ভুয়া জরিপে আওয়ামীলীগের প্রতি ৬৯ শতাংশ মানুষের সমর্থন: প্রথম আলোর উদ্দেশ্য কী?

ব্যাঙেরছাতা

প্রথম আলো পত্রিকা কর্তৃক চলমান একটি জরিপকে, দেশের ৯৫ শতাংশ মানুষই ভুয়া মনে করে।  ​সম্প্রতি দেশের দৈনিক পত্রিকা প্রথম আলো কর্তৃক প্রকাশিত একটি তথাকথিত জনমত জরিপ বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে শুধু কৌতূহলই নয়, তীব্র বিতর্কেরও জন্ম দিয়েছে। এই জরিপে দাবি করা হয় যে, দেশের জনগণের একটি বিশাল অংশ, প্রায় ৬৯ শতাংশ, শর্তসাপেক্ষে অথবা শর্তহীনভাবে আওয়ামী লীগকে আসন্ন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে দিতে চায়। এক গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে একটি সরকার পতনের মাত্র কিছুদিন পরেই এমন একটি সংখ্যা প্রকাশ হওয়ায় রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহল এবং সাধারণ জনগণের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে—এই জরিপ কতটা বিশ্বাসযোগ্য? এবং এর মাধ্যমে প্রথম আলোর প্রকৃত উদ্দেশ্য কী?

​ইউটিউব প্ল্যাটফর্মে প্রকাশিত দুটি গভীর বিশ্লেষণমূলক ভিডিওতে (যেমন 'গভীর বিশ্লেষণ' এবং 'Talk-Bangla 24' চ্যানেলের আলোচনা) এই জরিপের ফলাফল, কার্যপদ্ধতি এবং এর নেপথ্যের রাজনৈতিক অভিসন্ধি নিয়ে যে প্রশ্নগুলো উত্থাপিত হয়েছে, সেগুলোর পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ নিচে তুলে ধরা হলো।

​প্রথম আলোর জরিপ কেন 'ভুয়া' এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত?

​ভিডিও বিশ্লেষণে আলোচকরা এই জরিপটিকে কেবল একটি সাধারণ জরিপ হিসেবে দেখতে নারাজ। তাদের মতে, এটি একটি ‘পরিকল্পিত, বানানো জরিপ’ যা ‘অসৎ উদ্দেশ্য’ সাধনের জন্য তৈরি করা হয়েছে।

​পদ্ধতিগত ত্রুটির আড়ালে জনমত বিকৃতি

​প্রথম আলোর জরিপটি প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার মূল কারণ এর তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি।

​লিখিত প্রশ্নোত্তরের সীমাবদ্ধতা: বিশ্লেষকরা প্রশ্ন তুলেছেন যে, এই জরিপে লিখিত প্রশ্নোত্তরের পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে বলে দাবি করা হলেও, বাংলাদেশের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ (আনুমানিক ৪০% মানুষ) এখনো নিরক্ষর বা লিখতে-পড়তে জানেন না। ফলে, এই পদ্ধতিটি স্বভাবতই একটি বড় সংখ্যক মানুষকে নমুনা থেকে বাদ দিয়েছে।

​সংখ্যার বিভ্রান্তি: যদি ধরেও নেওয়া হয় যে জরিপের তথ্যে দেখানো ৪৯ শতাংশ বা ৫৯ শতাংশ মানুষ সরকারের প্রতি আস্থা রেখেছে, তবে নিরক্ষর জনসংখ্যাকে বাদ দিয়ে ৬০ শতাংশের মধ্যে এই জরিপ চালানো হলে, প্রকৃতপক্ষে দেশের মোট জনসংখ্যার নিরিখে সরকারের প্রতি আস্থা বা সমর্থন ২৫ থেকে ৩০ শতাংশের বেশি হবে না। বিশ্লেষকদের দাবি, একটি আংশিক শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মতামতকে ব্যবহার করে বৃহত্তর জনগণের মতামত হিসেবে চালানোর চেষ্টা করা হয়েছে। এটি পরিসংখ্যানগতভাবে একটি গুরুতর ত্রুটি এবং জনমতকে বিকৃত করার একটি স্পষ্ট কৌশল।

​‘৬৯ শতাংশ সমর্থন’—বিপজ্জনক আখ্যান:

​এই জরিপের সবচেয়ে আলোচিত সংখ্যাটি হলো ৬৯ শতাংশ, যেখানে বলা হয়েছে মানুষ আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে দিতে চায়। তবে এর ভেতরের বিন্যাসটি লক্ষ্য করা জরুরি:

সমর্থনের ধরন

বিনা শর্তে অংশগ্রহণ ২৭.৮%

শাস্তি ও সংস্কারের শর্তে অংশগ্রহণ ২৬%

ক্ষমা চাওয়ার শর্তে অংশগ্রহণ ১৪.৮%

মোট (অংশগ্রহণমূলক সমর্থন) ৬৯.২%


বিশ্লেষকদের মতে, জরিপে এই তিনটি ভিন্ন ধারণাকে একত্রিত করে এটিকে আওয়ামী লীগের 'জনপ্রিয়তা' বা 'রাজনৈতিক সমর্থন' হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা চলছে। একটি দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করুক—এই চাওয়াকে 'দলটির প্রতি সমর্থন' হিসেবে চিত্রিত করা একটি অসঙ্গতিপূর্ণ ও বিপজ্জনক রাজনৈতিক আখ্যান। এই কৌশলের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের বিগত শাসনামলের সকল দুর্নীতি ও ব্যর্থতার বিরুদ্ধে জনগণের ক্ষোভকে লঘু করে দেখানো হচ্ছে।

​প্রথম আলোর উদ্দেশ্য: ‘বিরাজনীতিকরণ’ ও সামরিক শক্তির উত্থান

​ভিডিও বিশ্লেষণকারী আলোচকরা প্রথম আলো এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালী গোষ্ঠীর (যেমন ডেইলি স্টারের সম্পাদকমণ্ডলী) একটি সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য থাকার বিষয়ে গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন। তাদের মতে, এই জরিপ একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য পূরণে সহায়ক:

​নির্বাচনের প্রয়োজনীয়তা খর্ব করা

​একটি গণঅভ্যুত্থানের পর যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তে যদি বলা হয় যে জনগণের ৬৯ শতাংশ একটি পতনের সম্মুখীন হওয়া দলকেও নির্বাচনে দেখতে চায়, তবে এর মাধ্যমে প্রকারান্তরে নির্বাচনের প্রয়োজনীয়তাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়। যদি জনগণের এত বড় একটি অংশ এই দলের প্রতি আস্থাশীল হয়, তবে কেন সরকার পরিবর্তনের জন্য এতো কাঠখড় পোড়ানোর দরকার হলো?

​বিশ্লেষকরা বলছেন, এই জরিপ এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করতে চায়, যেখানে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের ওপর চাপ সৃষ্টি হয় যে, যদি বিপুলসংখ্যক মানুষ সমর্থিত একটি দলকে নির্বাচনে অংশ নিতে না দেওয়া হয়, তবে পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়াই প্রশ্নবিদ্ধ হবে। এর মাধ্যমে বর্তমান সরকার বা তার ম্যান্ডেটের বিরুদ্ধে একটি ‘কাউন্টার চ্যালেঞ্জ’ তৈরি করা হয়েছে।

​বিরাজনীতিকরণ ও তৃতীয় শক্তির উত্থান

​প্রথম আলো এবং সমমনা গণমাধ্যমগুলোর বিরুদ্ধে এটি একটি পুরোনো অভিযোগ যে, তারা দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিকে 'বিরাজনীতিকরণের' (De-politicization) পথে নিয়ে যেতে চাইছে। ফলাফল, বাংলাদেশের রাজনীতিতে কিংস পার্টি হিসেবে আখ্যায়িত এনসিপিকে কেন্দ্র করে একটি সামরিক-সমর্থিত, বিপ্লবী অথবা এনজিও-ভিত্তিক অরাজনৈতিক সরকারকে ক্ষমতায় আনা।

​জরিপটি এই অভিসন্ধিতেই কাজ করছে। একদিকে এটি জনসমর্থন দেখিয়ে আওয়ামী লীগকে নিষ্ক্রিয় না করে 'আলোচিত' রাখছে, অন্যদিকে বিরোধী দলগুলোর সম্ভাব্য জনসমর্থনকে ম্লান করে একটি অরাজনৈতিক, তৃতীয় শক্তির উত্থানের ক্ষেত্র প্রস্তুত করছে। বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত করেছেন যে, এই শক্তি সামরিক বা সামরিক মদদপুষ্ট হতে পারে, যা মিসর বা অন্যান্য দেশের উদাহরণে দেখা গেছে।

​প্রশ্নের পক্ষপাতিত্ব সত্ত্বেও বিপরীত ফল (স্ব-বিরোধিতা):

​Talk-Bangla 24 চ্যানেলের বিশ্লেষণে দেখানো হয়েছে যে, প্রথম আলো জরিপের প্রশ্নে আওয়ামী লীগকে ইচ্ছা করেই ‘গণঅভ্যুত্থানে পতিত দল’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে—যা উত্তরদাতাকে নেতিবাচক উত্তর দিতে প্ররোচিত করতে পারত। কিন্তু তার পরেও যখন ৬৯% মানুষ অংশগ্রহণমূলক মত দেন, তখন বিশ্লেষকরা প্রশ্ন তোলেন, সরকার কেন জনগণের এই 'অংশগ্রহণমূলক' মতামতকে উপেক্ষা করে চলতে চাইছে? এটি সরকারের জন্য কি একটি 'বিশাল ঝুঁকি' নয়?

২০০৭ সালে সাধারণ গণমানুষ কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হয়ে, সেই গণমানুষের উপরই প্রতিহিংসা পরায়ণ হয়ে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে- ইউনুস সাহেব কি মনে করছেন যে, সবকিছু করার ক্ষমতা তাঁর আছে? তেমনটা মনে করে থাকলে তিনি দেশের জন্য ভয়াবহ কিছুই ডেকে নিয়ে আসতে যাচ্ছেন। কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে রেখে নয়, দেশের মানুষ আওয়ামীলীগকে আবারও ক্ষমতায় দেখতে চায় কি না তা ভোটের মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে। প্রথম আলোর ভুয়া জরিপে বাংলাদেশে অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো পরিস্থিতি তৈরি হলে তার দায় ইউনুস সাহেবকে নিতে হবে। 

প্রথম আলোর জরিপ সংক্রান্ত আরেকটি আর্টিকেল পড়ুন:

প্রথম আলো’র জরিপ ফলাফল: মাঠ পর্যায়ের বাস্তব পরিস্থিতিতে কতটা যৌক্তিক?

​বিশ্লেষণের পাল্টা সমালোচনা হিসেবে বলা যায়, প্রশ্নপত্রে এমন নেতিবাচক ট্যাগিং ব্যবহার করা সত্ত্বেও ৬৯% মানুষের অংশগ্রহণের পক্ষে মত দেওয়া আসলে এই জরিপের উদ্দেশ্য প্রণোদিত ফলাফলের দিকটিকেই শক্তিশালী করে। কারণ, এই ফলাফলের মাধ্যমে বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেটকে প্রশ্নবিদ্ধ করে একটি বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি করা সহজ হয়।

​একটি রাজনৈতিক ছক

​প্রথম আলোর জরিপটি কেবল একটি সংখ্যা প্রকাশ নয়, এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যতের রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করার একটি সুচিন্তিত রাজনৈতিক ছক। এর মূল লক্ষ্যগুলো হলো:

​রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি জনগণের আস্থা কম দেখানো।

​নির্বাচন ব্যবস্থা ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রতি জনগণের অবিশ্বাস সৃষ্টি করা।

​একটি অরাজনৈতিক বা সামরিক-মদদপুষ্ট প্রশাসনকে ক্ষমতায় বসার যৌক্তিকতা তৈরি করে দেওয়া।

​এই ভুয়া জরিপের প্রচারণার মুখে জনগণের উচিৎ সচেতন থাকা। দেশের প্রকৃত জনমত, যা বিগত গণঅভ্যুত্থানে প্রতিফলিত হয়েছে, তা এই পরিসংখ্যানের বেড়াজালের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের ভাগ্য নির্ধারণের দায়িত্ব কোনো আন্তর্জাতিক মদদপুষ্ট মিডিয়া বা তাদের প্রকাশিত বিতর্কিত জরিপের হতে পারে না, বরং তা নির্ভর করবে জনগণের সুস্পষ্ট ম্যান্ডেট ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপর।

মন্তব্যসমূহ