ওসামান হাদির কিলিং মিশনের পোস্টমর্টেম: “অনস্ক্রিন” আর “অফস্ক্রিনে” আসলে কারা?

ব্যাঙেরছাতা

বাংলাদেশের রাজনীতিতে গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে অস্থির সময়গুলোর একটির মধ্য দিয়ে আমরা অতিবাহিত হচ্ছি। ২০২৪ সালের তথাকথিত জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের পর দেশ যখন একটি নতুন আশার দিকে তাকিয়ে ছিল, ঠিক তখনই একের পর এক রহস্যময় ঘটনা সাধারণ মানুষকে স্তম্ভিত করে দিচ্ছে। এই ধারায় সবচেয়ে মর্মান্তিক এবং রাজনৈতিকভাবে গুরুত্ববহ ঘটনাটি হলো তরুণ ও উদীয়মান রাজনীতিবিদ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড। ওসমান হাদি কেবল একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন না, বরং তিনি হয়ে উঠেছিলেন সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর। তার মৃত্যু কেবল একটি প্রাণ কেড়ে নেয়নি, বরং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির স্থিতিশীলতার সামনে ছুড়ে দিয়েছে অনেকগুলো কঠিন প্রশ্ন। এই আর্টিকেলে আমরা ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের গতিপ্রকৃতি, সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের ভূমিকা এবং পর্দার আড়ালের রহস্য উন্মোচনের চেষ্টা করব।

​হাদির রাজনৈতিক দর্শন ও 'থার্ড ফোর্স' এর উত্থান

​ওসমান হাদি কেবল একজন ব্যক্তি ছিলেন না, তিনি হয়ে উঠেছিলেন প্রচলিত দুই ধারার রাজনীতির বাইরে এক বিকল্প শক্তির প্রতীক। বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম যখন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির চিরাচরিত ক্ষমতার লড়াইয়ে ক্লান্ত, তখন হাদির মতো শিক্ষিত ও সাহসী তরুণেরা 'থার্ড ফোর্স' বা তৃতীয় শক্তির সম্ভাবনা জাগিয়ে তুলেছিলেন। তার প্রতিটি সভায় সাধারণ মানুষের উপচে পড়া ভিড় প্রমাণ করেছিল যে, মানুষ এখন নতুন নেতৃত্ব চায়। হাদির রাজনৈতিক দর্শন ছিল জনমুখী; তিনি ধর্মের সাথে আধুনিকতার এক অনন্য মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন, যা অনেক রক্ষণশীল এবং উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তার এই ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা অনেক রাজনৈতিক দলের সাজানো ছককে ওলটপালট করে দিয়েছিল। তাই তাকে সরিয়ে দেওয়া কেবল এক ব্যক্তির মৃত্যু নয়, বরং একটি নতুন রাজনৈতিক ধারার ভ্রূণকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করার অপচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

​কিলিং মিশনের অন-স্ক্রিন পোস্টমর্টেম: সন্দেহের তীর যেদিকে

​ওসমান হাদির ওপর হামলার ধরন ছিল অত্যন্ত পেশাদার। রানিং রিকশায় থাকা অবস্থায় পেছন থেকে চলন্ত মোটরসাইকেল দিয়ে তাকে টার্গেট করা হয়েছিল । বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কোনো সাধারণ অপরাধীর কাজ নয়, বরং একজন 'সুপার ডুপার' প্রফেশনাল শুটারের পক্ষেই এমন নিখুঁত নিশানায় আঘাত করা সম্ভব। এই হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে বর্তমানে চারটি পক্ষকে নিয়ে আলোচনা তুঙ্গে:

​আওয়ামী লীগ ও “ফ্যাসিস্ট” শক্তি: ২৪-এর অভ্যুত্থানের পর থেকে দেশে যেকোনো অস্থিরতার পেছনে প্রথম সন্দেহের তীরটি যায় ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের দিকে। সাধারণ মানুষের ধারণা, শেখ হাসিনার দোসররা দেশকে অস্থিতিশীল করতে এবং বর্তমান সরকারকে ব্যর্থ প্রমাণ করতে এই ধরণের হত্যাকাণ্ড ঘটাতে পারে। তবে এর সপক্ষে সুনির্দিষ্ট এভিডেন্সের চেয়ে বেশি কাজ করছে গত ১৫ বছরের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা।

​বিএনপির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণ: ওসমান হাদি ঢাকা-৮ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে চেয়েছিলেন। ওই আসনে বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী মির্জা আব্বাসের জনপ্রিয়তা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে বলে অনেকে মনে করছেন। হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর মির্জা আব্বাস যখন হাসপাতালে তাকে দেখতে যান, তখন সেখানে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ এবং উদ্ভূত পরিস্থিতি বিষয়টিকে আরও জটিল করে তোলে । এছাড়া হাদির শুটার ফয়সালের জামিনের সাথে বিএনপি পন্থী আইনজীবীদের সম্পৃক্ততা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন খোদ আইন উপদেষ্টা।

​এনসিপির (NCP) বিরুদ্ধে অভিযোগ: ওসমান হাদি তার জীবদ্দশায় এনসিপির বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কড়া সমালোচনা করেছিলেন। বিশেষ করে ২৪-এর অভ্যুত্থানকে কুক্ষিগত করা এবং গত ১০ মাসে এই দলের নেতাকর্মীদের হঠাৎ কোটিপতি হয়ে যাওয়ার বিষয়ে তিনি সোচ্চার ছিলেন । এই রাজনৈতিক বিরোধই কি তার মৃত্যুর কারণ? এই প্রশ্নটি এখন রাজনীতির মাঠে ঘুরপাক খাচ্ছে।

​জামায়াত-শিবির ও চরমোনাই ফ্যাক্টর: হাদি জামায়াত ও চরমোনাইয়ের রাজনীতি নিয়েও সমালোচনা করেছিলেন। তার মতে, তারা 'আন্ডারগ্রাউন্ড' বা রিমোট কন্ট্রোল রাজনীতিতে অভ্যস্ত । এই ধরনের সমালোচনার কারণে জামায়াত-শিবিরও সন্দেহের তালিকার বাইরে নয়।

​বিহাইন্ড দ্য স্ক্রিন: মব ভায়োলেন্স ও অস্থিতিশীলতার নেপথ্যে

​হাদির মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর দেশে যে অভাবনীয় 'মব ভায়োলেন্স' বা মব সন্ত্রাস দেখা গেছে, তা এই হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্যকে আরও রহস্যময় করে তোলে। হাদির মৃত্যুর পরপরই প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, ধানমন্ডি ৩২ নম্বর, ছায়ানট এবং উদীচীর মতো সাংস্কৃতিক ও গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করা হয় ।

​স্লোগান ও লেবাসের রাজনীতি: আক্রমণকারীদের ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে তারা 'নারায়ে তাকবীর, আল্লাহু আকবার' স্লোগান দিচ্ছে এবং তাদের পোশাকে ছিল ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের ছাপ । মজার বিষয় হলো, হাদি নিজে কোনো প্রতিষ্ঠানের ভাঙচুরের রাজনীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন না । তাহলে তার অনুসারী পরিচয়ে কারা এই কাজগুলো করল? জামায়াত শিবিরের ছাত্রনেতাদের বক্তব্যে যখন উদীচী বা ছায়ানটকে 'তসনচ' করে দেওয়ার কথা বলা হয়, তখন ঘটনার যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া কঠিন হয় না।

​মব জাস্টিস ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি: ইউনূস সরকার কি ব্যর্থ?

​বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থায় 'মব জাস্টিস' বা গণপিটুনি ও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের পর উত্তেজিত জনতাকে নিয়ন্ত্রণ করার পরিবর্তে এক ধরনের অঘোষিত দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। যখন রাষ্ট্রের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী নির্বিকার থাকে, তখন অপরাধী গোষ্ঠীগুলো ধর্মের দোহাই দিয়ে বা বিপ্লবের নাম ভাঙিয়ে রাষ্ট্রীয় সম্পদে আগুন দেওয়ার সাহস পায়। হাদির নাম ব্যবহার করে যারা উদীচী বা ছায়ানটে হামলা করেছে, তারা আসলে হাদির আদর্শের অনুসারী নয়, বরং তারা সুযোগসন্ধানী এক বিশেষ গোষ্ঠী। এই গোষ্ঠীটি চায় দেশে একটি অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে, যাতে আন্তর্জাতিক মহলে বর্তমান সরকার ও দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়। বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি যদি বজায় থাকে, তবে ভবিষ্যতে আরও অনেক ওসমান হাদিকে আমরা হারাবো এবং রাষ্ট্র ক্রমান্বয়ে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।

​রাজনৈতিক সমীকরণ: এক ঢিলে দুই পাখি

​এই কিলিং মিশনের মাধ্যমে সম্ভবত মাস্টারমাইন্ডরা এক ঢিলে দুই পাখি মারতে চেয়েছে। হাদিকে সরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে একদিকে একজন শক্তিশালী তরুণ নেতাকে শেষ করা হলো, অন্যদিকে এর দায় বিএনপির ওপর চাপিয়ে তাদের ভোট ব্যাংক নষ্ট করার একটি সূক্ষ্ম চাল চালার চেষ্টা করা হচ্ছে। যদি সাধারণ মানুষের মনে এই বিশ্বাস ঢুকিয়ে দেওয়া যায় যে বিএনপিই হাদিকে হত্যা করেছে, তবে নির্বাচনের মাঠে জামায়াত বা অন্য জোটের জয়লাভ সহজ হবে।

ওসমান হাদির এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে কেবল দেশীয় রাজনীতি নয়, বরং ভূ-রাজনৈতিক কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা নিয়েও জনমনে প্রশ্ন রয়েছে। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এবং দক্ষিণ এশিয়ায় এর প্রভাব বিস্তারের লড়াইয়ে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তৎপরতা নতুন কিছু নয়। হাদির মতো একজন সম্ভাবনাময় জাতীয়তাবাদী নেতাকে সরিয়ে দিয়ে দেশীয় অস্থিতিশীলতা বৃদ্ধি করা কি কোনো বহিঃশক্তির সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ? বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সম্পর্কের টানাপোড়েনের এই সময়ে হাদির মৃত্যু এবং পরবর্তী সাম্প্রদায়িক উসকানি পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তুলেছে। এই হত্যাকাণ্ডটিকে কেবল একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে না দেখে একটি বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে তদন্ত করা প্রয়োজন।

ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের বর্তমান ক্রান্তিকালের একটি কালো অধ্যায়। এটি কেবল একটি খুন নয়, বরং এটি পরিকল্পিতভাবে রাষ্ট্রকে একটি গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। যদি বর্তমান সরকার অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে ব্যর্থ হয় এবং এই 'মব জাস্টিস' চলতে থাকে, তবে ২০২৪-এর বিপ্লবের লক্ষ্যই ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। ওসামান হাদির বিদেহী আত্মার শান্তি এবং তার পরিবারের বিচার পাওয়ার অধিকারই এখন সাধারণ মানুষের একমাত্র চাওয়া।

মন্তব্যসমূহ