গণপিটুনি ও মব সন্ত্রাসের ভয়াবহ রূপ: বিপন্ন মানবতা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি
![]() |
| গণপিটুনি ও মব সন্ত্রাসের ভয়াবহ রূপ: বিপন্ন মানবতা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি। ছবি - ব্যাঙেরছাতা |
সভ্য সমাজের প্রধান পরিচয় হলো আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীলতা এবং বিচার প্রক্রিয়ার ওপর মানুষের অবিচল আস্থা। কিন্তু যখন একটি জনপদ আইনের শাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নিজেই সাজা কার্যকর করতে শুরু করে, তখন তাকে আর সমাজ বলা চলে না; তা হয়ে ওঠে এক অরাজক অরণ্য। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে ‘মব জাস্টিস’ (Mob Justice) বা গণপিটুনির ঘটনাগুলো যে নৃশংস ও ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে, তা কেবল অপরাধ নয়, বরং আমাদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর গভীর ক্ষতের প্রতিফলন। রাস্তাঘাট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, এমনকি আদালত প্রাঙ্গণ—কোথাও আজ জীবনের নিরাপত্তা নেই। গুজবের ডালপালা যখন কোনো নিরীহ মানুষের রক্ত ঝরায়, তখন স্তব্ধ হয়ে যায় মানবিক বিবেক। এই অরাজকতা রুখতে না পারলে জাতীয় নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ার উপক্রম হবে।
মব সন্ত্রাস: বর্তমান প্রেক্ষাপট ও পরিসংখ্যানে আঁততায়ী চিত্র
২০২৪ এবং ২০২৫ সালের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশে গণপিটুনির ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত এক বছরে মব সন্ত্রাসের শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১৮৪ জন। এই সংখ্যার বাইরেও অসংখ্য মানুষ স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন।
ভৌগোলিক প্রেক্ষাপটে ঢাকা বিভাগেই নিহতের সংখ্যা সর্বোচ্চ ৭২ জন, যা নির্দেশ করে যে খোদ রাজধানীর বুকেও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নজরদারি যথেষ্ট নয়। এছাড়া চট্টগ্রাম, খুলনা ও রাজশাহীতেও এই নৃশংসতার প্রভাব দেখা গেছে। পরিসংখ্যানের এই শুষ্ক সংখ্যাগুলো আসলে একেকটি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গ এবং কান্নার ইতিহাস। ২০১৮ থেকে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত পাঁচ শতাধিক মানুষ গণপিটুনিতে প্রাণ হারিয়েছেন। বিশেষ করে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাময়িক নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে এই প্রবণতা যেন এক সংক্রামক মরণব্যাধিতে রূপ নিয়েছে।
মব জাস্টিসের মনস্তাত্ত্বিক ও সমাজতাত্ত্বিক ব্যবচ্ছেদ
উত্তেজিত জনতা কেন হুট করে আইন নিজের হাতে তুলে নেয়? সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, এর পেছনে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এবং কিছু সুনির্দিষ্ট মনস্তাত্ত্বিক কারণ কাজ করে:
১. বিচারব্যবস্থার ওপর চরম আস্থাহীনতা: যখন মানুষ মনে করে প্রচলিত আইনি পথে অপরাধীর বিচার পেতে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হবে কিংবা অর্থের বিনিময়ে অপরাধী পার পেয়ে যাবে, তখন তারা তাৎক্ষণিক ‘পাবলিক জাস্টিস’ বা মাঠের বিচারে ঝুঁকে পড়ে। এই আস্থাহীনতা রাষ্ট্রযন্ত্রের জন্য একটি বড় ব্যর্থতা।
২. মনস্তাত্ত্বিক দে-ইনডিভিজুয়েশন (De-individuation): ভিড়ের মধ্যে মানুষ নিজের ব্যক্তিগত নৈতিকতা এবং পরিচয় হারিয়ে ফেলে। সে তখন সমষ্টির অংশ হয়ে যায় এবং ভাবে যে, শত শত মানুষের ভিড়ে তাকে কেউ শনাক্ত করতে পারবে না। এই গোপন থাকার মানসিকতা তাকে ভয়াবহ নৃশংসতা করতে সাহস জোগায়।
৩. গুজব ও ইনফরমেশন পলিউশন: বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যেন আগুনের সলতে হিসেবে কাজ করছে। ফেসবুক বা হোয়াটসঅ্যাপে 'ধর্ম অবমাননা', 'চোর' বা 'ছেলেধরা'র মতো স্পর্শকাতর তকমা ব্যবহার করে মুহূর্তের মধ্যে শত শত মানুষকে উস্কে দেওয়া হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত শত্রুতা মেটাতে পরিকল্পিতভাবে গুজব ছড়ানো হচ্ছে।
সাম্প্রতিক কিছু আলোচিত ও পৈশাচিক ঘটনা
সাম্প্রতিক সময়ের কিছু ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, আমরা আধুনিক যুগে বাস করলেও মানসিকভাবে কতটা আদিম রয়ে গেছি:
ভলুকার দিপু চন্দ্র দাস হত্যাকাণ্ড: ময়মনসিংহের ভালুকায় দিপু চন্দ্র দাস নামে এক পোশাক শ্রমিককে ধর্ম অবমাননার মিথ্যা অভিযোগে পিটিয়ে হত্যা করা হয় এবং পরে তার শরীরে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে তদন্তে উঠে আসে যে, সহকর্মীদের সাথে তুচ্ছ বিবাদ এবং বেতন সংক্রান্ত বিরোধের জেরে তাকে ফাঁসাতে এই গুজব ছড়ানো হয়েছিল। এটি মব জাস্টিসের সবচেয়ে কলঙ্কিত অধ্যায়।
আদালত প্রাঙ্গণে হামলা: কেবল রাস্তাঘাটে নয়, দেশের সর্বোচ্চ নিরাপদ স্থান হিসেবে পরিচিত আদালত প্রাঙ্গণেও সাবেক মন্ত্রী ও অভিযুক্ত ব্যক্তিদের ওপর হামলা চালানো হচ্ছে। যখন বিচারালয়ের ভেতরেই আসামির নিরাপত্তা থাকে না, তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের স্থায়ী নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সহিংসতা: খোদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে চোর সন্দেহে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। মেধাবী তরুণদের হাত যখন রক্তে রঞ্জিত হয়, তখন সমাজের নৈতিক পতন স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
আইনের কঠোর বিধান এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন
বাংলাদেশের প্রচলিত আইন এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদ অনুযায়ী গণপিটুনি একটি চরম গর্হিত অপরাধ।
দণ্ডবিধি ১৮৬০: দণ্ডবিধির ৩০২ ধারা অনুযায়ী যে কোনো ব্যক্তিকে হত্যার দায়ে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড। গণপিটুনির ক্ষেত্রেও এটি প্রযোজ্য। এছাড়া ১৪১ থেকে ১৪৯ ধারা পর্যন্ত ‘বেআইনি সমাবেশ’ (Unlawful Assembly) এবং দাঙ্গার জন্য কঠোর সাজার বিধান রয়েছে। আইনের দৃষ্টিতে 'মব' বা জনতা বলে কোনো ছাড় নেই; প্রতিটি ব্যক্তি পৃথকভাবে খুনের দায়ে অভিযুক্ত হতে পারে।
মানবাধিকার সনদ: জাতিসংঘের মানবাধিকার সনদের ১০ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রত্যেক মানুষের একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থনের এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার মৌলিক অধিকার আছে। মব জাস্টিস কেবল এই অধিকারই হরণ করে না, বরং এটি মানুষের বেঁচে থাকার অধিকারকে সরাসরি অস্বীকার করে।
মব কালচারের দীর্ঘমেয়াদী বিষক্রিয়া
একটি দেশে মব কালচার প্রতিষ্ঠিত হলে তার ফলাফল কেবল ব্যক্তিগত প্রাণহানির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না:
অর্থনৈতিক বিপর্যয়: কোনো দেশ যদি ‘আইনহীন দেশ’ হিসেবে পরিচিতি পায়, তবে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা তাদের পুঁজি সরিয়ে নেয়। শিল্পাঞ্চলে বিশৃঙ্খলা হলে উৎপাদন ব্যাহত হয়, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে জিডিপিতে।
ভিকটিম ব্লেমিং সংস্কৃতি: মব জাস্টিসের ফলে সমাজে এমন একটি পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় যেখানে আক্রান্ত ব্যক্তিকেই দোষারোপ করা হয়। এতে প্রকৃত অপরাধীরা আড়ালে চলে যায় এবং নিরপরাধ মানুষ বলির পাঁঠা হয়।
জাতীয় নিরাপত্তার হুমকি: আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা বাড়তে থাকলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি ভয় ও ভক্তি লোপ পায়। এতে রাষ্ট্র এক সময় ‘ব্যর্থ রাষ্ট্রে’ পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।
উত্তরণের কার্যকর সমাধান: আমাদের করণীয় কী?
এই ভয়াবহ মব সন্ত্রাস থেকে মুক্তি পেতে হলে রাষ্ট্র, গণমাধ্যম এবং সমাজকে ত্রিভুজ আকৃতির শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে:
পুলিশিং ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন: আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও জনবান্ধব হতে হবে। প্রতিটি থানায় ‘কুইক রেসপন্স টিম’ থাকতে হবে যারা সংঘাতের খবর পাওয়া মাত্র ঘটনাস্থলে পৌঁছাবে। জনগণের বিশ্বাস অর্জন করতে হবে যে, পুলিশ অপরাধীকে ধরলে তার যথাযথ বিচার হবেই।
দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল: গণপিটুনির ঘটনাগুলোর বিচার সাধারণ আদালতের দীর্ঘসূত্রিতা থেকে বের করে এনে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে করতে হবে। যখন মানুষ দেখবে মব সন্ত্রাসে জড়িত থাকার দায়ে ১০-১৫ জনের ফাঁসি বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে, তখন পরবর্তী সময়ে কেউ আইন হাতে নিতে ভয় পাবে।
ডিজিটাল লিটারেসি ও প্রচারণা: তথ্য যাচাই না করে কোনো সংবাদ শেয়ার না করার বিষয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ক্যাম্পেইন চালাতে হবে। বিটিআরসি-কে গুজবের উৎস খুঁজে বের করার সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা: মসজিদ, মন্দির ও গির্জা থেকে ধৈর্য এবং বিচার ব্যবস্থার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের বিষয়ে নিয়মিত বয়ান বা আলোচনা করতে হবে। প্রতিশোধের চেয়ে আইনি প্রক্রিয়া যে উত্তম, তা মানুষকে বোঝাতে হবে।
গণপিটুনি কোনোভাবেই বিচার হতে পারে না; এটি স্রেফ একটি নৃশংস হত্যাকাণ্ড। একটি অপরাধের বিপরীতে আরেকটি বড় অপরাধ করে সমাজকে সংশোধন করা সম্ভব নয়। আমরা যদি আজ অন্যের ওপর হওয়া মব জাস্টিসকে মুখ বুজে সহ্য করি বা সমর্থন দিই, তবে মনে রাখতে হবে—কাল হয়তো আপনি বা আপনার প্রিয়জনও কোনো মিথ্যা গুজবের ভিত্তিতে এই হিংস্র জনতার কবলে পড়তে পারেন।
একটি নিরাপদ, মানবিক এবং ন্যায়বিচার ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়তে হলে আমাদের প্রত্যেককে সচেতন হতে হবে। গুজবকে ঘৃণা করুন, আইনকে সম্মান করুন এবং মানবতাকে শ্রেষ্ঠ জ্ঞান করুন। আইনের শাসন সমুন্নত রাখাই হোক ২০২৫ সালের বাংলাদেশের প্রধান অঙ্গীকার।
ব্লগার নোট: এই লেখাটি কেবল একটি সংবাদ বিশ্লেষণ নয়, বরং এটি আমাদের সমাজ কাঠামোর একটি সংকটময় মুহূর্তের দলিল। আপনি যদি এই লেখার সাথে একমত হন বা আপনার কোনো ভিন্নমত থাকে, তবে কমেন্ট বক্সে আমাদের জানান। আপনার একটি সচেতন মন্তব্য আরও অনেককে আইন মেনে চলতে অনুপ্রাণিত করতে পারে। শেয়ার করে লেখাটি ছড়িয়ে দিন যাতে সমাজ থেকে এই অন্ধকার দূর হয়।

মন্তব্যসমূহ