমানুষের ঢল নেমে আসতো, সেখানে গত দুই বছর ধরে বিজয়ের আনন্দ ম্লান হয়ে গেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে আপনার মতামত বা প্রতিক্রিয়া কী তা লিখে জানান। কমেন্ট বক্স সকলের জন্য উন্মুক্ত।

মন্তব্যসমূহ