২০২৬ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ? মার্কিন থিংকট্যাংকের হুঁশিয়ারি ও দক্ষিণ এশিয়ার আগামীর ভূ-রাজনীতি

ব্যাঙেরছাতা
২০২৬ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ? মার্কিন থিংকট্যাংকের হুঁশিয়ারি ও দক্ষিণ এশিয়ার আগামীর ভূ-রাজনীতি। ছবি - ব্যাঙেরছাতা।


দক্ষিণ এশিয়া—বিশ্বের অন্যতম জনবহুল এবং পারমাণবিক শক্তিধর দুই প্রতিবেশী দেশ ভারত ও পাকিস্তানের চিরশত্রুতার ইতিহাস দীর্ঘ সাত দশকেরও বেশি। দেশ দুটির মধ্যে উত্তেজনা নতুন কিছু নয়, তবে সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় থিংকট্যাংক ‘কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্স’ (CFR) তাদের এক প্রতিবেদনে যে আশঙ্কার কথা জানিয়েছে, তা বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার ঝড় তুলেছে। সংস্থাটির মতে, ২০২৬ সালে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে আবারও বড় ধরনের সশস্ত্র সংঘাত বা যুদ্ধ বেঁধে যাওয়ার তীব্র ঝুঁকি রয়েছে। এই প্রতিবেদনে মূলত উচ্চমাত্রার সন্ত্রাসী তৎপরতা এবং সীমান্তবর্তী উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এই আশঙ্কার কথা জানানো হয়েছে। আজকের ব্লগে আমরা এই প্রতিবেদনের বিস্তারিত এবং এর পেছনের কারণগুলো বিশ্লেষণ করব।

সিএফআর-এর প্রতিবেদনে যা বলা হয়েছে

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রভাবশালী থিংকট্যাংক ‘কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্স’ (সিএফআর) প্রতি বছরই বিশ্বজুড়ে সম্ভাব্য সংঘাতের উৎস নিয়ে গবেষণা এবং জরিপ পরিচালনা করে। মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির বিশেষজ্ঞদের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা এবারের ‘প্রিভেন্টিভ প্রায়োরিটি সার্ভে ২০২৫’ শীর্ষক প্রতিবেদনে দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ভারত-শাসিত কাশ্মীরে যদি কোনো বড় ধরণের সন্ত্রাসী হামলা ঘটে এবং তার দায় যদি পাকিস্তানের ওপর বর্তায়, তবে ভারত আবারও কঠোর সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারে। এই সামরিক পদক্ষেপ থেকেই ২০২৬ সালে একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের সূত্রপাত হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত এখন ‘কৌশলগত ধৈর্য’ (Strategic Patience) নীতি ত্যাগ করে ‘আক্রমণাত্মক প্রতিরক্ষা’ (Offensive Defense) নীতি গ্রহণ করেছে, যার প্রমাণ মেলে সাম্প্রতিক কয়েক বছরের সামরিক কর্মকাণ্ডে।

সাম্প্রতিক সংঘাতের ইতিহাস ও ‘অপারেশন সিন্দুর’

সিএফআর-এর প্রতিবেদনে চলতি বছরের (২০২৫) মে মাসে ঘটে যাওয়া একটি স্বল্পমেয়াদী সামরিক উত্তেজনার কথা মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, জম্মু ও কাশ্মীরের পাহেলগামে একটি ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলায় ২৬ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হন। এই ঘটনার এক মাস পর, অর্থাৎ ৬ মে রাতে ভারতীয় সেনাবাহিনী ‘অপারেশন সিন্দুর’ পরিচালনা করে।

ভারতীয় সেনাবাহিনীর দাবি অনুযায়ী, তারা পাকিস্তানের ভেতরে কথিত সন্ত্রাসী শিবির লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে ১০০-এর বেশি জঙ্গি এবং ৯টি প্রশিক্ষণ শিবির ধ্বংস করে। এর প্রতিক্রিয়ায় পাকিস্তানও ড্রোন এবং দূরপাল্লার অস্ত্র ব্যবহার করে পাল্টা হামলার চেষ্টা করে। শেষ পর্যন্ত ১০ মে উভয় দেশের সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে আলোচনার পর পরিস্থিতি শান্ত হয়। এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, ছোট কোনো উস্কানিও যেকোনো সময় বড় আকারের যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।

ট্রাম্প প্রশাসন ও দক্ষিণ এশিয়া কৌশল

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় মেয়াদের ট্রাম্প প্রশাসন বর্তমানে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন সংঘাত (যেমন ইউক্রেন-রাশিয়া এবং গাজা যুদ্ধ) থামানোর চেষ্টা করছে। তবে সিএফআর-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনেও কাজ করছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগের মেয়াদে আমরা দেখেছি তিনি কাশ্মীর ইস্যুতে মধ্যস্থতা করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, যা ভারত প্রত্যাখ্যান করেছিল।

তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের দক্ষিণ এশিয়া নীতি ভারতের দিকে কিছুটা বেশি ঝুঁকে থাকতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। কারণ চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব রুখতে ভারত আমেরিকার জন্য এক অপরিহার্য অংশীদার। এমতাবস্থায় পাকিস্তান যদি নিজেকে সন্ত্রাসবাদ নির্মূলে সফল প্রমাণ করতে না পারে, তবে ট্রাম্প প্রশাসনের মনোভাব ভারতের সামরিক পদক্ষেপের প্রতি নমনীয় হতে পারে, যা পাকিস্তানের জন্য এক বড় চিন্তার কারণ।

পাকিস্তান-আফগানিস্তান উত্তেজনা ও আঞ্চলিক অস্থিরতা

ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্বের সমান্তরালে সিএফআর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেছে—তা হলো পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যকার তিক্ত সম্পর্ক। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (TTP) আফগানিস্তানের মাটি ব্যবহার করে পাকিস্তানে হামলা চালাচ্ছে, যা দুই দেশের সীমান্ত উত্তেজনা বাড়িয়ে দিয়েছে।

২০২৫ সালের অক্টোবরে পাকিস্তান বিমান বাহিনী কাবুলে টিটিপি প্রধান নূর ওয়ালি মেহসুদকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়। এর ফলে আফগান তালেবান সরকারের সাথে পাকিস্তানের সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটে। সিএফআর হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, ২০২৬ সালে পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধের পাশাপাশি পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যেও মাঝারি মাত্রার সংঘাত শুরু হতে পারে। পাকিস্তান যদি একই সাথে দুটি ফ্রন্টে (ভারত ও আফগানিস্তান) চাপের মুখে পড়ে, তবে দক্ষিণ এশিয়ায় এক ভয়াবহ অরাজকতা সৃষ্টি হতে পারে।

যুদ্ধের সম্ভাব্য কারণসমূহ (Root Causes)

ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ২০২৬ সালে যুদ্ধ বাঁধার পেছনে কয়েকটি প্রধান কারণ থাকতে পারে:

 * সীমান্তে অনুপ্রবেশ ও সন্ত্রাসবাদ: কাশ্মীরে সন্ত্রাসী তৎপরতা বৃদ্ধি পেলে ভারত সরকার জনমতের চাপে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সার্জিক্যাল স্ট্রাইক বা বিমান হামলার মতো পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হতে পারে।

 * কাশ্মীর ইস্যু: ৩৭০ ধারা বাতিলের পর থেকে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক কার্যত নেই বললেই চলে। পাকিস্তান আন্তর্জাতিক ফোরামে কাশ্মীর ইস্যু তুলে ধরলেও ভারত একে তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে গণ্য করে। এই অচলাবস্থা যুদ্ধের পরিবেশ তৈরি করে।

 * পানির রাজনীতি: সিন্ধু পানি চুক্তি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে টানাপোড়েন দীর্ঘদিনের। যদি ভারত কোনো কারণে নদীগুলোর গতিপথ পরিবর্তন বা বড় কোনো বাঁধ নির্মাণ করে, তবে পাকিস্তান একে অস্তিত্বের সংকট হিসেবে দেখবে এবং যুদ্ধের পথ বেছে নিতে পারে।

 * অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ: দুই দেশেই যখন অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক সংকট দেখা দেয়, তখন জনগণের দৃষ্টি ঘোরানোর জন্য অনেক সময় উগ্র জাতীয়তাবাদ এবং যুদ্ধের দামামা বাজানো হয়।

পারমাণবিক যুদ্ধের ঝুঁকি

ভারত ও পাকিস্তান উভয়ই পারমাণবিক শক্তিধর দেশ। সিএফআর বা অন্যান্য বিশ্বসংস্থাগুলোর সবচেয়ে বড় ভয় হলো, একটি সীমিত মাত্রার যুদ্ধও যদি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তবে তা পারমাণবিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ায় পারমাণবিক যুদ্ধ মানে কয়েক কোটি মানুষের মৃত্যু এবং বিশ্বের পরিবেশের ওপর অপূরণীয় ক্ষতি। ২০২৬ সালের জন্য যে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে, তার মূল উদ্দেশ্য হলো বিশ্বশক্তিগুলোকে এখনই সতর্ক করা যাতে তারা উভয় দেশের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে।

অর্থনৈতিক প্রভাব

যুদ্ধ মানেই ধ্বংস। ভারত ও পাকিস্তান—উভয় দেশই বর্তমানে অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে আইএমএফ-এর ঋণের ওপর টিকে আছে এবং মুদ্রাস্ফীতির সাথে লড়ছে। অন্যদিকে ভারত বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির একটি। একটি যুদ্ধ ভারতের এই অগ্রযাত্রাকে দশকের পর দশক পিছিয়ে দিতে পারে। যুদ্ধের কারণে সাপ্লাই চেইন ব্যাহত হবে, তেলের দাম আকাশচুম্বী হবে এবং পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় বিনিয়োগ বন্ধ হয়ে যাবে। সিএফআর-এর প্রতিবেদনে এই অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের আশঙ্কাও পরোক্ষভাবে ব্যক্ত করা হয়েছে।

চীন ও রাশিয়ার ভূমিকা

দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে চীন এবং রাশিয়া এখন বড় প্রভাবক। চীন পাকিস্তানের সব সময়ের বন্ধু (All-weather ally)। অন্যদিকে ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে ঐতিহাসিক সামরিক সম্পর্ক থাকলেও ভারত বর্তমানে আমেরিকার কাছাকাছি। যদি ২০২৬ সালে যুদ্ধ বাঁধে, তবে চীন পাকিস্তানকে সরাসরি সাহায্য করবে কিনা, তা একটি বড় প্রশ্ন। লাদাখ সীমান্তে ভারতের সাথে চীনের যে দ্বন্দ্ব চলছে, তার সাথে পাকিস্তান ফ্রন্ট যুক্ত হলে ভারতের জন্য ‘টু-ফ্রন্ট ওয়ার’ এক ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন হতে পারে।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের করণীয়

সিএফআর-এর প্রতিবেদনে যে লাল সংকেত দেওয়া হয়েছে, তা বিশ্বনেতাদের জন্য এক সতর্কবার্তা। বিশেষ করে জাতিসংঘ, আমেরিকা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নকে এখনই দুই দেশের মধ্যে পুনরায় সংলাপ শুরু করার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। যুদ্ধবাজ মনোভাব পরিহার করে কূটনৈতিক উপায়ে সমস্যা সমাধানের কোনো বিকল্প নেই।

শেষ কথা: শান্তির পথ কোনটি?

ভারত ও পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ যুদ্ধ চায় না, তারা চায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং উন্নয়ন। ২০২৬ সালে যুদ্ধের যে ভবিষ্যৎবাণী মার্কিন থিংকট্যাংকটি করেছে, তা যেন বাস্তবে রূপ না নেয়—সেজন্য উভয় দেশের নেতৃত্বকে সহনশীল হতে হবে। পাকিস্তানের উচিত তাদের ভূখণ্ডে থাকা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে বাস্তবমুখী ব্যবস্থা নেওয়া এবং ভারতের উচিত কূটনীতির জানালা উন্মুক্ত রাখা।

পরিশেষে বলা যায়, সিএফআর-এর এই প্রতিবেদন কোনো নিশ্চিত ফলাফল নয়, বরং একটি জোরালো সতর্কবার্তা। এই সতর্কবার্তাকে আমলে নিয়ে যদি বিশ্ব রাজনৈতিক মহল এগিয়ে আসে, তবে হয়তো দক্ষিণ এশিয়া আর একটি ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ থেকে রক্ষা পাবে। অন্যথায় ২০২৬ সাল হতে পারে এই অঞ্চলের ইতিহাসের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী অধ্যায়।

তথ্যসূত্র:

 👉দ্য ডেইলি ইত্তেফাক (৩১ ডিসেম্বর ২০২৫)

 👉কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্স (CFR) - Preventive Priorities Survey

 👉এনডিটিভি ওয়ার্ল্ড নিউজ

 👉আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রতিবেদন

মন্তব্যসমূহ