নির্বাচনের প্রাক্কালে: ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আয়োজনে ইসি কতটা প্রস্তুত?
বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি জাতীয় নির্বাচন কেবল সরকার গঠনের প্রক্রিয়াই নয়, বরং রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা ও প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতার এক জ্বলন্ত পরীক্ষা। যখন নির্বাচন কমিশন (ইসি) "তফসিল ঘোষণার জন্য প্রস্তুত" বলে শিরোনাম হয়, ঠিক তখনই অন্যদিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন স্থগিত চেয়ে হাইকোর্টে রিট হওয়ার মতো বিপরীতমুখী সংবাদও প্রকাশিত হয়। এই দ্বিমুখী স্রোতের মধ্যে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন জাগে, দেশের সর্বোচ্চ নির্বাচন আয়োজক সংস্থা হিসেবে নির্বাচন কমিশন (ইসি) ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আয়োজনে কতটা প্রস্তুত? সাম্প্রতিক সংবাদ বিশ্লেষণ করে এই প্রস্তুতির বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখা যাক।
ইসির দৃশ্যমান প্রস্তুতি: পরিসংখ্যান ও কর্মপরিকল্পনা
নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বারবারই প্রস্তুতির শেষ পর্যায়ে থাকার কথা জানানো হয়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যম সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ইসির প্রস্তুতি এখন ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ সম্পন্ন। এই প্রস্তুতির প্রধান সূচকগুলো হলো:
চূড়ান্ত ভোটার তালিকা: দেশে এখন ১২ কোটি ৭৬ লাখের বেশি ভোটার প্রস্তুত। এই বিশাল সংখ্যক ভোটারের জন্য ভোটদানের ব্যবস্থা করা ইসির অন্যতম প্রধান কাজ।
ভোটকেন্দ্র ও ভোটকক্ষ: আগামী নির্বাচনে ভোট গ্রহণের জন্য ৪২ হাজার ৭৬১টি ভোটকেন্দ্র এবং ২ লাখেরও বেশি ভোটকক্ষ নির্ধারণ করা হয়েছে।
আইন ও বিধিমালা সংস্কার: ত্রয়োদশ নির্বাচনের আগে Representation of the People Order, 1972-এর অধিকতর সংশোধনসহ রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা, ২০২৫ প্রণয়ন করা হয়েছে। এছাড়াও প্রবাসী বাংলাদেশিদের পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোটদানের জন্য নিবন্ধন সংক্রান্ত পরিপত্রও জারি করা হয়েছে, যা ইতিবাচক উদ্যোগ।
সীমানা পুনর্নির্ধারণ: জাতীয় সংসদের নির্বাচনি এলাকার সীমানার পুনর্নির্ধারণের চূড়ান্ত তালিকাও ইতোমধ্যে প্রকাশ করা হয়েছে।
তফসিল ঘোষণা: ইসি আগামী সপ্তাহে তফসিল ঘোষণার পরিকল্পনা করছে এবং এই সিদ্ধান্ত নিতে আগামী রোববার বৈঠকে বসার কথা রয়েছে। প্রথা অনুযায়ী, তফসিল ঘোষণার আগে তারা রাষ্ট্রপতির সঙ্গেও সাক্ষাৎ করবে।
এই পরিসংখ্যানগুলো থেকে স্পষ্ট, লজিস্টিক (Logistics) এবং প্রাতিষ্ঠানিক (Institutional) দিক থেকে ইসি একটি উচ্চ-স্তরের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। উপকরণ সংগ্রহ, জনবল পরিকল্পনা, ও আইনি কাঠামোর দিক থেকে প্রস্তুতি দৃশ্যমান।
অতিরিক্ত চ্যালেঞ্জ: একযোগে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট
এই নির্বাচনে ইসির সামনে একটি অতিরিক্ত চ্যালেঞ্জ যুক্ত হয়েছে – একই দিনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট আয়োজন। এই যুগপৎ আয়োজন ইসির প্রস্তুতির মানকে আরও কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলে দিয়েছে।
ভোটদানের সময় ব্যবস্থাপনা: একজন ভোটারকে একই সঙ্গে দুটি ব্যালটে ভোট দিতে হবে, যার কারণে ভোটদানে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সময় লাগবে। ইসি এই সমস্যা সমাধানের জন্য ভোট গ্রহণের সময় এক ঘণ্টা বাড়ানোর চিন্তা করছে (সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টার পরিবর্তে সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত)।
গোপন কক্ষ বৃদ্ধি: মক ভোটিংয়ের (Mock Voting) প্রাথমিক তথ্য পর্যালোচনা করে ইসি প্রতিটি ভোটকক্ষে একটির জায়গায় দুটি করে গোপন কক্ষ (Booth) স্থাপনের বিষয়টি বিবেচনা করছে। এতে ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা না বাড়িয়েও সময় ব্যবস্থাপনা কিছুটা সহজ হতে পারে।
এই সমস্যাগুলোর সমাধান খোঁজা ইঙ্গিত দেয় যে, ইসি নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নমনীয়তা (Flexibility) ও সৃজনশীলতা (Creativity) দেখাচ্ছে।
আইনি জটিলতা: রিটের চ্যালেঞ্জ
ইসি যখন তফসিল ঘোষণার দোরগোড়ায়, ঠিক তখনই বাংলাদেশ কংগ্রেস নামের একটি রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কার্যক্রম স্থগিত চেয়ে হাইকোর্টে রিট দায়ের করা হয়েছে। এটি ইসির প্রস্তুতির পথে একটি বড় আইনি বাধা সৃষ্টি করেছে।
রিটের বিষয়বস্তু: রিট আবেদনে মূলত দুটি প্রধান নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে:
১. নির্বাচনের সব কার্যক্রম স্থগিত করা।
২. জেলা ও উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তাদের নির্বাচন প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা এবং তাদের মধ্য থেকে পদোন্নতি পদ্ধতির মাধ্যমে ইসি সচিব নিয়োগের পাশাপাশি 'ইলেকটোরাল সার্ভিস কমিশন' প্রতিষ্ঠা করা।
নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পূর্বমুহূর্তে এই ধরনের আইনি চ্যালেঞ্জ কেবল ইসির কাজকেই নয়, বরং সামগ্রিক নির্বাচনি প্রক্রিয়াকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে। রিটের শুনানি ও রায়ের ওপর নির্ভর করছে পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়ার গতিপথ। অন্যান্য রাজনৈতিক দল অবশ্য এই রিটের সমালোচনা করে এটিকে 'আদালতকে ব্যবহার' করার চেষ্টা বলেও মন্তব্য করেছে। ইসিকে এখন আইনিভাবে এই পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হবে।
রাজনৈতিক পরিবেশ ও অংশীদারিত্বের প্রশ্ন
একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য কেবল ইসির কারিগরি প্রস্তুতিই যথেষ্ট নয়; এর জন্য প্রয়োজন একটি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড এবং রাজনৈতিক দলগুলোর স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। এই ক্ষেত্রে ইসির প্রস্তুতি নিয়ে কিছু উদ্বেগ এখনও রয়ে গেছে:
প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা: প্রশাসনের রদবদল, বিশেষত ডিসি-এসপি বদলির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব থাকার উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন কোনো কোনো রাজনৈতিক নেতা। নির্বাচন কমিশনকে এই বিষয়ে নজর দিতে হবে এবং এর নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে।
লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড: কালো টাকার ব্যবহার বন্ধ করা এবং সকল দলের জন্য সমান সুযোগ বা 'লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড' নিশ্চিত করার জন্য ইসির দৃঢ় পদক্ষেপের দিকে সকলে তাকিয়ে আছে।
অংশগ্রহণ ও প্রচারণা: বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ অনেক দলই তফসিল ঘোষণার আগেই প্রার্থী মনোনয়ন করে জনসংযোগ শুরু করেছে। নির্বাচন কমিশনারের ভাষ্য অনুযায়ী, ভোটারদের আগ্রহও এবার বেশি। তবে, বড় দলগুলোর রাজনৈতিক সমঝোতা ও জোটের বিষয়টি এখনও পরিষ্কার না হওয়ায়, নির্বাচনের চূড়ান্ত দৃশ্যপট কিছুটা ধোঁয়াশাচ্ছন্ন।
চূড়ান্ত বিশ্লেষণ: প্রস্তুত, তবে শর্তসাপেক্ষে
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আয়োজনে নির্বাচন কমিশন অবকাঠামোগত ও লজিস্টিক দিক থেকে প্রায় শতভাগ প্রস্তুত। ভোটার তালিকা, কেন্দ্র নির্ধারণ, এবং আইনি সংস্কারের মতো অভ্যন্তরীণ কাজগুলো গুছিয়ে আনা হয়েছে। একযোগে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনের জন্য ভোটের সময় বৃদ্ধি এবং গোপন কক্ষ বাড়ানোর মতো বাস্তবিক পদক্ষেপ গ্রহণের চিন্তাভাবনা ইসির সক্ষমতার প্রমাণ দেয়।
তবে, এই প্রস্তুতি 'শর্তসাপেক্ষে' প্রস্তুত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এর প্রধান শর্তগুলো হলো:
১. আইনি বাধা দূরীকরণ: হাইকোর্টে দায়ের করা রিট নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তফসিল ঘোষণা এবং নির্বাচন প্রক্রিয়ার ওপর একটি অনিশ্চয়তার কালো ছায়া রয়ে যাবে।
২. রাজনৈতিক আস্থা অর্জন: একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে ইসির প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা বজায় রাখা এবং সকল দলের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
নির্বাচন কমিশনারের প্রত্যাশা, এই নির্বাচন একটি "ইতিহাস সৃষ্টিকারী নির্বাচন" হবে। সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে হলে ইসিকে কেবল কারিগরি প্রস্তুতি নয়, বরং আইনি ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলোকেও দক্ষতার সাথে মোকাবিলা করতে হবে। পুরো দেশের নজর এখন ইসির চূড়ান্ত পদক্ষেপ এবং আদালতের সিদ্ধান্তের দিকে।

মন্তব্যসমূহ