বাংলাদেশের মানবাধিকারের সাম্প্রতিক চ্যালেঞ্জ: অজ্ঞাত লাশ, হেফাজতে মৃত্যু ও মব সহিংসতা

ব্যাঙেরছাতা

বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি সাম্প্রতিক সময়ে এক নতুন ও বহুমুখী সংকটের সম্মুখীন। যদিও সাবেক সরকারের আমলের বহুল আলোচিত 'গুম' এবং 'বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড'-এর মতো ঘটনাগুলোতে দৃশ্যত কিছুটা ভাটা পড়েছে, তবে মানবাধিকার সংস্থা ও কর্মীদের উদ্বেগের কেন্দ্রে এখন উঠে এসেছে তিনটি প্রধান বিষয়: অজ্ঞাতনামা লাশের সংখ্যা বৃদ্ধি, কারা ও নিরাপত্তা হেফাজতে মৃত্যু, এবং মব সহিংসতা বা গণপিটুনি। দেড় বছরের অন্তর্বর্তীকালীন শাসনকালে এই বিষয়গুলো কেবল সামাজিক অস্থিরতার জন্ম দিচ্ছে না, বরং দেশের সামগ্রিক মানবাধিকার সংস্কৃতি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।

​মূল উদ্বেগসমূহের বিস্তারিত বিশ্লেষণ

​বিবিসি বাংলার নিবন্ধটি অনুযায়ী, মানবাধিকার সংগঠক এবং সংস্থাগুলো মনে করছে, গত দেড় বছরে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির সামগ্রিক উন্নতি ঘটেনি, বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে অবনতি হয়েছে।

​অজ্ঞাতনামা লাশের সংখ্যা বৃদ্ধি

​মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ)-এর সম্পাদক সাইদুর রহমানের মতে, বর্তমানে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো 'অজ্ঞাতনামা লাশ'

সংকট: অজ্ঞাতনামা লাশের সংখ্যা বৃদ্ধি প্রমাণ করে যে, হয়তো বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ধরন পরিবর্তিত হয়েছে, কিংবা আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর জবাবদিহিতার ঘাটতি রয়েছে।

তাৎপর্য: এই লাশগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই গুম হওয়া ব্যক্তিদের হতে পারে, অথবা এমন হত্যাকাণ্ড যা দ্রুত ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। এটি একটি ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করে, যেখানে নাগরিকরা তাদের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে সন্দিহান থাকে।

​কারা ও নিরাপত্তা হেফাজতে মৃত্যু

​হেফাজতে মৃত্যু, বিশেষ করে পুলিশি রিমান্ড বা কারা হেফাজতে, দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের মানবাধিকারের কালো অধ্যায়।​

অভিযোগ: যদিও গুম-খুনের প্রবণতা কমেছে, তবে হেফাজতে নির্যাতনের ফলে মৃত্যুর ঘটনা ইঙ্গিত দেয় যে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অভ্যন্তরে নির্যাতনের সংস্কৃতি এখনও দূর হয়নি।

মানবাধিকার কর্মীদের মন্তব্য: ৫ই আগস্টের পর যখন বিচার বিভাগীয় হত্যা, গুম, খুন কমার আশা করা হয়েছিল, তখন হেফাজতে মৃত্যু, বিশেষ করে রিমান্ডে নির্যাতনের মাধ্যমে মৃত্যু, সেই আশাকে ম্লান করে দিচ্ছে।

​মব সহিংসতা বা গণপিটুনি (Mob Violence)

​মব সন্ত্রাস বা উচ্ছৃঙ্খল জনতার সহিংসতা বর্তমানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। এটি কেবল চোর বা ছিনতাইকারীদের ক্ষেত্রেই ঘটছে না, বরং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, ধর্মীয় সংখ্যালঘু এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের লক্ষ্যবস্তু করছে।​

সাংগঠনিক তথ্য: হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্যমতে, চলতি বছরের ১০ মাসে মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ২৫৬টি ঘটনায় কমপক্ষে ১৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে।

রাজনৈতিক ও ধর্মীয় লক্ষ্য: মানবাধিকার সংগঠক সাইদুর রহমানের মতে, মব বিশেষ করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, ধর্মীয় সংখ্যালঘু, এবং দরগা-মাজার-বাউলদের ওপর হামলা-নির্যাতনের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। "একটা একটা বাউল ধর- ধইরা ধইরা জবাই কর" -এর মতো স্লোগান এই সংকটের গভীরতা তুলে ধরে।

অধিকারের প্রতিবেদন: 'অধিকার'-এর তথ্যমতে, অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে (২০২৪ সালের ৯ই অগাস্ট থেকে ২০২৫ সালের ৩০শে সেপ্টেম্বর) অন্তত ১৫৩ জনকে গণপিটুনিতে হত্যা করা হয়েছে

​সরকার ও আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টিভঙ্গি

​সরকারের আইনি উপদেষ্টার বক্তব্য

​আইন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ”বাংলাদেশের একমাত্র মহাজ্ঞানী” আসিফ নজরুলের ভাষ্য, সরকার মানবাধিকার রক্ষায় বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে।

সংস্কারের উদ্যোগ: তাঁর মতে, গুম-খুনের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থার পাশাপাশি সরকার গুম সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সনদে স্বাক্ষর করার মতো গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে।

চ্যালেঞ্জ: তিনি স্বীকার করেন যে, মানবাধিকার রাতারাতি জাদু দিয়ে ভালো করা যায় না; এটি একটি 'সংস্কৃতির বিষয়'। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে পরবর্তী রাজনৈতিক সরকার এসে এই সংস্কারগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিলে পরিস্থিতির ক্রমাগত উন্নতি হবে।

​আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার পর্যবেক্ষণ

​আন্তর্জাতিক সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের প্রায় এক বছর পর (জুলাই, চলতি বছর) বলেছিল যে, সরকার মানবাধিকার রক্ষার চ্যালেঞ্জিং কর্মসূচি বাস্তবায়নে ব্যর্থ হচ্ছে।

ইতিবাচক দিক: ১৫ বছরের শাসনামলের গুম ও ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের কিছুটা অবসান ঘটেছে বলে সংস্থাটি মনে করেছিল।

নেতিবাচক দিক: তবে তারা উচ্ছৃঙ্খল জনতার সহিংসতা (মব ভায়োলেন্স), রাজনৈতিক সহিংসতা, এবং বিশেষ করে নারী অধিকার, সমকামী, উভকামী ও ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তিবিরোধী ধর্মীয় কট্টরপন্থীদের হাতে সাংবাদিকদের হয়রানির বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল।

​সংকটের গভীরে: কাঠামোগত কারণ ও প্রভাব

​মানবাধিকার কর্মীদের মতে, মব সহিংসতা, অজ্ঞাত লাশ এবং হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনাগুলো কেবল বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, বরং দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসনের কুফল ও ফ্যাসিবাদী মননের বহিঃপ্রকাশ।​

আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নিষ্ক্রিয়তা: নূর খান লিটনের মতে, পরিস্থিতি খারাপ হলেও তা প্রতিরোধে দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। তিনি হাজার হাজার মামলা হওয়া, মামলা নিয়ে বাণিজ্য এবং রাজনৈতিক দলের নামে বাড়িঘর-ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দখলের মতো ঘটনাগুলোতে সরকারের জেনেও নিষ্ক্রিয় থাকার অভিযোগ তোলেন।

বিচারহীনতার সংস্কৃতি: যখন মব সহিংসতার শিকার ব্যক্তিরা ন্যায়বিচার পায় না, বা মবকে রাজনৈতিক বা ধর্মীয় উদ্দেশ্য সাধনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তখন তা বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে আরও শক্তিশালী করে। এর ফলে সাধারণ মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নিতে উৎসাহিত হয়।​

রাজনৈতিক উদ্দেশ্য: মব সহিংসতা অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করার একটি কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, যা একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক সমাজে মারাত্মক হুমকি।

​উত্তরণের পথ ও ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ

​মানবাধিকারের এই ত্রিমুখী সংকট থেকে উত্তরণের জন্য কাঠামোগত এবং সাংস্কৃতিক উভয় স্তরেই পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

১. আইন প্রয়োগকারী সংস্থায় সংস্কার: হেফাজতে নির্যাতন বন্ধ করতে হলে পুলিশ ও অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীর প্রশিক্ষণে মৌলিক মানবাধিকারের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করতে হবে এবং হেফাজতে মৃত্যুর প্রতিটি ঘটনার জন্য দ্রুত ও স্বচ্ছ বিচার নিশ্চিত করতে হবে।​

২. মব সহিংসতা কঠোরভাবে দমন: মব সহিংসতার সাথে জড়িতদের দ্রুত চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে সহিংসতা রুখতে রাষ্ট্রকে জিরো টলারেন্স নীতি নিতে হবে। বাউল, মাজার বা ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর হামলার ক্ষেত্রে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।​

৩. জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা: অজ্ঞাতনামা লাশের রহস্য উদঘাটনে কার্যকর ফরেনসিক তদন্ত এবং জনসমক্ষে তদন্তের ফলাফল প্রকাশ করতে হবে। গুম সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সনদে স্বাক্ষর করার পাশাপাশি তা দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে।

​বাংলাদেশের বর্তমান মানবাধিকার পরিস্থিতি এক গভীর সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে। সাবেক সরকারের আমলের মারাত্মক মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার বিচার প্রক্রিয়া শুরু হওয়া একটি আশার আলো দেখালেও, অজ্ঞাত লাশ, হেফাজতে মৃত্যু এবং মব সহিংসতার মতো নতুন ও পরিবর্তিত সংকটগুলো গণতান্ত্রিক ও মানবিক সমাজের মূল ভিত্তিকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। আইন উপদেষ্টার আশাবাদ অনুযায়ী, পরবর্তী সরকার যদি মানবাধিকার সংস্কারগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারে, তবেই এই সংস্কৃতিগত পরিবর্তন সম্ভব হবে এবং নাগরিকরা তাদের মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা ফিরে পাবে। অন্যথায়, এই তিনটি সংকট দেশের অভ্যন্তরে আরও গভীর অস্থিরতা তৈরি করবে।

মন্তব্যসমূহ