ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্ক: বাংলাদেশের সংযুক্তি কি অনিশ্চয়তার মুখে?

ব্যাঙেরছাতা
ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্ক: বাংলাদেশের সংযুক্তি কি অনিশ্চয়তার মুখে? (ছবি- ব্যাঙেরছাতা)


একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করছে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থা। বিশেষ করে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরির লক্ষে জাতিসংঘ এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর একটি স্বপ্নদ্রষ্টা প্রকল্প হলো ‘ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে’ (TAR) নেটওয়ার্ক। প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার কিলোমিটারের এই সুবিশাল রেল নেটওয়ার্কের লক্ষ্য ছিল দক্ষিণ এশিয়াকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ইউরোপের সাথে সংযুক্ত করা। এই উচ্চাভিলাষী প্রকল্পে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত কৌশলগত এবং গুরুত্বপূর্ণ। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রতিবেশী দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং বিনিয়োগের অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের এই সংযুক্তিতে বড় ধরনের প্রশ্নবোধক চিহ্ন এঁকে দিয়েছে। সম্প্রতি ‘বণিক বার্তা’সহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতেও এই আশঙ্কার সুর স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে কী?

ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে হলো জাতিসংঘের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশন (UN-ESCAP) কর্তৃক প্রবর্তিত একটি প্রকল্প। ১৯৫০-এর দশকে এই পরিকল্পনা গৃহীত হলেও মূলত গত দুই দশকে এটি গতি পায়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে ট্রানজিট ও কন্টেইনার পরিবহনের একটি শক্তিশালী বিকল্প পথ তৈরি করা, যা সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বাণিজ্যের সময় ও খরচ দুই-ই সাশ্রয় করবে।

বাংলাদেশে মূলত এই নেটওয়ার্কের তিনটি রুট চিহ্নিত করা হয়েছে:

রুট-১: গেদে (ভারত) – দর্শনা – ঈশ্বরদী – যমুনা সেতু – জয়দেবপুর – টঙ্গী – আখাউড়া – চট্টগ্রাম – দোহাজারী – গুনধুম – মিয়ানমার।

রুট-২: পেট্রাপোল (ভারত) – বেনাপোল – যশোর – ঈশ্বরদী – যমুনা সেতু হয়ে রুট-১ এর সাথে মিলিত হওয়া।

রুট-৩: রাধিকাপুর (ভারত) – বিরল – পার্বতীপুর – আব্দুলপুর – ঈশ্বরদী হয়ে পূর্ববর্তী রুটের সাথে যুক্ত হওয়া।

বাংলাদেশের বিশাল বিনিয়োগ ও প্রস্তুতির প্রেক্ষাপট

ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ের সাথে যুক্ত হতে বাংলাদেশ গত ১৫ বছরে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকারও বেশি বিনিয়োগ করেছে। বিশেষ করে দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণ, পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্প এবং যমুনা নদীর ওপর বঙ্গবন্ধু রেল সেতু নির্মাণের মতো বড় বড় মেগা প্রকল্পগুলো এই বৈশ্বিক নেটওয়ার্কের অংশ হওয়ার লক্ষ্যেই হাতে নেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) কক্সবাজার করিডোর আপগ্রেড করার জন্য আরও ৬৮৮ মিলিয়ন ডলার ঋণ চুক্তি সই করেছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, এত বড় বিনিয়োগের সুফল বাংলাদেশ কি সত্যিই ঘরে তুলতে পারবে?

অনিশ্চয়তার মূলে ভূ-রাজনৈতিক জটিলতা

বাংলাদেশের এই সংযুক্তির পথে বর্তমানে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ভূ-রাজনীতি। বিশ্লেষকদের মতে, প্রযুক্তিগত বা অর্থনৈতিক সমস্যার চেয়েও এখন রাজনৈতিক সমস্যাই বেশি প্রকট।

মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ ও অসহযোগিতা: 

ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ের দক্ষিণ এশীয় করিডোরটি বাংলাদেশকে মিয়ানমারের মাধ্যমে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর (যেমন থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, চীন) সাথে যুক্ত করার কথা। কিন্তু মিয়ানমারে চলমান সামরিক জান্তা বনাম বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর গৃহযুদ্ধ প্রকল্পটিকে স্থবির করে দিয়েছে। মিয়ানমার সীমান্ত পর্যন্ত বাংলাদেশ রেললাইন নিয়ে গেলেও ওপার থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। মিয়ানমার তার অংশে রেললাইন নির্মাণে চরম অনীহা দেখাচ্ছে, যা বাংলাদেশের জন্য এই রুটে 'মিসিং লিংক' তৈরি করেছে।

ভারত-পাকিস্তান বৈরিতা: 

টিএআর নেটওয়ার্কের একটি রুট ভারত ও পাকিস্তানের ভেতর দিয়ে মধ্য এশিয়া হয়ে তুরস্ক ও ইউরোপ যাওয়ার কথা। কিন্তু এই দুই পারমাণবিক শক্তিধর প্রতিবেশী দেশের বৈরী সম্পর্কের কারণে পণ্যবাহী ট্রেনের নিরবচ্ছিন্ন যাতায়াত এখনো অলীক কল্পনা।

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের টানাপোড়েন: 

সাম্প্রতিক সময়ে দক্ষিণ এশিয়ায় রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলে ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কের কিছুটা কূটনৈতিক টানাপোড়েন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ভারতের ঋণে (LoC) চলমান অনেক রেল প্রকল্প বর্তমানে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। উদাহরণস্বরূপ, বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেললাইন প্রকল্পের বাস্তবায়ন থমকে যাওয়া বা ভারতীয় ঠিকাদারদের কাজ থেকে বিরত থাকা বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

‘মিসিং লিংক’ এবং অবকাঠামোগত চ্যালেঞ্জ

ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ের স্বপ্ন পূর্ণাঙ্গ রূপ পেতে হলে সীমান্তের ওপারে রেল নেটওয়ার্ক শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশের দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথের রামু থেকে গুনধুম পর্যন্ত মাত্র ২৮.৭৫ কিলোমিটার অংশ এখনো বাকি। এটি মিয়ানমার সীমান্তে গিয়ে শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু মিয়ানমারের অসহযোগিতার কারণে এই কাজ আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে। ফলে বাংলাদেশ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাথে যুক্ত হওয়ার সরাসরি সুবর্ণ সুযোগটি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

এছাড়া, বাংলাদেশের রেল নেটওয়ার্কে ‘গেজ’ সমস্যাও একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। দেশের পশ্চিমাঞ্চলে ব্রডগেজ এবং পূর্বাঞ্চলে মিটারগেজ বিদ্যমান থাকায় আন্তঃদেশীয় বা আন্তঃমহাদেশীয় ট্রেন চলাচলের ক্ষেত্রে মালমাল বা যাত্রী স্থানান্তরের বাড়তি ঝামেলা ও খরচ পোহাতে হয়। যদিও সরকার সব রুটকে ডুয়াল গেজে রূপান্তরের কাজ করছে, তবে এটি সমাপ্ত করতে আরও অনেক সময় ও বিপুল অর্থের প্রয়োজন।

আঞ্চলিক মেরুকরণ ও চীনা করিডোরের প্রভাব

বর্তমানে অনেক এশীয় দেশ দ্রুত অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আর্থিক সংস্থানের জন্য চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (BRI) বা সিপেক (CPEC) করিডোরের দিকে ঝুঁকছে। চীন ইতিমধ্যে লাওস ও থাইল্যান্ডের সাথে তাদের রেল সংযোগ স্থাপন করেছে। অন্যদিকে ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে একটি বহুপাক্ষিক জাতিসংঘের প্রকল্প হওয়ায় এর রাজনৈতিক ভিত্তি কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়েছে। প্রতিটি দেশই এখন তাদের নিজস্ব নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক সমীকরণকে প্রাধান্য দিচ্ছে, যার ফলে TAR-এর সম্মিলিত লক্ষ্য ব্যাহত হচ্ছে।

অর্থনৈতিক প্রভাব ও ভবিষ্যতের রূপরেখা

যদি বাংলাদেশ সাফল্যের সাথে ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ের সাথে যুক্ত হতে পারে, তবে তা দেশের জিডিপিতে প্রায় ১.৫% থেকে ২% পর্যন্ত প্রবৃদ্ধি যোগ করতে পারে। চট্টগ্রাম ও মোংলা সমুদ্রবন্দর এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ভারতের সেভেন সিস্টার্স এবং ল্যান্ডলকড দেশ নেপাল ও ভুটানের জন্য ট্রানজিট পয়েন্টে পরিণত হতে পারে। কিন্তু বর্তমান অনিশ্চয়তা বজায় থাকলে বাংলাদেশের বিনিয়োগ করা হাজার হাজার কোটি টাকা অলাভজনক প্রকল্পে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশকে এখন বিকল্প চিন্তাও করতে হবে। মিয়ানমার রুটটি দীর্ঘায়িত হলে ভারত হয়ে বিকল্প কোনো পথে থাইল্যান্ড বা মালয়েশিয়ার সাথে যুক্ত হওয়া যায় কিনা, তা নিয়ে কূটনৈতিক আলোচনা শুরু করা দরকার। পাশাপাশি বিমসটেক (BIMSTEC) বা বিবিআইএন (BBIN) ফোরামের মাধ্যমে রেল সংযোগের চেষ্টা আরও জোরালো করতে হবে।

বাংলাদেশের জন্য করণীয় কী?

কূটনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধি: মিয়ানমারের সাথে দ্বিপাক্ষিক এবং আন্তর্জাতিক স্তরে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া যাতে তারা তাদের অংশের রেললাইনের কাজ শুরু করে।

বিকল্প রুট অনুসন্ধান: যদি মিয়ানমার রুটটি স্থায়ীভাবে বন্ধ থাকে, তবে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ব্যবহার করে অন্য কোনো আঞ্চলিক সংযোগ তৈরি করা সম্ভব কিনা তা খতিয়ে দেখা।

অভ্যন্তরীণ অবকাঠামো সম্পন্ন করা: অভ্যন্তরীণ রেল প্রকল্পগুলো, বিশেষ করে যমুনা নদীর ওপর ডাবল ট্রাক রেল সেতু এবং পদ্মা রেল সংযোগের কাজ দ্রুততম সময়ে সফলভাবে পরিচালনা করা।

বহুপাক্ষিক বিনিয়োগ নিশ্চিত করা: শুধুমাত্র নির্দিষ্ট একটি দেশের ঋণের ওপর নির্ভর না করে এডিবি, বিশ্বব্যাংক বা এআইআইবি-র মতো সংস্থার থেকে অর্থায়ন নিশ্চিত করা।

ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্ক বাংলাদেশের জন্য শুধুমাত্র একটি রেল সংযোগ নয়, এটি বৈশ্বিক বাণিজ্যের মহাসড়কে যুক্ত হওয়ার একটি প্রবেশদ্বার। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ এই প্রকল্পের একটি ‘হাব’ হওয়ার যোগ্যতা রাখে। তবে বৈশ্বিক রাজনীতির মারপ্যাঁচে এই সম্ভাবনা যেন অঙ্কুরেই বিনষ্ট না হয়, সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখা জরুরি। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সুসম্পর্ক নিশ্চিত করতে না পারলে বিপুল অর্থ ব্যয়ে তৈরি অবকাঠামো শেষ পর্যন্ত কেবল অভ্যন্তরীণ যোগাযোগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে। সময় এসেছে সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে সকল বাধা কাটিয়ে ‘ইউরো-এশিয়া’ ট্রেন চলাচলের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার।

তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা, ঢাকা ট্রিবিউন, ইউএন-এসক্যাপ (UN-ESCAP) রিপোর্ট এবং বাংলাদেশ রেলওয়ের বার্ষিক প্রতিবেদন।

এই বিষয়টি নিয়ে আপনার চিন্তাভাবনা, মতামত কিংবা প্রতিক্রিয়া কী তা কমেন্টে লিখে জানান। কমেন্ট বক্স সকলের জন্য উন্মুক্ত।

মন্তব্যসমূহ