ভূ-রাজনীতির নতুন সমীকরণ: হাসনাতের ‘সেভেন সিস্টার্স’ হুমকি ও দক্ষিণ এশীয় কূটনীতির ভবিষ্যৎ

ব্যাঙেরছাতা

২০২৪ সালের তথাকথিত গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে রাজনৈতিক বয়ান ও বিদেশনীতির ধরনে এক আমূল পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। বিশেষ করে ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক এখন আর কেবল দ্বিপাক্ষিক আলোচনার টেবিলে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন রাজপথের স্লোগান আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। গত ১৬ই ডিসেম্বর, বাংলাদেশের বিজয় দিবসের ঠিক আগমুহূর্তে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আয়োজিত এক সমাবেশে জাতীয় নাগরিক কমিটির অন্যতম নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহর একটি বক্তব্য দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন ঝড়ের সৃষ্টি করেছে। ইনকিলাব মঞ্চের নেতা ওসমান হাদির ওপর হামলার প্রতিবাদে আয়োজিত সেই 'সর্বদলীয় প্রতিরোধ সমাবেশ' থেকে আসা এই বক্তব্যটি মূলত ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর (সেভেন সিস্টার্স) নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতাকে চ্যালেঞ্জ করেছে। এই আর্টিকেলটিতে আমরা এই বক্তব্যের গভীর বিশ্লেষণ, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং এর সম্ভাব্য কূটনৈতিক প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

বক্তব্যের মূল প্রেক্ষাপট: 

ওসমান হাদি এবং আধিপত্যবাদ বিরোধী লড়াই এই পুরো রাজনৈতিক অস্থিরতার মূলে রয়েছে ইনকিলাব মঞ্চের নেতা ওসমান হাদির ওপর সংঘটিত একটি সশস্ত্র হামলা। জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের পর থেকে বাংলাদেশের তরুণ নেতৃত্বের একটি বিশাল অংশ ভারতের বর্তমান সরকারের নীতিকে 'আধিপত্যবাদী' হিসেবে অভিহিত করে আসছে। তাদের অভিযোগ, ভারত বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে সহায়তা না করে বরং একটি বিশেষ রাজনৈতিক পক্ষকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। হাসনাত আব্দুল্লাহ এবং তার সহযোদ্ধাদের দাবি, ওসমান হাদি ভারতের আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে স্পষ্টভাবে সোচ্চার ছিলেন বলেই তাকে টার্গেট করা হয়েছে।

শহীদ মিনারের জনসভায় হাসনাত আব্দুল্লাহর কণ্ঠে ছিল চরম ক্ষোভ। তিনি অভিযোগ করেন যে, ভারত বাংলাদেশকে 'ফিলিস্তিন'-এর মতো একটি অস্থিতিশীল রাষ্ট্রে পরিণত করার নীল নকশা আঁকছে। তিনি সরাসরি হুমকি দিয়ে বলেন, 

"ভারত যদি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও মানবাধিকারকে সম্মান না করে এবং আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ ও অপরাধীদের আশ্রয় দেওয়া বন্ধ না করে, তবে আমরা চুপ করে থাকব না। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে যারা নিজেদের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করছে (বিচ্ছিন্নতাবাদী), প্রয়োজনে তাদের বাংলাদেশের মাটিতে আশ্রয় দেওয়া হবে এবং ভারতকে খণ্ড-বিখণ্ড করে সেভেন সিস্টার্সকে আলাদা করে দেওয়া হবে।"

সেভেন সিস্টার্স: ভারতের ‘চিকেন নেক’ ও নিরাপত্তা ভীতি হাসনাত আব্দুল্লাহর এই বক্তব্যের গুরুত্ব বুঝতে হলে আমাদের ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সাতটি রাজ্যের (অরুণাচল, আসাম, মেঘালয়, মণিপুর, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড ও ত্রিপুরা) ভৌগোলিক গুরুত্ব বুঝতে হবে। এই অঞ্চলটি ভারতের মূল ভূখণ্ডের সাথে কেবল ২২ কিলোমিটার প্রশস্ত একটি সরু করিডোর দিয়ে যুক্ত, যাকে বলা হয় 'চিকেন নেক' বা শিলিগুড়ি করিডোর।

ঐতিহাসিকভাবেই এই সেভেন সিস্টার্সে উলফা (ULFA), মিজো ন্যাশনাল ফ্রন্ট বা এনএসসিএন (NSCN)-এর মতো শক্তিশালী বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী সক্রিয় ছিল। বিগত ১৫ বছর শেখ হাসিনা সরকারের আমলে ভারতের সবচেয়ে বড় কৌশলগত বিজয় ছিল বাংলাদেশের মাটি থেকে এই বিচ্ছিন্নতাবাদীদের নির্মূল করা। ভারত সর্বদা এই ভীতিতে থাকে যে, বাংলাদেশের মাটিতে যদি এই গোষ্ঠীগুলো আবার আশ্রয় পায়, তবে ভারতের অখণ্ডতা রক্ষা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। হাসনাত আব্দুল্লাহর বক্তব্যটি মূলত ভারতের সেই সবচেয়ে দুর্বল জায়গায় আঘাত করেছে।

বিশ্লেষণ: রাজনৈতিক প্রজ্ঞা নাকি রাজনৈতিক মুর্খতা 

এই বক্তব্য নিয়ে বাংলাদেশের বোদ্ধা মহলে দুটি ভিন্ন ধারা তৈরি হয়েছে। প্রবীণ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাসুদ কামাল তার 'কথা' ইউটিউব চ্যানেলে এই বক্তব্যকে অত্যন্ত 'বাল্যসুলভ' এবং 'ঝুঁকিপূর্ণ' হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তার বিশ্লেষণের মূল পয়েন্টগুলো হলো:

১. সামরিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা: মাসুদ কামাল প্রশ্ন তুলেছেন, একটি রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের কি এখন ভারতের সাথে সরাসরি সামরিক বা কূটনৈতিক দ্বন্দ্বে জড়ানোর সামর্থ্য আছে? সামরিক শক্তির বিচারে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে যে বিশাল ব্যবধান রয়েছে, তাতে এমন উস্কানিমূলক কথা দেশের নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।

২. রাষ্ট্রীয় শিষ্টাচার: তার মতে, যারা আগামী দিনে দেশ পরিচালনার স্বপ্ন দেখেন, তাদের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে আরও দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন। বিচ্ছিন্নতাবাদকে উসকে দেওয়ার হুমকি আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী একটি দেশের জন্য নেতিবাচক ইমেজ তৈরি করতে পারে।

৩. ভারতের হস্তক্ষেপের সুযোগ: এই ধরনের বক্তব্য ভারতকে বিশ্ব দরবারে বলার সুযোগ করে দেয় যে, বাংলাদেশে 'উগ্রবাদী' শক্তি মাথাচাড়া দিচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের জন্যই হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।

অন্যদিকে, বিশ্লেষক নবনীতা চৌধুরী তার প্রতিবেদনে দেখিয়েছেন যে, এই তরুণ নেতারা মূলত জনগণের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের প্রতিফলন ঘটাচ্ছেন। তিনি উল্লেখ করেন, ইউনূসও দায়িত্ব গ্রহণের আগে এনডিটিভি-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন যে, বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করলে তার প্রভাব সেভেন সিস্টার্স ও পশ্চিমবঙ্গেও পড়বে। হাসনাত আব্দুল্লাহ হয়তো সেই সতর্কবার্তাটিকেই আরও কঠোর ভাষায় ব্যক্ত করেছেন।

গণমাধ্যমের রহস্যময় ভূমিকা ও ডিজিটাল সেন্সরশিপ 

আশ্চর্যের বিষয় হলো, হাসনাত আব্দুল্লাহর এই জ্বালাময়ী বক্তব্য অধিকাংশ মূলধারার মিডিয়া ও তাদের ইউটিউব চ্যানেল থেকে রহস্যজনকভাবে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ইন্ডিপেনডেন্ট টিভি, যমুনা টিভি বা আরটিভির মতো চ্যানেলগুলো প্রথমে সংবাদটি প্রচার করলেও পরে ভিডিওগুলো 'রিমুভ' করে দেয়। মাসুদ কামালের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এটি সম্ভবত সরকারের পক্ষ থেকে কোনো অলিখিত নির্দেশনা হতে পারে। সরকার হয়তো চায় না এই বক্তব্যটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ভারতের সাথে বিদ্যমান কূটনৈতিক উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে দিক। এই 'ডিজিটাল সেন্সরশিপ' প্রমাণ করে যে, হাসনাতের এই একটি বক্তব্য রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরেও কতটা অস্থিরতা তৈরি করেছে।

মাহমুদুর রহমান ও ভারতের প্রতি আল্টিমেটাম একই সমাবেশে প্রবীণ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের উপস্থিতি বিষয়টিকে আরও গুরুত্ববহ করে তুলেছে। তিনি সরাসরি ভারতকে ২৫শে ডিসেম্বরের মধ্যে শেখ হাসিনাসহ পলাতক আওয়ামী লীগ নেতাদের হস্তান্তরের আল্টিমেটাম দিয়েছেন। তিনি দাবি তুলেছেন যে, বাংলাদেশে কর্মরত কয়েক লক্ষ ভারতীয় নাগরিকের ওয়ার্ক পারমিট বাতিল করতে হবে এবং ভারতীয় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক বয়কট গড়ে তুলতে হবে। এই সম্মিলিত অবস্থান ইঙ্গিত দেয় যে, বাংলাদেশের একটি বড় অংশের কাছে এখন 'ভারত-বিরোধিতা' কেবল রাজনীতি নয়, বরং জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি 

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ ও ভারতের এই টানাপোড়েনের প্রভাব পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় পড়বে। চীন ও রাশিয়ার মতো শক্তিগুলো এই অঞ্চলের অস্থিরতাকে কীভাবে ব্যবহার করে, সেটিও দেখার বিষয়। হাসনাত আব্দুল্লাহর ‘সেভেন সিস্টার্স’ কার্ডটি যদি সত্যি কার্যকর হয়, তবে ভারত তার উত্তর-পূর্বাঞ্চল রক্ষায় আরও কঠোর হতে পারে, যার ফলে সীমান্তে উত্তেজনা ও সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়বে। আবার অন্যদিকে, ভারত যদি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ জনআকাঙ্ক্ষাকে গুরুত্ব না দিয়ে কেবল একটি বিশেষ দলের পক্ষাবলম্বন জারি রাখে, তবে এই ভারত-বিরোধী মনোভাব আরও চরমপন্থার দিকে ধাবিত হতে পারে।

সংকটের সমাধান কোন পথে? 

হাসনাত আব্দুল্লাহর বক্তব্যটি কেবল একটি স্লোগান নয়, এটি বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের আত্মমর্যাদার এক রুক্ষ বহিঃপ্রকাশ। তবে রাজনীতির ময়দানে 'আবেগ' এবং 'কূটনীতি' এক জিনিস নয়। এটি এক ধরনের রাজনৈতিক মুর্খতা। সার্বভৌমত্ব রক্ষার লড়াইয়ে প্রতিবেশীর সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা যেমন জরুরি, তেমনি জাতীয় স্বার্থে আপোষহীন হওয়াও প্রয়োজন।

বাংলাদেশের সরকারকে এখন এক কঠিন পরীক্ষা দিতে হবে। একদিকে এই তরুণ বিপ্লবীদের আকাঙ্ক্ষাকে সম্মান জানানো, অন্যদিকে ভারতের সাথে রাষ্ট্রীয় সম্পর্ককে একটি স্থিতিশীল ও মর্যাদাশীল জায়গায় নিয়ে আসা। যদি কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে শেখ হাসিনা ও অন্যান্য অভিযুক্তদের ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত না হয়, তবে হাসনাত আব্দুল্লাহদের এই ‘সেভেন সিস্টার্স’ কার্ড আগামী দিনে বাংলাদেশের বিদেশনীতির অন্যতম প্রধান এবং ঝুঁকিপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ার এই ভূ-রাজনৈতিক দাবাখেলায় পরবর্তী চালটি কে দেয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।

আপনি কি মনে করেন হাসনাতের রাজনৈতিক মুর্খতা মূলক এই বক্তব্য বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থানের জন্য ইতিবাচক? আপনার মতামত লিখুন কমেন্টে। কমেন্ট বক্স সকলের জন্য উন্মুক্ত।

মন্তব্যসমূহ