বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক: আবেগের রাজনীতি বনাম বাস্তবতার কূটনীতি
দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে বাংলাদেশ এবং ভারতের সম্পর্ক সবসময়ই একটি স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ভৌগোলিক অবস্থান, অভিন্ন ইতিহাস এবং অর্থনৈতিক আন্তঃনির্ভরশীলতা এই দুই দেশকে একে অপরের পরিপূরক করে তুলেছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এক ধরনের তীব্র ভারতবিরোধী সুর লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পরবর্তী প্রেক্ষাপটে এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়কালে এই সুর আরও জোরালো হয়েছে। সম্প্রতি মাসুদা ভাট্টির একটি ভিডিওতে এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে উঠে এসেছে। ভিডিওর মূল প্রতিপাদ্য হলো—দেশীয় ব্যর্থতা ঢাকতে কি আমরা ‘ভারত বিদ্বেষ’কে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছি? আবেগ আর সস্তা জনপ্রিয়তার রাজনীতি কি আমাদের জাতীয় স্বার্থকে হুমকির মুখে ফেলছে?
হাসনাত আব্দুল্লাহর বক্তব্য এবং বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
ভিডিওটির মূল আলোচনার শুরু হয়েছে ছাত্র আন্দোলন ও বর্তমানে একটি কিংস পার্টি এনসিপি’র অন্যতম নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহর একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে। বিজয় দিবসের সমাবেশে তিনি ভারতের ‘সেভেন সিস্টার্স’ রাজ্যগুলোকে বিচ্ছিন্ন করার হুমকি দিয়েছেন এবং ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার ইঙ্গিত দিয়েছেন। এই ধরনের বক্তব্য জনমনে সাময়িক উত্তেজনা তৈরি করলেও দীর্ঘমেয়াদী কূটনীতিতে এর প্রভাব ভয়াবহ হতে পারে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের প্রভাব নিয়ে জনগণের মধ্যে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ রয়েছে। সীমান্ত হত্যা, তিস্তার পানি বন্টন এবং গত ১৫ বছরের রাজনৈতিক পটভূমিতে ভারতের ভূমিকাকে অনেকেই নেতিবাচকভাবে দেখেন। কিন্তু এই ক্ষোভকে যখন উগ্র ভারতবিদ্বেষ বা অন্য দেশের ভূখণ্ড বিচ্ছিন্ন করার হুমকিতে রূপান্তর করা হয়, তখন তা আর সাধারণ মানুষের দাবি থাকে না; বরং তা হয়ে ওঠে একটি বিপজ্জনক ভূ-রাজনৈতিক খেলা।
জেনারেল ওয়াকারুজ্জামানের দৃষ্টিভঙ্গি: বাস্তবতা বনাম আবেগ
ভিডিওটিতে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকারুজ্জামানের একটি সাক্ষাৎকারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যেখানে হাসনাত আব্দুল্লাহ বা রাজনৈতিক মঞ্চের নেতারা ভারতকে ‘ধ্বংস’ করার ডাক দিচ্ছেন, সেখানে সেনাপ্রধানের কণ্ঠে শোনা গেছে চরম বাস্তববাদ। তিনি ভারতকে সরাসরি ‘দেয়া-নেয়ার’ সম্পর্ক হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন।
সেনাপ্রধানের মতে, বাংলাদেশ অনেক ক্ষেত্রেই ভারতের ওপর নির্ভরশীল (যেমন: খাদ্যশস্য, চিকিৎসা, কাঁচামাল), আবার ভারতও বাংলাদেশের কাছ থেকে ট্রানজিট বা কানেক্টিভিটির মতো সুবিধা পায়। তিনি পরিষ্কার করেছেন যে, বাংলাদেশ প্রতিবেশী কোনো রাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করবে না, তবে বিনিময়ে বাংলাদেশের ন্যায্য পাওনা—যেমন সীমান্ত হত্যা বন্ধ এবং পানি বন্টন—আদায় করে নিতে হবে। এই বাস্তববাদী অবস্থানের সাথে রাজনৈতিক নেতাদের ‘আবেগী যুদ্ধের হুঙ্কারের’ যে বিশাল পার্থক্য, তা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতার জন্য চিন্তার বিষয়।
অর্থনৈতিক আন্তঃনির্ভরশীলতা: পরিসংখ্যান কী বলে?
রাজনীতিতে ভারতবিরোধী স্লোগান দিয়ে মঞ্চ গরম করা সহজ, কিন্তু টেবিলের ওপর যে ভাত রাখা হয়, তার বড় একটা অংশ আসে সেই ভারত থেকেই। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ভারত থেকে প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করা হয়েছে। আমাদের পেঁয়াজ, চিনি, ডাল এবং কাঁচামরিচের বড় বাজার ভারত।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো আমাদের তৈরি পোশাক শিল্প (RMG)। এই শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল, সুতা এবং কেমিক্যাল বড় আকারে ভারত থেকে আসে। সম্প্রতি বাংলাদেশ যখন ভারত থেকে সুতা আমদানিতে কড়াকড়ি করল, তখন দেশীয় বাজারে সুতার দাম প্রায় ১০-১২ শতাংশ বেড়ে গেল। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে আমাদের রপ্তানি আয়ের ওপর। সুতরাং, অর্থনৈতিকভাবে ভারতকে বয়কট করা বা ভারতের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা মানে হলো নিজের পায়ে কুড়াল মারা।
নতুন আঞ্চলিক অক্ষ: পাকিস্তান ও তুরস্কের ভূমিকা
ভিডিওটিতে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আসার পর বাংলাদেশের কূটনীতিতে এক ধরনের ‘প্যারাডাইম শিফট’ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ভারত থেকে দূরত্ব বজায় রেখে পাকিস্তান ও তুরস্কের সাথে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোর একটি চেষ্টা চলছে।
পাকিস্তান ঐতিহাসিকভাবেই দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতবিরোধী রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। এখন বাংলাদেশ যদি সেই পুরনো পাকিস্তানি ভূমিকা গ্রহণ করে এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অস্থিরতা তৈরির কাজে লিপ্ত হয়, তবে দক্ষিণ এশিয়া এক ভয়াবহ সংঘাতের দিকে এগিয়ে যাবে। তুরস্কের মুসলিম বিশ্ব নেতৃত্বের আকাঙ্ক্ষাও এই রসায়নকে আরও জটিল করছে। তবে প্রশ্ন হলো—পাকিস্তান বা তুরস্ক কি বাংলাদেশের সেই ভৌগোলিক বিকল্প হতে পারবে? উত্তর হলো—না। কারণ পাকিস্তান নিজেই অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত এবং তুরস্কের ভৌগোলিক দূরত্ব অনেক বেশি।
ভারতের ‘সেভেন সিস্টার্স’ এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো (সেভেন সিস্টার্স) বাংলাদেশের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশ এই রাজ্যগুলোর বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীকে আশ্রয় না দেওয়ার নীতি মেনে আসছে। হাসনাত আব্দুল্লাহ যখন এই রাজ্যগুলোকে বিচ্ছিন্ন করার কথা বলেন, তখন তা ভারতের জন্য একটি ‘রেড লাইন’ অতিক্রম করার মতো বিষয়।
এর পাল্টায় ভারত যদি বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামে অস্থিরতা তৈরি করে বা আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশকে ‘উগ্রবাদী রাষ্ট্র’ হিসেবে চিত্রিত করে, তবে আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা চরম ঝুঁকিতে পড়বে। যুদ্ধের ডাক দেওয়া সহজ, কিন্তু যুদ্ধ পরিচালনার মতো সামরিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা আমাদের কতটুকু আছে, তা নিয়ে ভাবার সময় এসেছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির সীমাবদ্ধতা
আমাদের অর্থনীতির মূল ভিত্তি হলো রেমিট্যান্স এবং তৈরি পোশাক। পশ্চিমা বিশ্বে বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতা গ্রহণের পর আমাদের রপ্তানি বাজার চাপের মুখে রয়েছে। চীনের সাথে আমাদের বাণিজ্য ঘাটতি প্রকট। এই অবস্থায় ভারত হতে পারত একটি বিকল্প এবং নিকটবর্তী বড় বাজার। কিন্তু রাজনৈতিক বিদ্বেষের কারণে আমরা সেই সুযোগ হারাচ্ছি।
একজন সাধারণ মানুষের জন্য সস্তা দামে আলু-পেঁয়াজ পাওয়া জরুরি, নাকি দিল্লির মসনদ জ্বালিয়ে দেওয়ার স্লোগান শোনা জরুরি? রাজনীতি যখন মানুষের পকেটে টান ফেলে, তখন সেই রাজনীতি দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
সমাধান কোথায়?
মাসুদা ভাট্টির ভিডিওর নির্যাস হলো—আমাদের ভারতকে ভালোবাসতে হবে এমন নয়, কিন্তু ভারতকে নিয়ে ‘কোল্ড ক্যালকুলেশন’ বা ঠান্ডা মাথায় হিসাব করতে হবে।
জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি: ভারতকে গালি না দিয়ে বরং নিজেদের সক্ষমতা এমন জায়গায় নিয়ে যেতে হবে যাতে ভারত আমাদের সাথে আলোচনার টেবিলে সমান গুরুত্ব দিতে বাধ্য হয়।
দক্ষ নেগোসিয়েশন: আমাদের দরকার দক্ষ কূটনীতিক যারা টেবিলের ওপর দর কষাকষি করে পানির হিসসা বা সীমান্ত হত্যা বন্ধ নিশ্চিত করবেন।
আবেগ বনাম বাস্তবতা: স্লোগান দিয়ে তালি পাওয়া সহজ, কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হয় বাস্তবতা দিয়ে। হাসনাত-সারজিসদের মতো নেতাদের আবেগী বক্তব্য তরুণ প্রজন্মকে ভুল পথে চালিত করতে পারে।
ভারত-ভারত নয়, বাংলাদেশ-বাংলাদেশ করুন
ভিডিওর শেষ কথাটি ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সারাক্ষণ ভারত কেন এটা করল বা ভারত কেন ওটা করল—এই ‘ভারত-ভারত’ জপ না করে বরং আমরা কীভাবে নিজেদের শক্তিশালী করতে পারি, সেই ‘বাংলাদেশ-বাংলাদেশ’ জপ করা উচিত।
অন্যের এজেন্ডা বা ভূ-রাজনৈতিক গেমের দাবার ঘুঁটি না হয়ে, আমাদের নিজস্ব শক্তিতে দাঁড়াতে হবে। আবেগের ঢেউয়ে ভেসে গিয়ে প্রতিবেশীর সাথে যুদ্ধ বা সংঘাতের উস্কানি দেওয়া কোনো দেশপ্রেম নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের জন্য চরম আত্মঘাতী একটি সিদ্ধান্ত। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ শান্তি এবং অর্থনৈতিক মুক্তি চায়, কোনো ছায়াযুদ্ধের শিকার হতে চায় না।
উপরোক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে নিঃসন্দেহে বলা যায়, রহস্যজনক কিছু একটা ঢাকতে হাসনাতের এই অতি আবেগীয় আস্ফালন যেন- ঢাল নাই তলোয়ার নাই নিধিরাম সর্দার- এর মতো অবস্থা। আমাদেরকে যেখানে জুতার ফিতা থেকে শুরু করে খাবারের চালটা পর্যন্ত পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে আমদানি করতে হয়, সেখানে কেন এই অতি আস্ফালন? কিংস পার্টির এই নেতারা (?) দিনে যতবার ভারত ভারত করে, ততবার যদি এরা ”আল্লাহ আল্লাহ” করতো তাহলে এদের জান্নাতটা অন্তত নিশ্চিত হতো।
আর্টিকেল পড়ার পর আপনার প্রতিক্রিয়া কী তা কমেন্টে লিখে জানান। কমেন্ট বক্স সকলের জন্য উন্মুক্ত।

মন্তব্যসমূহ