বাংলাদেশ কি একটি 'ঝুলন্ত সংসদ'-এর ঝুঁকির মুখে? একটি রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক ব্যবচ্ছেদ

ব্যাঙেরছাতা

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৪ সালের “তথাকথিত” গণ-অভ্যুত্থান এক নতুন যুগের (?) সূচনা করেছে। দীর্ঘ দেড় দশকের একদলীয় শাসনের অবসানের পর দেশ এখন একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের অপেক্ষায়। তবে এই নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি বিশেষ শব্দ এখন বোদ্ধা মহলে বেশ আলোচিত হচ্ছে—'ঝুলন্ত সংসদ' (Hung Parliament)। যখন কোনো সাধারণ নির্বাচনে কোনো একটি একক রাজনৈতিক দল বা জোট সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ম্যাজিক নম্বর বা সংখ্যাগরিষ্ঠতা (৩০০ আসনের মধ্যে ১৫১টি) অর্জন করতে ব্যর্থ হয়, তখনই তাকে ঝুলন্ত সংসদ বলা হয়।

অনেকেই মনে করছেন, বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন পূর্ববর্তী যেকোনো সময়ের চেয়ে আলাদা হবে। কারণ, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মেরুকরণ এখন ভাঙনের মুখে। জনমনে নতুন শক্তির আকাঙ্ক্ষা এবং প্রচলিত দলগুলোর প্রতি আস্থার সংকট একটি ভিন্নধর্মী ফলাফল বয়ে আনতে পারে। এই নিবন্ধে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করব কেন বাংলাদেশ এই পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে পারে এবং এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব কী হতে পারে।

ঝুলন্ত সংসদ কী এবং কেন এটি আলোচনার কেন্দ্রে?

সংসদীয় গণতন্ত্রে 'মেজরিটি' বা সংখ্যাগরিষ্ঠতা হলো সরকার পরিচালনার মূল শক্তি। বাংলাদেশের সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ এবং সংসদীয় বিধি অনুযায়ী, ৩০০টি সরাসরি নির্বাচিত আসনের মধ্যে অন্তত ১৫১টি আসন যে দল পায়, তারাই সরকার গঠনের বৈধতা পায়। কিন্তু যদি ফলাফল এমন হয় যে:

 * দল ক: ১৩০ আসন

 * দল খ: ১১০ আসন

 * অন্যান্য ও স্বতন্ত্র: ৬০ আসন

এমন অবস্থায় কোনো দলই এককভাবে সরকার গঠন করতে পারবে না। তখনই শুরু হয় কোয়ালিশন বা জোট গঠনের দরকষাকষি। বর্তমানে বাংলাদেশে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (Proportional Representation) ব্যবস্থা চালুর জোরালো দাবি উঠছে। যদি এই ব্যবস্থা কার্যকর হয়, তবে গাণিতিকভাবেই কোনো একটি দলের পক্ষে এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে, যা ঝুলন্ত সংসদের পথ প্রশস্ত করবে।

বর্তমান রাজনৈতিক সমীকরণ ও নতুন শক্তির উত্থান

বাংলাদেশের রাজনীতি ঐতিহাসিকভাবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি—এই দুই বড় দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপট ভিন্ন:

তরুণ ভোটারদের ভূমিকা: দেশের একটি বড় অংশ তরুণ ভোটার, যারা প্রথাগত রাজনীতির বাইরে 'বিকল্প' খুঁজছে। তারা যদি তৃতীয় কোনো শক্তি বা স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ভোট দেয়, তবে বড় দলগুলোর ভোটব্যাংকে ধস নামবে।

সংস্কারপন্থী রাজনীতি: ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর রাষ্ট্র সংস্কারের যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তা অনেক ছোট ছোট দলকে একত্রিত হওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে।

ইসলামী দলগুলোর প্রভাব: বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মভিত্তিক দলগুলোর একটি নির্দিষ্ট ভোটব্যাংক রয়েছে। এককভাবে তারা সরকার গঠন করতে না পারলেও, কিং-মেকারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে বড় দলের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা আটকে দেওয়ার ক্ষমতা তারা রাখে।

ঝুলন্ত সংসদের সম্ভাব্য ঝুঁকি: একটি গভীর বিশ্লেষণ

একটি উন্নয়নশীল এবং রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল দেশের জন্য ঝুলন্ত সংসদ নানা ধরণের সংকট তৈরি করতে পারে।

হর্স ট্রেডিং বা নৈতিক অবক্ষয়:

যখন সরকার গঠনের জন্য মাত্র কয়েকটি আসনের প্রয়োজন হয়, তখন ছোট দল বা স্বতন্ত্র সদস্যদের সমর্থন পেতে বড় দলগুলো অনৈতিক পথ অবলম্বন করে। পদ-পদবি, মন্ত্রিত্ব এমনকি বিপুল অর্থের বিনিময়ে সমর্থন কেনাবেচা হয়, যাকে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে 'হর্স ট্রেডিং' বলা হয়। এটি গণতন্ত্রের মূল স্পিরিটকে ধ্বংস করে।

নীতিনির্ধারণে স্থবিরতা:

একটি একক সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার খুব দ্রুত অর্থনৈতিক বা সামাজিক সংস্কারমূলক সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কিন্তু জোট সরকারে প্রতিটি সিদ্ধান্তের আগে শরিক দলগুলোর সন্তুষ্টির দিকে তাকাতে হয়। এতে দীর্ঘমেয়াদী এবং কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে, যা দেশের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে।

ব্ল্যাকমেইল পলিটিক্স:

ঝুলন্ত সংসদে ক্ষুদ্র দলগুলো অনেক সময় 'কিং-মেকার' হয়ে ওঠে। তারা তাদের ক্ষুদ্র স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য বড় দলকে জিম্মি বা ব্ল্যাকমেইল করতে পারে। এতে সরকার সবসময় পতনের আতঙ্কে থাকে, যা প্রশাসনিক কাজে ব্যাঘাত ঘটায়।

বৈদেশিক সম্পর্কের চ্যালেঞ্জ:

একটি দুর্বল বা অস্থায়ী সরকারের সাথে বিদেশি রাষ্ট্রগুলো দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি বা বিনিয়োগ করতে দ্বিধাবোধ করে। বাংলাদেশের মতো একটি দেশ, যা বৈদেশিক বিনিয়োগ ও ভূ-রাজনীতির কেন্দ্রে রয়েছে, তার জন্য অস্থির সরকার অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

ঐতিহাসিক ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট: শিক্ষা কী?

বিশ্বের অনেক দেশে ঝুলন্ত সংসদ নিয়মিত ঘটনা। কিন্তু সেই দেশগুলোর রাজনৈতিক সংস্কৃতি আমাদের চেয়ে ভিন্ন।

যুক্তরাজ্য: ২০১০ সালে যুক্তরাজ্যে ঝুলন্ত সংসদ হয়েছিল, যেখানে কনজারভেটিভ ও লিবারেল ডেমোক্র্যাটরা মিলে জোট সরকার গঠন করেছিল। রাজনৈতিক ম্যাচিউরিটি থাকায় তারা নির্দিষ্ট মেয়াদে সফলভাবে কাজ করতে পেরেছিল।

ভারত ও পাকিস্তান: আমাদের প্রতিবেশী ভারতে নব্বইয়ের দশকে বেশ কয়েকবার ঝুলন্ত সংসদ এবং ঘনঘন নির্বাচন হয়েছে। পাকিস্তানে বর্তমানে যে জোট সরকার রয়েছে, তা প্রতিনিয়ত অস্থিতিশীলতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ ১৯৯১: ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। জামায়াতে ইসলামীর সমর্থনে তারা সরকার গঠন করেছিল। সেই অভিজ্ঞতা আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে খুব একটা সুখকর ছিল না।

বাংলাদেশের সংবিধান ও ৭০ অনুচ্ছেদের বাধা

বাংলাদেশের সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো সংসদ সদস্য যদি তার দলের বিরুদ্ধে ভোট দেন, তবে তার সংসদ সদস্য পদ বাতিল হয়ে যাবে। ঝুলন্ত সংসদের ক্ষেত্রে এই অনুচ্ছেদটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ, জোট সরকারে যদি কোনো শরিক দল সংসদে সরকারের বিপক্ষে অবস্থান নেয়, তবে সরকার পতন নিশ্চিত। কিন্তু ব্যক্তিকেন্দ্রিক বিদ্রোহ এখানে আইনত কঠিন। এটি মূলত বড় দলগুলোকে সুরক্ষা দিলেও জোটবদ্ধ রাজনীতিতে অনেক সময় জটিলতা তৈরি করে।

উত্তরণের পথ: আমরা কি প্রস্তুত?

ঝুলন্ত সংসদকে ঝুঁকি না ভেবে যদি একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে নিতে হয়, তবে কিছু সংস্কার জরুরি:

সংস্কৃতিক পরিবর্তন: রাজনৈতিক দলগুলোকে 'বিজয়ী সবকিছু পায়' (Winner takes all) মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। অন্যদের সাথে ক্ষমতা ভাগাভাগি করার মানসিকতা তৈরি করতে হবে।

প্রাক-নির্বাচনী জোট: নির্বাচনের পরে সুবিধাবাদী জোট না করে, নির্বাচনের আগেই অভিন্ন লক্ষ্য নিয়ে জোট গঠন করলে জনগণের জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়।

রাষ্ট্রপতির ক্ষমতায়ন: ঝুলন্ত সংসদের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির নিরপেক্ষ ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কাকে আগে সরকার গঠনের আহ্বান জানাবেন, সে বিষয়ে একটি স্বচ্ছ প্রটোকল থাকা দরকার।

ছায়া মন্ত্রিসভা (Shadow Cabinet): বিরোধী দলগুলো যদি দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে এবং বিকল্প প্রস্তাব দেয়, তবে ঝুলন্ত সংসদেও সরকার জবাবদিহিতার মধ্যে থাকে।

সম্ভাবনা: মুদ্রার উল্টো পিঠ

সবই কি নেতিবাচক? মোটেও না। ঝুলন্ত সংসদের কিছু ইতিবাচক দিকও থাকতে পারে:

একনায়কতন্ত্রের অবসান: যখন কোনো একটি দল ৩০০ আসনের ২৫০টি পায়, তখন সংসদ মূলত রবার স্ট্যাম্পে পরিণত হয়। ঝুলন্ত সংসদে প্রতিটি আইন পাসের আগে বিতর্ক ও আলোচনার সুযোগ থাকে, যা প্রকৃত গণতন্ত্রের লক্ষণ।

অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসন: ছোট ছোট দলগুলোর মতামতের গুরুত্ব বাড়লে দেশের প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বর সংসদে পৌঁছানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়।

বাংলাদেশ কি ঝুলন্ত সংসদের ঝুঁকির মুখে? উত্তরটি হলো—হ্যাঁ, বর্তমান রাজনৈতিক প্রবাহ সেদিকেই ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে এই 'ঝুঁকি'কে আমরা 'সম্ভাবনা'য় রূপান্তর করতে পারি কি না, তা নির্ভর করবে আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও নাগরিক সমাজের ওপর। একটি স্থিতিশীল এবং কার্যকর সংসদের জন্য কেবল ভোটের অংক মেলালেই চলবে না, প্রয়োজন রাজনৈতিক সহনশীলতা ও রাষ্ট্রের স্বার্থকে দলের ঊর্ধ্বে রাখার মানসিকতা।

বাংলাদেশের গণতন্ত্র এখন একটি পরীক্ষামূলক ধাপ অতিক্রম করছে। ঝুলন্ত সংসদ যদি একটি জবাবদিহিমূলক এবং অংশগ্রহণমূলক শাসনব্যবস্থার সূচনা করে, তবে তা দেশের জন্য আশীর্বাদও হতে পারে। তবে এর জন্য প্রয়োজন একটি শক্তিশালী আইনি কাঠামো এবং রাজনীতিবিদদের চারিত্রিক দৃঢ়তা।

এই আর্টিকেলটি দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় প্রকাশিত বাংলাদেশ কি একটি ঝুলন্ত সংসদের ঝুঁকিতে শিরোনামের প্রতিবেদনের ছায়া অবলম্বনে লেখা হয়েছে।

মন্তব্যসমূহ