মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব ও দারিদ্র্য: জনদৃষ্টি আড়ালের খেলায় বিপন্ন জনপদ
সংকটের ত্র্যহস্পর্শ
২০২৫ সালের শেষার্ধে এসে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ এক নিদারুণ বাস্তবতার মুখোমুখি। একদিকে বাজার সিন্ডিকেট আর মুদ্রাস্ফীতির জাঁতাকলে পিষ্ট মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের দীর্ঘশ্বাস, অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব ও নতুন করে দারিদ্র্যের কাতারে শামিল হওয়া কোটি মানুষের হাহাকার। অর্থনীতির ভাষায় একে 'ত্র্যহস্পর্শ' বলা চলে। কিন্তু সাম্প্রতিক মাসগুলোতে লক্ষ্য করা যাচ্ছে এক অদ্ভুত রাজনৈতিক প্রবণতা। যখনই দেশের প্রধানতম সমস্যা হিসেবে ‘পেটের ক্ষুধা’ আর ‘পকেটের শূন্যতা’ বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে, তখনই অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা, রাজনৈতিক অস্থিরতা কিংবা অপ্রাসঙ্গিক ইস্যু সামনে এনে সাধারণ মানুষের মৌলিক দাবিগুলোকে আড়াল করা হচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে, এই পরিস্থিতি কি স্বাভাবিক নাকি এটি মূলত গণমানুষের দৃষ্টি সরিয়ে নেওয়ার কোনো সুগভীর কৌশলের অংশ?
মূল্যস্ফীতির আগ্রাসন: কাগজের পরিসংখ্যান বনাম বাজারের বাস্তবতা
২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে সরকারি পরিসংখ্যানে মূল্যস্ফীতি সামান্য কমার দাবি করা হলেও মাঠপর্যায়ের চিত্র ভিন্ন। বিবিএস-এর তথ্যানুযায়ী মূল্যস্ফীতি ৮-৯ শতাংশের ঘরে ওঠানামা করলেও খাদ্য মূল্যস্ফীতি এখনো দ্ব্যর্থহীনভাবে ১০ শতাংশের উপরে। চাল, ডাল, চিনি থেকে শুরু করে প্রতিটি নিত্যপণ্যের দাম তিন বছর আগের তুলনায় দ্বিগুণ বা তারও বেশি।
ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য আর সরবরাহ ব্যবস্থার অব্যবস্থাপনায় বাজার এখন সাধারণের নাগালের বাইরে। একজন শ্রমজীবী মানুষের প্রকৃত আয় গত কয়েক বছরে বাড়েনি, বরং টাকার অবমূল্যায়নের ফলে তার ক্রয়ক্ষমতা কমেছে অন্তত ৩০ শতাংশ। এই যে 'অদৃশ্য কর' বা মূল্যস্ফীতি, এটি প্রতিদিন সাধারণ মানুষের সঞ্চয় গিলে খাচ্ছে। যখন মানুষ তার ক্ষোভ প্রকাশের প্রস্তুতি নেয়, ঠিক তখনই কোনো একটি বিতর্কিত ইস্যু সামনে এনে জনরোষের গতিপথ বদলে দেওয়া হচ্ছে।
বেকারত্বের নতুন মাত্রা: শিক্ষিত তরুণের দীর্ঘশ্বাস
বেকারত্ব এখন বাংলাদেশের জন্য এক ‘টাইম বোমা’। ২০২৫ সালে প্রকাশিত বিভিন্ন বেসরকারি গবেষণা ও শ্বেতপত্র কমিটির তথ্যমতে, দেশে শিক্ষিত বেকারত্বের হার আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। বিশেষ করে বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং শিল্প কারখানার উৎপাদনে মন্দার কারণে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশের বেকারত্ব উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। যুবকদের একটি বড় অংশ এখন কর্মহীন। কর্মসংস্থানের অভাব থেকে যে হতাশা তৈরি হচ্ছে, তা থেকে তরুণদের মনোযোগ বিমুখ করার জন্য নানা ধরনের 'ডিজিটাল প্রোপাগান্ডা' এবং সামাজিক অস্থিরতাকে কাজে লাগানো হচ্ছে। শিক্ষিত বেকাররা যখন কর্মসংস্থানের দাবিতে রাজপথে সোচ্চার হওয়ার কথা, তখন তাদের ব্যস্ত রাখা হচ্ছে নানা কৃত্রিম রাজনৈতিক ডামাডোলে।
দারিদ্র্যের প্রত্যাবর্তন: উন্নয়নের মোড়ক ও রূঢ় সত্য
গত তিন দশকে বাংলাদেশ দারিদ্র্য বিমোচনে যে সাফল্য অর্জন করেছিল, গত তিন বছরে তা যেন মরীচিকা হয়ে গেছে। পিপিআরসি ও সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম)-এর ২০২৫ সালের গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের দারিদ্র্যের হার বেড়ে ২৮ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছেছে। ২০২২ সালেও এই হার ছিল ১৮.৭ শতাংশ। অর্থাৎ মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে প্রায় ১০ শতাংশ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে।
সবচেয়ে আশঙ্কাজনক হলো 'নব্য দরিদ্র' শ্রেণির উত্থান। আগে যারা মধ্যবিত্ত ছিলেন, সঞ্চয় ভেঙে এবং খাদ্যাভ্যাস কমিয়ে তারা এখন টিকে থাকার লড়াই করছেন। অতিদারিদ্র্যের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯.৩৫ শতাংশে। উন্নয়নের বড় বড় বয়ানের নিচে চাপা পড়ে যাচ্ছে ক্ষুধার এই বাস্তব চিত্র। অথচ দেশের বর্তমান রাজনৈতিক আলাপ-আলোচনায় এই বিপুল সংখ্যক মানুষের দারিদ্র্য বিমোচনের রোডম্যাপ নিয়ে কোনো কার্যকর বিতর্ক নেই।
রাজনৈতিক কৌশলে জনদৃষ্টির বিমুখীকরণ: একটি গভীর বিশ্লেষণ
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতির দিকে তাকালে দেখা যায়, যখনই দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ কিংবা বেকারত্বের মত মৌলিক সংকটগুলো নিয়ে গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে উত্তাপ ছড়ায়, তখনই খুব কাকতালীয়ভাবে অন্য কোনো সেনসেশনাল ইস্যু বা সংঘাতময় পরিস্থিতি তৈরি হয়।
ইস্যু ডাইভারশন: দ্রব্যমূল্য নিয়ে বিক্ষোভ শুরু হওয়ার আগেই এমন সব রাজনৈতিক মেরুকরণ বা আইনি জটিলতা সামনে আনা হয়, যা মানুষের আবেগ নিয়ে খেলা করে। ফলে সাধারণ মানুষ আলুর দাম বা চাকরির সংস্থান নিয়ে ভাবার বদলে টেলিভিশনের টকশোতে ওই নতুন ইস্যু নিয়ে মেতে থাকে।
ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক কার্ড: অর্থনৈতিক ব্যর্থতা ঢাকার সবচেয়ে প্রাচীন এবং কার্যকর অস্ত্র হলো ধর্মীয় সেন্টিমেন্ট। যখনই দারিদ্র্য আর বৈষম্য অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছায়, তখনই সুপরিকল্পিতভাবে সাম্প্রদায়িক উসকানি দিয়ে জনমনে ভীতি তৈরি করা হয়। সাধারণ মানুষ তখন নিরাপত্তার অভাবে ভুগে অর্থনৈতিক অধিকারের কথা ভুলে যায়।
অস্থিরতা ও স্থবিরতা: পরিকল্পিত অস্থিরতা বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করে, যা কর্মসংস্থান আরও কমিয়ে দেয়। এটি একটি চক্রাকার প্রক্রিয়া—অস্থিরতা তৈরি করে অর্থনীতিকে ভঙ্গুর রাখা হয় এবং সেই ভঙ্গুর অর্থনীতির দায় এড়াতে আরও বেশি অস্থিরতার আশ্রয় নেওয়া হয়।
প্রতিবেশী দেশগুলোর অভিজ্ঞতা ও আমাদের শিক্ষা
শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক বিপর্যয় আমাদের চোখের সামনে। শ্রীলঙ্কায় যখন মূল্যস্ফীতি চরমে পৌঁছাল, তখন সেখানকার মানুষ জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে রাজপথে নেমে এসেছিল। কিন্তু বাংলাদেশে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। এখানে বিভাজনের রাজনীতির মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে এত বেশি খণ্ডিত করে রাখা হয়েছে যে, অভিন্ন অর্থনৈতিক সংকটে তারা ঐক্যবদ্ধ হতে পারছে না। শ্রীলঙ্কা তাদের সংকট থেকে উত্তরণের পথ খুঁজে পেলেও, আমরা এখনো কৃত্রিম সঙ্কটের আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছি।
উত্তরণের পথ: অর্থনৈতিক সংস্কার না রাজনৈতিক সদিচ্ছা?
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বেকারত্ব দূরীকরণে কেবল তাত্ত্বিক সংস্কার যথেষ্ট নয়। এর জন্য প্রয়োজন সৎ রাজনৈতিক অঙ্গীকার।
বাজার মনিটরিং ও সিন্ডিকেট দমন: কেবল অভিযান নয়, বরং পণ্যের সরবরাহ শৃঙ্খলে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। চাঁদাবাজি ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করা না গেলে মূল্যস্ফীতি কমবে না।
বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ: দেশে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (SME) খাতে বড় ধরণের ভর্তুকি ও প্রণোদনা প্রয়োজন। শিক্ষিত বেকারদের জন্য কর্মমুখী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী সম্প্রসারণ: নব্য দরিদ্রদের জন্য বিশেষ রেশন ব্যবস্থা এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতা দ্বিগুণ করতে হবে।
চেতনা ফেরার সময়
বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি একটি জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। দারিদ্র্য আর বেকারত্বের মত মৌলিক সমস্যাগুলো যখন সমাজকে কুরে কুরে খাচ্ছে, তখন সস্তা আবেগ আর বিভাজনের রাজনীতিতে মেতে থাকা আত্মঘাতী। আমাদের মনে রাখতে হবে, পেটের ক্ষুধা কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম বা দলের পরিচয় জানে না।
সাধারণ মানুষকে বুঝতে হবে, তাদের আসল সংকট কোথায়। টেলিভিশন স্ক্রিনের ব্রেকিং নিউজ কিংবা রাজনৈতিক সভা-সমাবেশের আক্রমণাত্মক বক্তব্য মানুষের পাতে ভাত তুলে দেবে না। যতক্ষণ পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দারিদ্র্য বিমোচনকে জাতীয় রাজনীতির এক নম্বর এজেন্ডা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা না যাবে, ততক্ষণ এই সুপরিকল্পিত ডামাডোল চলতেই থাকবে। এখন সময় এসেছে ধোঁয়াশা কাটিয়ে আসল সংকটের দিকে নজর দেওয়ার। অন্যথায় এই পরিকল্পিত অস্থিরতার মাশুল দিতে হবে আগামী কয়েক প্রজন্মকে।
তথ্যসূত্র:
কালের কণ্ঠ (ডিসেম্বর ২০, ২০২৫), "মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব ও দারিদ্র্য" - উপ-সম্পাদকীয়।
পিপিআরসি (২০২৫) প্রতিবেদন: ‘ইকোনমিক ডায়নামিকস অ্যান্ড মুড অ্যাট হাউজহোল্ড লেবেল’।
সিপিডি বিশ্লেষণ: 'বাংলাদেশের অর্থনীতি ২০২৫-২৬: সংস্কার ও চ্যালেঞ্জ'।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ২০২৫ এর জুলাই-নভেম্বর মাসওয়ারী রিপোর্ট।

মন্তব্যসমূহ