রাজনীতিতে পরিবর্তনের হাওয়া বনাম মিডিয়ার ‘তৈলমর্দন’: নতুন বাংলাদেশ কি পারবে স্বৈরাচারী বৃত্ত ভাঙতে?

ব্যাঙেরছাতা
রাজনীতিতে পরিবর্তনের হাওয়া বনাম মিডিয়ার ‘তৈলমর্দন’: নতুন বাংলাদেশ কি পারবে স্বৈরাচারী বৃত্ত ভাঙতে? ছবি - ব্যাঙেরছাতা


দীর্ঘ দেড় দশকের নির্বাসন এবং রাজনৈতিক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে দেশে ফিরেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তার এই প্রত্যাবর্তন কেবল একটি রাজনৈতিক দলের নেতার দেশে ফেরা নয়, বরং ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী 'নতুন বাংলাদেশ' গঠনের প্রক্রিয়ায় একটি বড় পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। সাংবাদিক মাসুদ কামালের সাম্প্রতিক একটি তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণধর্মী ভিডিওতে এই নতুন রাজনীতির সম্ভাবনা এবং এর বিপরীতে আমাদের মিডিয়ার চিরাচরিত ‘তৈলমর্দন’ বা মুসাহেবি করার পুরনো অভ্যাস নিয়ে চমৎকার আলোকপাত করা হয়েছে। তিনি দেখিয়েছেন, কীভাবে ক্ষমতা বা নেতৃত্বের পটপরিবর্তনের সাথে সাথে মিডিয়ার সুর বদলে যায় এবং এই অতি-ভক্তিই শেষ পর্যন্ত কীভাবে একজন নেতাকে জনগণের থেকে বিচ্ছিন্ন করে স্বৈরাচারী করে তোলে। আজকের এই আর্টিকেলে আমরা সেই ভিডিওর মূল নির্যাস এবং বাংলাদেশের মিডিয়া ও রাজনীতির গভীর সংকট নিয়ে আলোচনা করব।

নতুন রাজনীতির ইতিবাচক পদক্ষেপ: তারেক রহমানের আচরণিক পরিবর্তন

মাসুদ কামালের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, তারেক রহমানের এবারের প্রত্যাবর্তনে বেশ কিছু চোখে পড়ার মতো পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে যা সাধারণ মানুষের মধ্যে কৌতূহল ও আশার সৃষ্টি করেছে। সাধারণত বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বড় রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের জন্য রাজকীয় আয়োজন, উঁচু মঞ্চ এবং জাঁকজমকপূর্ণ সিংহাসন সদৃশ চেয়ারের ব্যবস্থা থাকে। কিন্তু তারেক রহমান এবার সমাবেশে সাধারণ প্লাস্টিকের চেয়ারে বসেছেন। এটি একটি ছোট বিষয় মনে হতে পারে, কিন্তু রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে এর প্রতীকী মূল্য অনেক। এটি মূলত তৃণমূলের নেতাকর্মী এবং সাধারণ মানুষের সাথে একাত্ম হওয়ার একটি বার্তা।

মাসুদ কামাল যথার্থই বলেছেন যে, এই পরিবর্তনগুলো যেন কেবল একদিনের 'ফটো সেশন' বা লোকদেখানো আচরণ না হয়। যদি এটি একটি স্থায়ী রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে রূপ নেয়, তবেই তা সার্থক হবে। নেতার এই সাধারণ জীবনযাপনের ভঙ্গি যদি দলের নিচের স্তরের নেতাদের মধ্যেও সঞ্চারিত হয়, তবে দেশের মানুষ একজন প্রকৃত জনবান্ধব নেতা খুঁজে পাবে।

পরিবেশ সচেতনতা ও পরিচ্ছন্নতা: একটি অনন্য রাজনৈতিক দৃষ্টান্ত

ভিডিওটিতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে জনসভা পরবর্তী পরিবেশ রক্ষার বিষয়টি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে জনসভা মানেই ছিল ময়লা-আবর্জনা, প্লাস্টিকের বোতল এবং সাধারণ মানুষের চরম ভোগান্তি। কিন্তু তারেক রহমানের আগমনের পর ৩০০ ফিট এলাকায় যে দৃশ্য দেখা গেছে, তা ছিল অভাবনীয়। সমাবেশের পর বিএনপির নেতাকর্মীরা নিজেরা ঝাড়ু ও বেলচা নিয়ে পরিচ্ছন্নতা অভিযানে নেমে পড়েছিলেন। তারা কেবল নিজেদের ময়লা পরিষ্কার করেননি, বরং ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের কর্মীদের সাথে সহযোগিতা করেছেন।

সবচেয়ে উল্লেখ করার মতো বিষয় ছিল ক্ষতিগ্রস্ত গাছগুলো নিয়ে তাদের পরিকল্পনা। জনসমাগমের চাপে অনেক চারাগাছ নষ্ট হয়েছিল, যা তারা পুনরায় রোপণের অঙ্গীকার করেছেন। মাসুদ কামাল এই উদ্যোগকে 'ঐতিহাসিক' বলে অভিহিত করেছেন। কারণ, রাজনৈতিক দলগুলো সাধারণত ক্ষমতার দাপটে পরিবেশ বা সাধারণের জানমালের ক্ষয়ক্ষতিকে উপেক্ষা করে। এই প্রথম কোনো দল তাদের সমাবেশের কারণে সৃষ্ট সমস্যার দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়েছে। এই সংস্কৃতি যদি বজায় থাকে, তবে তা অন্যান্য দলগুলোর ওপর এক ধরনের নৈতিক চাপ তৈরি করবে এবং জনগণের মনে রাজনীতির প্রতি হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনবে।

মিডিয়ার ‘তেলের বোতল’: স্বৈরাচার তৈরির নীরব কারখানা

আর্টিকেলটির সবচেয়ে স্পর্শকাতর এবং গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো মিডিয়ার ভূমিকা। সাংবাদিক মাসুদ কামাল অত্যন্ত সাহসের সাথে আমাদের দেশের মূলধারার সংবাদপত্রগুলোর প্রথম পাতার চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, কীভাবে ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর মিডিয়া তাদের পুরনো অভ্যাস ত্যাগ করতে ব্যর্থ হয়েছে। ৫ই আগস্টের আগে যারা এক নেত্রীর প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিল, আজ তারাই আবার তারেক রহমানের বন্দনায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।

তিনি কয়েকটি সুনির্দিষ্ট উদাহরণ দিয়েছেন:

দৈনিক আমাদের সময়: কোনো সংবাদ ছাড়াই শুধুমাত্র ছবি ও বিশাল হেডলাইন দিয়ে পত্রিকা সাজিয়েছে, যেন এটি কোনো সংবাদপত্রের প্রথম পাতা নয় বরং কোনো নেতার পোস্টার।

ইনকিলাব ও ইত্তেফাক: এসব পত্রিকা তাদের প্রথম পাতার প্রায় সবটুকুই ব্যয় করেছে তারেক রহমানের গুণগানে, যেন দেশে আর কোনো জাতীয় বা আন্তর্জাতিক সমস্যা নেই।

মানবজমিন: তাদের শিরোনামে তাকে ‘বাংলার লুথার কিং’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে, যা একজন নেতার প্রতি অতি-প্রশংসার এক চরম বহিঃপ্রকাশ।

মাসুদ কামাল একে অভিহিত করেছেন ‘নির্জলা তেল’ বা 'মুসাহেবি' হিসেবে। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, শেখ হাসিনাকেও এভাবেই মিডিয়া একসময় 'অপরাজেয়' এবং 'মহামানব' হিসেবে তুলে ধরেছিল। যখন চারপাশ থেকে সম্পাদক এবং বুদ্ধিজীবীরা বলতে থাকেন ‘নেতা, আপনার কোনো ভুল নেই’, তখন সেই নেতা ধীরে ধীরে নিজেকে আইনের ঊর্ধ্বে মনে করতে শুরু করেন। এই তৈলমর্দনই শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রের কবর খনন করে।

স্বৈরাচারী মানসিকতা বনাম নতুন বাংলাদেশ

একজন নেতা কখন স্বৈরাচারী হয়ে ওঠেন? যখন তার চারপাশে কেবল চাটুকাররা ভিড় জমায়। মাসুদ কামালের মতে, মশা বা চাটুকার কেবল দল থেকেই হয় না, বরং মিডিয়া এবং বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী মহল থেকে তৈরি হয়। এই চাটুকাররা নেতাকে এটা বোঝাতে সক্ষম হয় যে, দেশের ওপর কেবল তারই অধিকার আছে।

তারেক রহমান লন্ডনে থাকাকালীন যখন ‘জিন্দাবাদ’ স্লোগান দিতে মানা করেছিলেন, তখন তিনি একটি ইতিবাচক সংকেত দিয়েছিলেন। কিন্তু দেশে ফেরার পর মিডিয়া ও কর্মীদের এই অতি-উৎসাহ যদি তিনি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারেন, তবে পুরনো স্বৈরাচারী বৃত্তে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়। নেতার দৃষ্টি কেবল স্লোগানধারী বা প্লাকার্ডধারীদের ওপর থাকা উচিত নয়, বরং পুরো দেশের জনগণের অভাব-অভিযোগের ওপর থাকা উচিত।

মিডিয়ার প্রফেশনালিজম ও নিরপেক্ষতার অভাব

মাসুদ কামাল তার বিশ্লেষণে কিছু ব্যতিক্রমী মিডিয়ার নামও উল্লেখ করেছেন। যেমন প্রথম আলো, সমকাল বা আজকের পত্রিকা—যারা তারেক রহমানের খবর দেওয়ার পাশাপাশি অন্যান্য জাতীয় খবর এবং মানুষের জীবনযাত্রার সমস্যাগুলোকেও গুরুত্ব দিয়েছে। একটি গণতান্ত্রিক দেশে মিডিয়ার কাজ হলো আয়নার মতো কাজ করা, নেতার ভুল ধরিয়ে দেওয়া এবং জনগণের পক্ষ নেওয়া। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, বাংলাদেশের অধিকাংশ মিডিয়া হাউজ এখন রাজনৈতিক দলের 'পিআর এজেন্সি' বা জনসংযোগ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এই সংস্কৃতির অবসান না ঘটলে 'নতুন বাংলাদেশ' কেবল একটি স্লোগান হিসেবেই থেকে যাবে।

চাটুকারিতা সংস্কৃতি থেকে উত্তরণের পথ

এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য মাসুদ কামাল সরাসরি তারেক রহমানের প্রতি একটি জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তারেক রহমানের উচিত তার অফিস থেকে এই পত্রিকাগুলোকে ফোন করে বলে দেওয়া যে—"দয়া করে আমার মুসাহেবি বন্ধ করুন।" নেতার পক্ষ থেকে যদি কঠোর নির্দেশনা থাকে যে, অতি-প্রশংসা বা চাটুকারিতাকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না, তবেই মিডিয়া ও কর্মীরা সীমার মধ্যে থাকবে।

রাজনীতিতে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখতে হলে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং নির্মোহতা অপরিহার্য। সাংবাদিক ও সম্পাদকদের মনে রাখা উচিত যে, তাদের আনুগত্য হওয়া উচিত সত্যের প্রতি, কোনো বিশেষ ব্যক্তি বা দলের প্রতি নয়।

ব্যক্তির ঊর্ধ্বে নীতি এবং জনগণের আকাঙ্ক্ষা

পরিশেষে বলা যায়, সাংবাদিক মাসুদ কামালের এই বিশ্লেষণটি আমাদের জাতীয় বিবেকের জন্য একটি বড় ধাক্কা। তিনি কেবল মিডিয়ার সমালোচনা করেননি, বরং একটি সম্ভাব্য স্বৈরাচারী শাসনের উত্থান সম্পর্কে আমাদের সতর্ক করে দিয়েছেন। বাংলাদেশের মানুষ গত দেড় দশকে এক অসহনীয় শাসন ব্যবস্থা প্রত্যক্ষ করেছে। সেই অন্ধকার সময় থেকে মুক্তির পর এখন ছাত্র-জনতার প্রত্যাশা হলো—একটি ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক সমাজ।

তারেক রহমান যদি সত্যিই নতুন রাজনীতির অঙ্গীকার রক্ষা করতে চান, তবে তাকে এই চারপাশের ‘তৈলমর্দনকারী’ গোষ্ঠীকে প্রতিহত করতে হবে। প্লাস্টিকের চেয়ারে বসা কিংবা রাস্তা পরিষ্কার করা যেমন আশাব্যঞ্জক শুরু, তেমনি মিডিয়ার এই পুরনো ধারার চাটুকারিতা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে কোনো ব্যক্তি পূজিত হবেন না, বরং জবাবদিহিতা থাকবে প্রতিটি কাজে। সাংবাদিক মাসুদ কামালের এই স্পষ্টবাদী বক্তব্য আশা করি রাজনৈতিক নেতাকর্মী, সংবাদকর্মী এবং সচেতন নাগরিক—সবাইকেই নতুন করে ভাবাতে সাহায্য করবে।

মন্তব্যসমূহ