উগ্রবাদের বিস্তার ও নীরব সংখ্যাগরিষ্ঠের অভিভাবকত্ব: বাংলাদেশের রাজনীতির নতুন সংকট
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রাণভোমরা হলো তার সাধারণ জনগণ, যাদের আমরা অনেক সময় 'নীরব সংখ্যাগরিষ্ঠ' (Silent Majority) বলে অভিহিত করি। এই বৃহৎ জনগোষ্ঠী সাধারণত কোনো উগ্রতা বা চরমপন্থায় বিশ্বাস করে না; বরং তারা স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক মুক্তি এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তা প্রত্যাশা করে। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে একটি আশঙ্কাজনক চিত্র ফুটে ওঠে। উগ্রবাদী বিভিন্ন শক্তি এখন সেই নীরব সংখ্যাগরিষ্ঠের ওপর নিজেদের অভিভাবকত্ব চাপিয়ে দেওয়ার এক মরিয়া চেষ্টায় লিপ্ত হয়েছে। তারা এমন এক বয়ান (Narrative) তৈরি করতে চাইছে, যেখানে মনে হচ্ছে তারাই সমাজের প্রকৃত কাণ্ডারি। কিন্তু এই তথাকথিত অভিভাবকত্ব কি আসলেই জনসমর্থনপুষ্ট, নাকি এটি একটি পরিকল্পিত সামাজিক দখলদারি? আজকের আলোচনায় আমরা এই সংকটের গভীরে যাওয়ার চেষ্টা করব।
অভিভাবকত্বের সংকট: কেন এবং কীভাবে?
যেকোনো রাষ্ট্রে যখন মূলধারার রাজনীতিতে শূন্যতা তৈরি হয় বা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে, তখনই প্রান্তিক বা উগ্রবাদী শক্তিগুলো নিজেদের প্রাসঙ্গিক করে তোলার সুযোগ পায়। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পালাবদলের পর অনেক প্রতিষ্ঠানই তাদের কার্যকারিতা হারিয়েছে বা পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই ক্রান্তিকালীন সময়ে উগ্রবাদীরা নিজেদের সমাজের 'নৈতিক অভিভাবক' হিসেবে উপস্থাপন করছে।
প্রথম আলোর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নির্বাচনে জয়ী হওয়া বা গণতান্ত্রিক উপায়ে ক্ষমতায় আসার চেয়ে এই শক্তিগুলো বেশি আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর প্রভাব বিস্তার করতে। তারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিচার ব্যবস্থা এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এমনভাবে থাবা বসাতে চাইছে যেন সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন তাদের নির্দেশিত পথে চলে। এই অভিভাবকত্ব আসলে কোনো সেবামূলক অভিভাবকত্ব নয়, বরং এটি একটি নিয়ন্ত্রণমূলক মানসিকতা।
নীরব সংখ্যাগরিষ্ঠের নির্লিপ্ততা নাকি ভীতি?
প্রশ্ন উঠতে পারে, দেশের বিশাল জনগোষ্ঠী কেন এই প্রক্রিয়ার প্রতিবাদ করছে না? এর উত্তর লুকিয়ে আছে 'নীরবতা'র মনস্তত্ত্বে। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ গত কয়েক দশকে নানামুখী রাজনৈতিক দমন-পীড়ন ও অনিশ্চয়তা দেখেছে। ফলে তারা সরাসরি সংঘাতে জড়ানোর চেয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে বেশি পছন্দ করে।
কিন্তু এই নীরবতাকে উগ্রবাদীরা 'সমর্থন' হিসেবে প্রচার করছে। তারা যখন রাস্তায় কোনো দাবি নিয়ে নামে বা কোনো স্থাপনা ভাঙচুর করে, তখন তারা দাবি করে যে তারা ১৬ কোটি মানুষের সেন্টিমেন্টের প্রতিনিধিত্ব করছে। অথচ বাস্তবতা হলো, একজন সাধারণ তরুণ আজ উদ্যোক্তা হতে চায়, ফ্রিল্যান্সিং করে আয় করতে চায় বা বিদেশে উচ্চশিক্ষা নিতে চায়। এই প্রগতিশীল স্বপ্নগুলোর সাথে উগ্রবাদী চেতনার কোনো মিল নেই। তবুও উগ্রবাদীরা গলার জোরে এবং সংগঠিত শক্তির মহড়ায় সাধারণ মানুষের স্বরকে স্তব্ধ করে দিতে চাইছে।
তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা বনাম উগ্রবাদী বাস্তবতা
বর্তমানে বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ তরুণ। এই তরুণরা চায় প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ, বাকস্বাধীনতা এবং বৈশ্বিক নাগরিক হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিতে। কিন্তু উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো এমন এক সামাজিক কাঠামো তৈরির চেষ্টা করছে যা রক্ষণশীল এবং বহির্বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন।
পত্রিকার সংবাদগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে বাধা প্রদান, পোশাকের স্বাধীনতা খর্ব করা এবং এমনকি খেলার মাঠেও উগ্রতার প্রদর্শন দেখা গেছে। এটি সরাসরি তরুণ প্রজন্মের লাইফস্টাইলের ওপর আঘাত। যখন উগ্রবাদীরা জোরপূর্বক কোনো ইভেন্ট বন্ধ করে দেয়, তখন তারা মূলত তরুণদের সৃজনশীল বিকাশের পথ রুদ্ধ করে। এই অভিভাবকত্ব আসলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের গতিরোধক।
প্রাতিষ্ঠানিক ধ্বংসযজ্ঞ ও আধিপত্যের রাজনীতি
উগ্রবাদী শক্তির অন্যতম কৌশল হলো রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড বা প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রশ্নবিদ্ধ করা। প্রথম আলোর কলামে যেমনটি উল্লেখ করা হয়েছে, তারা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা ও আমলাতন্ত্রের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। যখন কোনো একটি বিশেষ গোষ্ঠী ঠিক করে দেয় কী পড়ানো হবে বা কী পড়া যাবে না, তখন রাষ্ট্রের বৈচিত্র্য নষ্ট হয়।
এর পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে তারা রণক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। ফেক নিউজ, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য এবং চরিত্র হননের মাধ্যমে তারা এমন এক পরিবেশ তৈরি করছে যেখানে ভিন্নমত প্রকাশ করা বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সাইবার-বুলিং বা ডিজিটাল উগ্রবাদও নীরব সংখ্যাগরিষ্ঠকে আরও কোণঠাসা করে ফেলছে।
উগ্রবাদের বিস্তারে সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব
উগ্রবাদ শুধু রাজনৈতিক সমস্যা নয়, এটি একটি গভীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যাধি। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সাধারণত এমন দেশে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হয় যেখানে সামাজিক স্থিতিশীলতা থাকে। উগ্রবাদী শক্তির দাপট বেড়ে গেলে আন্তর্জাতিক মহলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে অর্থনীতিতে।
অন্যদিকে, সামাজিক বৈষম্য বা কর্মসংস্থানের অভাবকেও এই শক্তিগুলো পুঁজি করে। তরুণদের হতাশা কাজে লাগিয়ে তাদের ভুল পথে পরিচালিত করা সহজ হয়। এই 'ভুয়া অভিভাবকত্ব' আসলে সাধারণ মানুষের দারিদ্র্য ও নিরাপত্তাহীনতাকে স্থায়ী করে দেয়।
সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও বৈচিত্র্যের সংকট
একটি সুস্থ গণতন্ত্রের পরিচয় হলো তার সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা। কিন্তু উগ্রবাদীরা যখন নিজেদের সংখ্যাগরিষ্ঠের অভিভাবক দাবি করে, তখন তাদের প্রথম লক্ষ্যবস্তু হয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবং ভিন্নমতাবলম্বীরা। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে মব জাস্টিস বা গণপিটুনির মতো ঘটনাগুলো আমাদের এই অশনিসংকেত দেয়। যখন আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া হয়, তখন রাষ্ট্রের আইনগত অভিভাবকত্বের চেয়ে উগ্রবাদীদের আধিপত্য বেশি কার্যকর মনে হয়, যা একটি সভ্য সমাজের জন্য চরম অবমাননাকর।
নীরবতা ভাঙার সময় এবং উত্তরণের পথ
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায় কী? প্রথম আলোর বিশ্লেষণে এটি স্পষ্ট যে, নীরব সংখ্যাগরিষ্ঠের নীরবতা ভাঙার সময় এসেছে। যদি সাধারণ মানুষ তাদের প্রগতিশীল ও অসাম্প্রদায়িক অবস্থান পরিষ্কার না করে, তবে উগ্রবাদীরা তাদের ওপর স্থায়ীভাবে নিজেদের এজেন্ডা চাপিয়ে দেবে।
উত্তরণের জন্য কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি:
শিক্ষার আধুনিকায়ন: তরুণ প্রজন্মকে বিজ্ঞানমনস্ক এবং সহনশীল শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলা।
রাজনৈতিক সদিচ্ছা: প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোকে উগ্রবাদী শক্তির সাথে আঁতাত বন্ধ করতে হবে। ভোটের রাজনীতির জন্য উগ্রতাকে প্রশ্রয় দেওয়া দীর্ঘমেয়াদে আত্মঘাতী।
আইনের শাসন: অপরাধী যে দলেরই হোক বা যে মতাদর্শেরই হোক, তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে। বিচারহীনতার সংস্কৃতিই উগ্রবাদকে উৎসাহিত করে।
সাংস্কৃতিক জাগরণ: পাঠাগার, থিয়েটার এবং খেলাধুলার মতো সামাজিক সংগঠনগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করা।
উগ্রবাদীরা কখনোই কোনো জাতির প্রকৃত অভিভাবক হতে পারে না। তারা কেবল সাময়িক বিশৃঙ্খলার সুযোগ নিয়ে ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে চায়। বাংলাদেশের নীরব সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ বরাবরই শান্তির পক্ষে। তারা ৫২-তে ভাষা রক্ষায় লড়েছে, ৭১-এ দেশ স্বাধীন করেছে । এই গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস আমাদের শেখায় যে, এ দেশের মানুষ কোনো চরমপন্থাকে চিরকাল মেনে নেয়নি।
আজকের সংকট হলো চেতনার সংকট। আমরা কি উগ্রবাদীদের হাতে আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ তুলে দেব, নাকি একটি আধুনিক, উদার ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ব? এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের নিজেদেরই খুঁজে নিতে হবে। নীরব সংখ্যাগরিষ্ঠের এই নীরবতা সম্মতির লক্ষণ নয়, বরং এটি একটি জমাটবদ্ধ ক্ষোভ, যা সঠিক সময়ে বিস্ফোরিত হয়ে উগ্রবাদের এই কৃত্রিম অভিভাবকত্বকে ধুলোয় মিশিয়ে দেবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
ব্লগার নোট: এই আর্টিকেলটি প্রথম আলোর কলাম এবং সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতির নিরিখে তৈরি করা হয়েছে। উদ্দেশ্য হলো একটি সচেতন সমাজ গঠনের পথে জনমত তৈরি করা।

মন্তব্যসমূহ