পাকিস্তানের উচ্চাভিলাষী ভূ-রাজনৈতিক চাল, ভারতকে বাদ দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন ব্লক: কতটা সফল হবে?

ব্যাঙেরছাতা

দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) আজ এক কফিনবন্দী বাস্তবতা। ভারত ও পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের বৈরিতা এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতির প্ল্যাটফর্মটিকে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে কার্যত অকার্যকর করে রেখেছে। এই অচলাবস্থার সুযোগ নিয়ে সম্প্রতি পাকিস্তান এক অত্যন্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষী ভূ-রাজনৈতিক উদ্যোগের ঘোষণা দিয়েছে, যার মূল লক্ষ্য হলো দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতকে বাদ দিয়ে একটি বিকল্প আঞ্চলিক ব্লক তৈরি করা। এই ব্লকের কেন্দ্রে থাকবে চীন।

পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার সম্প্রতি 'ইসলামাবাদ কংক্লেভ' ফোরামে আনুষ্ঠানিকভাবে এই উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য স্পষ্ট: আঞ্চলিক অগ্রাধিকার আর কোনো 'একটি দেশের অনমনীয় মনোভাবের কাছে জিম্মি' হয়ে থাকতে পারে না, যা স্পষ্টতই ভারতের প্রতি ইঙ্গিত। এই প্রস্তাব দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রে এক নতুন মেরুকরণের জন্ম দিতে পারে।

এই নিবন্ধে আমরা পাকিস্তানের এই নতুন উদ্যোগের নেপথ্যের কারণ, এর লক্ষ্য, এবং আঞ্চলিক রাজনীতিতে এর সাফল্যের সম্ভাবনা নিয়ে আল-জাজিরার প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে এক পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ তুলে ধরব।

সার্কের মৃত্যুঘণ্টা: বিকল্প জোটের আবশ্যকতা

আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে সার্কের ব্যর্থতা এই নতুন ব্লক তৈরির মূল কারণ। ১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সংস্থাটির লক্ষ্য ছিল সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং সাংস্কৃতিক বিনিময় বাড়ানো। কিন্তু সদস্য রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক অবিশ্বাস, বিশেষ করে ১৯৪৭ সালের বিভাজন থেকে শুরু হওয়া ভারত ও পাকিস্তানের ঐতিহাসিক দ্বন্দ্ব, এটিকে কখনোই ফলপ্রসূ হতে দেয়নি।

সার্ক কেন নিষ্ক্রিয়:

ভারত-পাকিস্তান বৈরিতা: ২০১৬ সালে উরি হামলার পর ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিতব্য সার্ক সম্মেলন ভারত বয়কট করলে সংস্থাটি কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে।

'বিগ ব্রাদার' সিনড্রোম: ভারত আয়তন, অর্থনীতি ও সামরিক শক্তিতে অন্যদের চেয়ে বহুগুণ বড় হওয়ায় ছোট সদস্য রাষ্ট্রগুলো সবসময় ভারতের 'একচেটিয়া নেতৃত্ব' এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের আশঙ্কা করে এসেছে। নেপাল, শ্রীলঙ্কা এবং সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর মধ্যে ভারতের আঞ্চলিক প্রভাব নিয়ে এক ধরনের অসন্তোষ সৃষ্টি হয়।

রাজনৈতিক মতৈক্যের অভাব: সার্কের মূলনীতি অনুসারে, কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হলে সর্বসম্মত অনুমোদন প্রয়োজন, যা ভারত-পাকিস্তানের বিরোধিতার কারণে সবসময়ই অসম্ভব হয়ে পড়ে।

পাকিস্তানের নতুন ব্লক তৈরির প্রস্তাব এমন এক সময়ে এল, যখন দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক রাজনীতিতে এক ব্যাপক পটপরিবর্তন ঘটেছে। বিশেষ করে, গত বছরের আগস্টে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারতে আশ্রয় দেওয়ায় ঢাকা ও নয়াদিল্লির সম্পর্কে বড় ধরনের অবনতি দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতি ভারতকে একঘরে করার পাকিস্তানের প্রচেষ্টার জন্য এক অপ্রত্যাশিত অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে।

চীন-পাকিস্তান-বাংলাদেশ (C-P-B) অক্ষ: উদ্দেশ্য ও কৌশল

পাকিস্তানের এই নতুন জোটের সূচনা হচ্ছে প্রাথমিকভাবে একটি ত্রিমুখী সহযোগিতা কাঠামোর মাধ্যমে, যেখানে রয়েছে বাংলাদেশ, চীন এবং পাকিস্তান (C-P-B)। গত জুনে চীনের ইউনান প্রদেশের কুনমিং শহরে এই তিন দেশের কূটনীতিকেরা একটি উচ্চপর্যায়ের আলোচনা করেছেন।

প্রধান উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য

পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার এই উদ্যোগের লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন:

সংঘাতের বদলে সহযোগিতা: 'একজন জিতলে, অন্যজন হারবে'—এমন নীতির বদলে সংঘাতের ঊর্ধ্বে উঠে পারস্পরিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেওয়া।

অর্থনৈতিক সংযোগ ও উন্নয়ন: এই জোট মূলত অর্থনীতি, প্রযুক্তি এবং সংযোগের (Connectivity) মতো ব্যবহারিক বিষয়গুলোতে পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট সহযোগিতা বাড়াতে চায়।

ভারতের প্রভাব সীমিতকরণ: এই উদ্যোগের প্রাথমিক লক্ষ্য অর্থনৈতিক সহযোগিতা দেখানো হলেও, এর মূল কৌশলগত উদ্দেশ্য হলো ভারতকে বাদ দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক নেতৃত্বে চীনের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা এবং ভারতের প্রভাব খর্ব করা।

চীনের কৌশলগত ভূমিকা

চীন এই নতুন ব্লকের মেরুদণ্ড (Backbone) হিসেবে কাজ করবে। এটি বেইজিংয়ের আঞ্চলিক কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ:

বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI): নতুন এই ব্লকটি মূলত চীনের মেগা প্রকল্প 'বিআরআই' এবং চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোরের (CPEC) আঞ্চলিক সম্প্রসারণের পথ প্রশস্ত করবে। চীন দক্ষিণ এশিয়ার অবকাঠামো এবং অর্থনৈতিক আন্তঃনির্ভরতার ওপর ভিত্তি করে একটি কৌশলগত জোট তৈরি করতে আগ্রহী।

'সাকা' জোটের গুঞ্জন: ভারতীয় সংবাদমাধ্যম অনুসারে, এই প্রস্তাবিত জোটের একটি সম্ভাব্য নাম হতে পারে 'সাউথ এশিয়া-চায়না অ্যালায়েন্স—SACA (সাকা)'।

অর্থনৈতিক আকর্ষণ: চীনের বিশাল অর্থনৈতিক শক্তি এবং বিনিয়োগের ক্ষমতা ছোট দেশগুলোর কাছে বড় আকর্ষণ হিসেবে কাজ করবে, যারা ভারতের প্রভাব এড়িয়ে নিজেদের উন্নয়ন নিশ্চিত করতে চাইছে।

আঞ্চলিক মেরুকরণ: ভারতের বিমসটেক (BIMSTEC) কৌশল

পাকিস্তানের এই নতুন উদ্যোগকে বিশ্লেষণ করতে হলে আঞ্চলিক রাজনীতিতে ভারতের কৌশলকে বিবেচনা করা অপরিহার্য। ভারত অনেক আগেই সার্কের পুনরুজ্জীবনের আশা ছেড়ে দিয়ে তার পররাষ্ট্রনীতিতে বিমসটেক (Bay of Bengal Initiative for Multi-Sectoral Technical and Economic Cooperation)-কে প্রধান প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বেছে নিয়েছে।

বিমসটেক হলো বঙ্গোপসাগর অঞ্চলের সাতটি দেশ—ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার এবং থাইল্যান্ডের একটি জোট। লক্ষ্যণীয়, এই জোটে পাকিস্তান নেই।

বিমসটেকের গুরুত্ব: ভারতের 'অ্যাক্ট ইস্ট' বা পূর্বমুখী নীতি বাস্তবায়নে বিমসটেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি দক্ষিণ এশিয়াকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার (আসিয়ান) সঙ্গে যুক্ত করার একটি সেতু হিসেবে কাজ করে।

পাকিস্তানের বিচ্ছিন্নতা: বিমসটেকে পাকিস্তানের অনুপস্থিতি আঞ্চলিক সহযোগিতা থেকে পাকিস্তানকে কার্যত বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। ভারতের কাছে বিমসটেক একটি 'পরিষ্কার' প্ল্যাটফর্ম, যেখানে ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্বের ছায়া নেই এবং ভারত তার আঞ্চলিক এজেন্ডা দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।

ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য: চীন-পাকিস্তান-বাংলাদেশের নতুন ব্লক যখন ভারতকে প্রান্তিক করার চেষ্টা করছে, তখন ভারত বিমসটেককে আরও শক্তিশালী করে তার আঞ্চলিক প্রভাব বজায় রাখার চেষ্টা করছে। এটি দক্ষিণ এশিয়ায় দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী অর্থনৈতিক ব্লকের উত্থানের ইঙ্গিত দেয়।

সাফল্যের পথে চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ গতিপথ

পাকিস্তানের প্রস্তাবটি নিঃসন্দেহে 'যতটা না কার্যকর, তার চেয়ে বেশি উচ্চাকাঙ্ক্ষী' (লাহোর বিশ্ববিদ্যালয়ের রাবিয়া আখতারের মন্তব্য)। এই উদ্যোগ সফল হবে কি না, তা নির্ভর করছে একাধিক অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জের ওপর:

প্রধান চ্যালেঞ্জসমূহ:

ছোট দেশগুলোর ভারসাম্য রক্ষার নীতি: শ্রীলঙ্কা, নেপাল এবং মালদ্বীপের মতো ছোট দেশগুলো চীনের অর্থনৈতিক সুবিধা নিতে চাইলেও ভারতের সাথে তাদের কৌশলগত এবং ভূ-রাজনৈতিক সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন করতে চাইবে না। এই দেশগুলো চীন ও ভারতের মধ্যে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখতে বাধ্য।

পাকিস্তানের অর্থনৈতিক দুর্বলতা: পাকিস্তান নিজে বর্তমানে গভীর অর্থনৈতিক সংকটে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে চীনের বিশাল অর্থনৈতিক ক্ষমতার ওপর জোটের অত্যধিক নির্ভরতা ছোট দেশগুলোর মধ্যে ঋণের ফাঁদে পড়ার (Debt Trap) ভয় সৃষ্টি করতে পারে।

বাংলাদেশের ভূমিকা: যদিও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ এই উদ্যোগে যুক্ত হয়েছে, তবুও ভারত তার নিকটতম প্রতিবেশী হওয়ায় ঢাকা তার পররাষ্ট্রনীতিতে 'ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে চীনের অর্থনৈতিক সহায়তা গ্রহণ'—এই কৌশল অনুসরণ করতে পারে।

সফলতার সম্ভাবনা:

এত চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও এই ব্লকের সফল হওয়ার কিছু সম্ভাবনাও রয়েছে:

সার্কের শূন্যতা পূরণ: সার্কের দীর্ঘদিনের নিষ্ক্রিয়তা আঞ্চলিক সহযোগিতা নিয়ে যে শূন্যতা তৈরি করেছে, এই নতুন জোট তা পূরণের সুযোগ তৈরি করছে।

অর্থনৈতিক বাস্তববাদ: চীন যেহেতু যোগাযোগ, অবকাঠামো এবং অর্থনীতির মতো বাস্তবভিত্তিক সহযোগিতার ওপর জোর দিচ্ছে, তাই রাজনৈতিক জটিলতা এড়িয়ে অর্থনৈতিক সুবিধা লাভের আশায় ছোট দেশগুলো এতে আগ্রহী হতে পারে।

আঞ্চলিক অসন্তোষ: ভারতের 'বড় ভাইসুলভ' আচরণের কারণে সৃষ্ট আঞ্চলিক অসন্তোষ এই ব্লককে বাড়তি সুবিধা দিতে পারে।

পাকিস্তান কর্তৃক ভারতকে বাদ দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় চীন-নির্ভর একটি নতুন ব্লক তৈরির চেষ্টাটি শুধু একটি কূটনৈতিক চাল নয়, এটি এই অঞ্চলের ভূ-রাজনীতিতে এক গভীর টেকটনিক শিফটের ইঙ্গিত। সার্কের পতন এবং ভারতের বিমসটেক-নির্ভরতার প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের এই পদক্ষেপ আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে পরিবর্তন আনতে চাইছে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই জোটের সাফল্যের জন্য কেবল উচ্চাকাঙ্ক্ষা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সুসংহত অর্থনৈতিক কাঠামো, পারস্পরিক আস্থা এবং চীন-পাকিস্তানের নেতৃত্ব কতটা গ্রহণযোগ্য হবে, তার ওপর। এই অঞ্চলে এখন দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী ব্লক (চীন-পাকিস্তান অক্ষ বনাম ভারত-বিমসটেক অক্ষ) গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হলো, যার পরিণতি দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতা, অর্থনীতি এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করবে। আগামী বছরগুলোই প্রমাণ করবে, দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক অগ্রাধিকার ভারতের 'অনমনীয় মনোভাবের' জিম্মিদশা থেকে মুক্ত হবে, নাকি চীনের বৃহত্তর প্রভাবের জালে বাঁধা পড়বে। এই নতুন মেরুকরণ পুরো অঞ্চলের জন্য এক সংকটপূর্ণ পরীক্ষার সময়।

মন্তব্যসমূহ