অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ভেজাল ওষুধের রমরমা বাণিজ্য: স্বাস্থ্যঝুঁকিতে জনজীবন ও আমাদের করণীয়
![]() |
| অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ভেজাল ওষুধের রমরমা বাণিজ্য: স্বাস্থ্যঝুঁকিতে জনজীবন ও আমাদের করণীয়। ছবি - ব্যাঙেরছাতা |
একবিংশ শতাব্দীতে প্রযুক্তির ছোঁয়ায় আমাদের জীবনযাপন সহজ হয়েছে সত্য, কিন্তু এই প্রযুক্তিকেই ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে একদল অসাধু চক্র। বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, ভিডিও শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম ইউটিউব এবং বিভিন্ন চটকদার অনলাইন বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ছে নকল ও ভেজাল ওষুধের জাল। ডায়াবেটিস নির্মূল, ক্যানসার নিরাময় কিংবা রাতারাতি শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির মতো কাল্পনিক ও আজগুবি গ্যারান্টি দিয়ে হাজার হাজার সাধারণ মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে এই চক্রটি। সম্প্রতি দৈনিক ইত্তেফাকসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো থেকে উঠে এসেছে ভয়াবহ এক চিত্র, যেখানে দেখা যাচ্ছে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বিক্রি হওয়া অধিকাংশ ওষুধই কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি ছাড়াই তৈরি করা হচ্ছে। এটি কেবল একটি সাধারণ অপরাধ নয়, বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত 'নীরব গণহত্যা'।
অনলাইন প্রতারণার স্বরূপ: অলৌকিক নিরাময়ের ফাঁদ
অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া বিজ্ঞাপনগুলোতে প্রায়ই দেখা যায়— "মাত্র সাত দিনে ডায়াবেটিস থেকে মুক্তি" বা "ক্যানসার নিরাময়ের অব্যর্থ মহৌষধ"। চিকিৎসা বিজ্ঞানের মৌলিক তত্ত্বে আমরা জানি যে, টাইপ-১ বা টাইপ-২ ডায়াবেটিস কখনোই পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়, কেবল নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সুস্থ জীবন যাপন করা যায়। জাতীয় অধ্যাপক ডা. এ কে আজাদ খান স্পষ্টভাবেই জানিয়েছেন যে, বিশ্বে এমন কোনো চিকিৎসা এখনও আবিষ্কার হয়নি যা সাত দিনে ডায়াবেটিস সারিয়ে দেবে।
এই প্রতারক চক্রগুলো মূলত মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে। দীর্ঘমেয়াদী রোগে আক্রান্ত একজন মানুষ যখন স্বাভাবিক চিকিৎসায় ক্লান্ত হয়ে পড়েন, ঠিক তখনই এই ডিজিটাল বিজ্ঞাপনগুলো তাদের সামনে একটি ‘অলৌকিক’ আশার আলো দেখায়। এই অন্ধ বিশ্বাসের সুযোগ নিয়েই তারা হাজার হাজার টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। শিক্ষিত-অশিক্ষিত নির্বিশেষে অনেকেই এই চটকদার বিজ্ঞাপনে প্রলুব্ধ হয়ে নিয়মিত সেবন করা চিকিৎসকের প্রেসক্রাইব করা আধুনিক ওষুধ ছেড়ে দিয়ে এসব বিষাক্ত উপাদান গ্রহণ করছেন।
নকল ওষুধের নেপথ্যে যা আছে: জেনে শুনে বিষপান
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এসব তথাকথিত ভেষজ বা প্রাকৃতিক ওষুধের ভেতরে মূলত আটা, ময়দা, নিম্নমানের স্টেরয়েড এবং অত্যন্ত ক্ষতিকর শিল্প-গ্রেড রাসায়নিকের মিশ্রণ থাকে। কিডনি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. হারুন অর রশীদের মতে, এই অজানা রাসায়নিক মিশ্রিত ওষুধ সেবন করা মানে হলো জেনে শুনে বিষ পান করা। লতাপাতা বা প্রাকৃতিক নাম দিয়ে বিক্রি করা হলেও এগুলোতে কোনো মান নিয়ন্ত্রণ বা ল্যাবরেটরি পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকে না।
প্রতারকরা প্রায়ই তাদের পণ্যকে "১০০% পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন" বলে দাবি করে। চিকিৎসকদের মতে, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন কোনো ওষুধই হতে পারে না—যা কাজ করে তার নির্দিষ্ট প্রতিক্রিয়াও থাকে। ফলে রোগী যখন এই ভেজাল পণ্যগুলো গ্রহণ করেন, তখন তাতে থাকা স্টেরয়েডের প্রভাবে সাময়িকভাবে হয়তো একটু শক্তি বা ভালো অনুভব করেন, কিন্তু ভেতরে ভেতরে তার ভাইটাল অর্গানগুলো (যেমন- হৃদপিণ্ড, ফুসফুস) স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে।
স্বাস্থ্যঝুঁকি: যে ভয়াবহ পরিণতির দিকে আমরা এগোচ্ছি
অনলাইনের এই ভেজাল ওষুধের প্রতিক্রিয়ায় দেশে অসংক্রামক রোগের হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। এর ফলে যেসব দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি হচ্ছে তা নিম্নরূপ:
কিডনি বিকল হওয়া: অনিয়ন্ত্রিত কেমিক্যাল ও নিম্নমানের হার্বাল সেবনের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কিডনি। প্রতি বছর দেশে হাজার হাজার মানুষ কিডনি ডায়ালাইসিস সেন্টারে ভিড় করছেন, যার একটি বড় অংশের পেছনে কাজ করছে এই অনুমোদনহীন ও ভেজাল ওষুধের প্রভাব।
লিভার সিরোসিস: লিভারের প্রধান কাজ হলো শরীরের টক্সিন ফিল্টার করা। ওষুধের নামে যখন মাত্রাতিরিক্ত এবং বিষাক্ত ক্ষতিকর উপাদান শরীরে প্রবেশ করে, তখন লিভার তার সাধারণ কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেলে, যা পরবর্তীতে সিরোসিস বা লিভার ক্যানসারের রূপ নেয়।
হৃদরোগ ও স্নায়বিক বৈকল্য: বিশেষ করে যৌন সক্ষমতা বৃদ্ধির নামে যেসব ওষুধ অনলাইনে বিক্রি হয়, সেগুলো মূলত হার্ট রেট ও রক্তচাপ অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে স্ট্রোক বা হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হওয়া: ভেজাল ওষুধে ব্যবহৃত হরমোনাল এলিমেন্ট মানুষের শরীরের স্বাভাবিক হরমোন সিস্টেমকে ধ্বংস করে দেয়। এর ফলে মেদবৃদ্ধি, হাড় ক্ষয় এবং মানসিক অবসাদ দেখা দেয়।
সামাজিক প্রভাব ও স্বাস্থ্য খাতের ওপর চাপ
এই প্রতারণামূলক বাণিজ্যের সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের জনস্বাস্থ্যে। ভুল চিকিৎসায় আক্রান্ত হয়ে যখন রোগীরা শেষ পর্যায়ে হাসপাতালে আসেন, তখন হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা আর চিকিৎসার সক্ষমতার বাইরে চলে যায় পরিস্থিতি। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মতো বড় বড় হাসপাতালগুলোতে শয্যা সংকট এখন চরমে। রোগীদের কেবল বাথরুম ছাড়া আর কোথাও জায়গা দেওয়ার সুযোগ থাকে না। এই পরিস্থিতির জন্য যেমন ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা দায়ী, তেমনই দায়ী এই অপচিকিৎসার শিকার হয়ে অসুস্থ হওয়া মানুষের বিশাল বহর। এটি কেবল একজন ব্যক্তির জীবন কেড়ে নিচ্ছে না, বরং পুরো দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে একটি ভঙ্গুর অবস্থার দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
আইনি সীমাবদ্ধতা ও প্রশাসনের চ্যালেঞ্জ
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) এবং বিআইএসটিআই (BSTI) মাঝেমধ্যেই অভিযান চালিয়ে বড় অংকের জরিমানা ও জেল দিলেও এই চক্রের দৌরাত্ম্য থামছে না। এর প্রধান কারণ হলো অনলাইন প্ল্যাটফর্মের বিশালতা এবং এর বর্ডারলেস চরিত্র। অপরাধীরা একটি ফেসবুক পেজ বন্ধ হলে অন্য নামে দশটি নতুন পেজ খুলে আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে।
তাছাড়া, দেশে আইনের প্রয়োগের ক্ষেত্রে বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অনেক সময় দেখা যায়, ধরা পড়ার পর জামিনে বেরিয়ে এসে তারা পুনরায় একই কাজে লিপ্ত হচ্ছে। উন্নত বিশ্বে ভেজাল ওষুধের কারবারিদের মৃত্যুদণ্ডের মতো কঠোর সাজার বিধান থাকলেও বাংলাদেশে এই অপরাধের সাজা অনেক ক্ষেত্রে লঘু। বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) ইতোমধ্যে বেশ কিছু স্বঘোষিত চিকিৎসককে (যাদের মধ্যে ডা. জাহাঙ্গীরের মতো নামও উঠে এসেছে) নোটিশ দিয়েছে এবং সতর্ক করেছে। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের বিশাল ফলোয়ার থাকার কারণে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হতেই থাকে।
ডিজিটাল ইকোসিস্টেমে 'ভুয়া ডাক্তার' ও 'ইনফ্লুয়েন্সার কালচার'
বর্তমান সময়ে ইউটিউব বা ফেসবুকে এক শ্রেণীর মানুষ নিজেদের ডাক্তার পরিচয় দিয়ে নানা ধরণের স্বাস্থ্য পরামর্শ এবং ওষুধ বিক্রি করছেন। এদের অনেকেরই কোনো স্বীকৃত একাডেমিক ডিগ্রি নেই, থাকলেও তারা বিএমডিসি কর্তৃক নিবন্ধিত নন। তারা এমন সব শব্দ ব্যবহার করেন যা সাধারণ মানুষের কাছে বিজ্ঞানসম্মত মনে হতে পারে। যেমন—'অরগানিক ডিটক্স', 'ন্যাচারাল হিলিং' ইত্যাদি। এই ইনফ্লুয়েন্সাররা যখন কোনো ওষুধের গুণগান করেন, তখন তাদের ভক্তরা সেটি যাচাই না করেই কিনে নেন। এটি ডিজিটাল যুগে একটি নতুন ধরণের স্বাস্থ্য ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রতারণা থেকে বাঁচতে সাধারণ জনগণের করণীয়
একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে অনলাইন থেকে ওষুধ কেনার আগে বা যেকোনো বিজ্ঞাপন দেখে প্রলুব্ধ হওয়ার আগে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো নিশ্চিত করা উচিত:
বিজ্ঞাপনের ভাষা বিশ্লেষণ: কোনো বিজ্ঞাপন যদি বলে "শতভাগ নিশ্চয়তা" বা "জাদুকরী নিরাময়", তবে ধরে নেবেন সেটি ভুয়া। চিকিৎসাবিজ্ঞানে নিশ্চয়তা বা ম্যাজিক বলে কিছু নেই।
রেজিস্টার্ড ফার্মেসি যাচাই: অনলাইন শপ থেকে ওষুধ কেনার আগে নিশ্চিত হোন তাদের ফিজিক্যাল লোকেশন এবং সরকারি ড্রাগ লাইসেন্স আছে কি না। বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী, রেজিস্টার্ড ফার্মেসি ছাড়া ওষুধ বিক্রি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।
কিউআর কোড চেক: ওষুধের প্যাকেটে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের নাম, ব্যাচ নম্বর এবং ঔষধ প্রশাসনের (DGDA) অনুমোদিত কিউআর কোড বা নম্বর আছে কি না সেটি অ্যাপের মাধ্যমে যাচাই করা সম্ভব।
চিকিৎসকের পরামর্শের গুরুত্ব: একজন এমবিবিএস চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এবং নিজের শারীরিক পরীক্ষা (যেমন- রক্ত পরীক্ষা) না করে কোনো নতুন ওষুধ সেবন করা চরম আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।
রাষ্ট্র ও নীতিনির্ধারকদের কাছে প্রস্তাবনা
ভেজাল ওষুধের এই ভয়াবহতা রোধে কেবল সাধারণ মানুষের সচেতনতা যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় কঠোর হস্তক্ষেপ:
বিশেষায়িত সাইবার সেল: ঔষধ প্রশাসনের অধীনে একটি ডেডিকেটেড সাইবার নজরদারি সেল গঠন করা উচিত যারা সার্বক্ষণিক অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোতে নজরদারি করবে।
সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা: নকল ও ভেজাল ওষুধ উৎপাদন এবং বিপণনকারীদের জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা মৃত্যুদণ্ডের মতো কঠোর শাস্তির বিধান করতে হবে।
সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মের সাথে সমন্বয়: মেটা (ফেসবুক) ও গুগল (ইউটিউব) কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করে বাংলাদেশ থেকে ওষুধের বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে কঠোর নীতিমালা এবং সত্যতা যাচাই বাধ্যতামূলক করতে হবে।
ফার্মাসিস্টদের ভূমিকা: পাড়ার ফার্মেসিগুলোতেও যেন ভেজাল ওষুধ না ঢোকে, সে জন্য নিয়মিত ড্রাগ ইনস্পেক্টরদের তদারকি বাড়াতে হবে।
স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল—এই প্রচলিত কথাটি তখনই সত্য হবে যখন আমাদের চারপাশের পরিবেশ এবং আমরা যা গ্রহণ করছি তা নিরাপদ থাকবে। অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ভেজাল ওষুধের এই রমরমা ব্যবসা আসলে এক ধরণের নিরব মহামারি। অসাধু মুনাফালোভী চক্রের হাত থেকে বাঁচতে হলে আমাদের সামষ্টিক সচেতনতা জরুরি। এই লেখার উদ্দেশ্য হলো সেই সমস্ত ভুক্তভোগী মানুষের কাছে সত্য পৌঁছে দেওয়া যারা বিজ্ঞাপনের ঝলকানিতে নিজেদের জীবন বিপন্ন করছেন। মনে রাখবেন, সস্তা বা অলৌকিক নিরাময়ের পেছনে দৌড়ানো মানেই মৃত্যুকে আমন্ত্রণ জানানো। আসুন, আমরা নিজে সচেতন হই, পরিবারের সদস্যদের সতর্ক করি এবং সমাজকে এই মরণফাঁদ সম্পর্কে অভিহিত করি। একটি ভেজালমুক্ত স্বাস্থ্য ব্যবস্থাই পারে আমাদের আগামী প্রজন্মকে একটি সুন্দর ও দীর্ঘ জীবন উপহার দিতে।
তথ্যসূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক (প্রকাশিত সংবাদ: অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ভেজাল ওষুধ বিক্রি), বিএমডিসি ওয়েবসাইট এবং ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের প্রতিবেদনসমূহ।
আপনার মতামত বা প্রতিক্রিয়া লিখে জানান কমেন্টে। কমেন্ট বক্স সকলের জন্য উন্মুক্ত।

মন্তব্যসমূহ