শিক্ষায় এডিপি বরাদ্দ কর্তন: মেধাবী ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে এক বড় হোঁচট?

ব্যাঙেরছাতা
শিক্ষায় এডিপি বরাদ্দ কর্তন: মেধাবী ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে এক বড় হোঁচট? ছবি - ব্যাঙেরছাতা।


শিক্ষার গুরুত্ব ও বর্তমান বাস্তবতার বৈপরীত্য

একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড হলো তার শিক্ষা ব্যবস্থা। আধুনিক বিশ্বব্যবস্থায় যে রাষ্ট্র তার তরুণ প্রজন্মের মেধা ও মনন বিকাশে যত বেশি বিনিয়োগ করে, দীর্ঘমেয়াদে সেই রাষ্ট্র তত বেশি টেকসই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে, যেখানে প্রাকৃতিক সম্পদের চেয়ে জনশক্তিই প্রধান মূলধন, সেখানে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ হওয়া উচিত ছিল সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শিক্ষা বরাবরই বাজেটের এক অবহেলিত এবং প্রান্তিক অংশ হিসেবে রয়ে গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের শিক্ষা খাতের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বরাদ্দ থেকে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কমিয়ে ফেলার পরিকল্পনা আমাদের জাতীয় অগ্রগতির পথে এক বিশাল প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে। যখন ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছ থেকে শিক্ষা সংস্কারের একটি যুগান্তকারী রূপরেখা আশা করা হয়েছিল, তখন উন্নয়ন বরাদ্দের এই নজিরবিহীন কর্তন সচেতন নাগরিকদের গভীরভাবে উদ্বিগ্ন ও হতাশ করেছে।

মূল সংবাদ: এডিপি থেকে ১০ হাজার কোটি টাকার বিদায় ও পরিসংখ্যানের চিত্র

সম্প্রতি প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদপত্রের প্রতিবেদন ও সরকারি তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (আরএডিপি) শিক্ষা খাতের বরাদ্দ থেকে ৩৪ দশমিক ৭৭ শতাংশ বা প্রায় ৯ হাজার ৯৩০ কোটি টাকা কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। মূল এডিপিতে এই বরাদ্দ ছিল ২৮ হাজার ৫৫৭ কোটি টাকা, যা এখন সংশোধনের পর কমে দাঁড়াচ্ছে মাত্র ১৮ হাজার ৬২৮ কোটি টাকায়। এই বিশাল অংকের কর্তন কেবল শুষ্ক কোনো পরিসংখ্যান নয়; এর সাথে জড়িয়ে আছে দেশের শত শত সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়ন, ল্যাবরেটরি আধুনিকায়ন এবং উচ্চশিক্ষার গবেষণার ভবিষ্যৎ।

সবচেয়ে ভয়াবহ ধাক্কাটি এসেছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে। এই বিভাগের উন্নয়ন বরাদ্দ অবিশ্বাস্যভাবে ৪৭ শতাংশ কমিয়ে আনা হয়েছে। মূল এডিপিতে এই খাতের জন্য ১১ হাজার ৯১৭ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও তা এখন অর্ধেকে নামিয়ে ৬ হাজার ৩১৫ কোটি টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। অথচ উচ্চশিক্ষাই একটি জাতির উদ্ভাবনী শক্তি এবং বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতার যোগ্য পেশাদার জনশক্তি তৈরির মূল সূতিকাগার। এই খাতের বরাদ্দ অর্ধেক হয়ে যাওয়া মানে হলো উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নের চাকা কার্যত থমকে যাওয়া।

কেন এই বরাদ্দ কর্তন? অযোগ্যতা নাকি কাঠামোগত ব্যর্থতা?

শিক্ষা খাতের বরাদ্দ কমানোর পেছনে আমলাতান্ত্রিক স্তর থেকে সাধারণত 'প্রকল্প বাস্তবায়ন সক্ষমতার অভাব'কে প্রধান অজুহাত হিসেবে দাঁড় করানো হয়। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) তথ্যমতে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) শিক্ষা খাতের প্রকল্প বাস্তবায়নের হার ছিল অত্যন্ত হতাশাজনক। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে বরাদ্দকৃত বিশাল অর্থের বিপরীতে ব্যয় হয়েছে মাত্র ৯ শতাংশের মতো। এই তথাকথিত 'ব্যয় করতে না পারার অযোগ্যতা'কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে প্রতিবছরই সংশোধিত বাজেটে বরাদ্দ ছেঁটে ফেলা হয়।

কিন্তু এখানে একটি গভীর প্রশ্ন থেকে যায়—প্রকল্পগুলো কেন বাস্তবায়িত হচ্ছে না? এটি কি কেবল কর্মকর্তাদের উদাসীনতা, নাকি এর পেছনে রয়েছে দুর্নীতি, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনজনিত স্থবিরতা এবং ত্রুটিপূর্ণ পরিকল্পনা? শিক্ষা খাতের মতো একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর জায়গায় সময়মতো অর্থ ব্যয় করতে না পারা প্রশাসনের একটি বড় ধরনের নীতিগত ব্যর্থতা। এর ফলে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আধুনিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, যার দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পড়বে কর্মসংস্থান ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির ক্ষেত্রে।

বিশ্বপ্রেক্ষিত ও বাংলাদেশের অবস্থান: একটি লজ্জাজনক তুলনা

আন্তর্জাতিক মানদণ্ড এবং ইউনেস্কোর সুপারিশ অনুযায়ী, একটি উন্নয়নশীল দেশের মোট জিডিপির (GDP) অন্তত ৬ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ থাকা বাঞ্ছনীয়। অথচ বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই চিত্রটি করুণ। বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, পৃথিবীর ১৮৯টি দেশের মধ্যে অর্থনীতির আকারের তুলনায় শিক্ষা খাতে সবচেয়ে কম বরাদ্দ দেওয়া ১০টি দেশের তালিকায় বাংলাদেশ অন্যতম। দশকের পর দশক ধরে এ দেশে শিক্ষা বরাদ্দ জিডিপির ২ শতাংশের নিচেই ঘুরপাক খাচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশ যেমন নেপাল, ভুটান বা ভারতের তুলনায়ও আমরা এক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ রাশেদা কে. চৌধুরীর মতে, আমাদের নীতিনির্ধারকরা শিক্ষায় বিনিয়োগকে একটি দীর্ঘমেয়াদী 'অ্যাসেট' বা সম্পদ হিসেবে না দেখে একে কেবল একটি অনুৎপাদনশীল 'খরচ' হিসেবে বিবেচনা করেন। তিনি মনে করেন, বর্তমান সরকারের কাছে এ বিষয়ে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আশা করা হয়েছিল, কিন্তু বরাদ্দের এই বিশাল কর্তন প্রমাণ করে যে ক্ষমতার পরিবর্তন হলেও নীতিনির্ধারণী মানসিকতার পরিবর্তন এখনো সুদূরপরাহত।

শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ ও সাধারণ পরিবারের ওপর আর্থিক চাপ

রাষ্ট্র যখন শিক্ষা খাত থেকে ধীরে ধীরে অর্থ বরাদ্দ কমিয়ে দেয়, তখন শিক্ষার ব্যয়ের বোঝা সরাসরি গিয়ে পড়ে সাধারণ মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের কাঁধে। বাংলাদেশে শিক্ষা খাতের মোট ব্যয়ের প্রায় ৭০ শতাংশই এখন ব্যক্তি বা পারিবারিক খাত থেকে বহন করতে হয়। উচ্চমূল্যের শিক্ষা উপকরণ, লাগামহীন কোচিং বাণিজ্য এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আকাশচুম্বী ফি-র কারণে অনেক দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা থেকে ছিটকে পড়ছে। এডিপি বরাদ্দ কমিয়ে দেওয়ার ফলে সরকারি স্কুল ও কলেজে ল্যাবরেটরি সুবিধা, লাইব্রেরি সংস্কার এবং ডিজিটাল শিক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। এর ফলে তৈরি হবে একটি দ্বিমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা—যেখানে টাকা থাকলে মানসম্মত শিক্ষা পাওয়া যাবে, আর সাধারণের জন্য থাকবে মানহীন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা। এটি প্রকারান্তরে সমাজে বৈষম্যকে আরও গভীর ও স্থায়ী রূপ দেবে।

বিভাগীয় বরাদ্দের চুলচেরা বিশ্লেষণ: বৈষম্য ও বাস্তবতা

আর্টিকেলটির একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো বরাদ্দের এই অসম বিভাজন। যদিও সামগ্রিকভাবে শিক্ষা বরাদ্দ কমছে, তবে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে বরাদ্দ প্রায় ৩৮ দশমিক ৭৮ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। এটি প্রাথমিক শিক্ষার ভিত মজবুত করার ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা যেতে পারে। কিন্তু সমস্যা হলো, প্রাথমিকে শিক্ষিত বিশাল জনগোষ্ঠী যখন মাধ্যমিক বা উচ্চশিক্ষার স্তরে পৌঁছাবে, তখন সেখানে সুযোগ-সুবিধার অভাব তাদের বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করবে। এছাড়া কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগে সামান্য (১.৭০ শতাংশ) বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে, যা বর্তমান ডিজিটাল বিপ্লব বা চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সমুদ্রের মাঝে এক বিন্দু জলের মতো। আমাদের প্রয়োজন ছিল কারিগরি শিক্ষায় এক বিশাল বিপ্লব, যা এই সামান্য বরাদ্দে সম্ভব নয়।

গবেষণা ও উদ্ভাবনের মৃত্যুঘণ্টা?

একটি দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কেন বিশ্ব র‍্যাঙ্কিংয়ে পিছিয়ে থাকে, তার মূল কারণ লুকিয়ে থাকে গবেষণার বরাদ্দে। বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার জন্য যে পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়, তা অনেক সময় একটি বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপকের গবেষণা গ্র্যান্টের চেয়েও কম। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের উন্নয়ন বরাদ্দ অর্ধেক কমিয়ে ফেলার অর্থ হলো নতুন কোনো গবেষণা প্রকল্প হাতে না নেওয়া এবং চলমান ল্যাবরেটরিগুলোর আধুনিকায়ন বন্ধ করে দেওয়া। এর ফলে দেশ থেকে মেধাপাচার বা 'ব্রেইন ড্রেইন' আরও বাড়বে। মেধাবী তরুণরা যখন দেখবে তাদের নিজ দেশে গবেষণার বা মেধা বিকাশের পরিবেশ নেই, তখন তারা উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে পাড়ি জমাতে বাধ্য হবে।

এই সংকটাপন্ন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে আমূল পরিবর্তন আনা জরুরি। কেবল বরাদ্দ দিলেই হবে না, বরং সেই বরাদ্দ যেন শতভাগ স্বচ্ছতার সাথে এবং সময়মতো ব্যয় হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। নিচে কিছু সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা তুলে ধরা হলো:

বাস্তবায়ন মনিটরিং সেল: প্রতিটি শিক্ষা প্রকল্পের জন্য একটি শক্তিশালী এবং স্বাধীন মনিটরিং সেল গঠন করা প্রয়োজন, যারা প্রতি মাসে কাজের অগ্রগতি মূল্যায়ন করবে।

গবেষণায় বাধ্যতামূলক বরাদ্দ: মোট উন্নয়ন বাজেটের একটি নির্দিষ্ট অংশ কেবল মৌলিক ও প্রায়োগিক গবেষণার জন্য সংরক্ষিত রাখতে হবে।

আমলাতান্ত্রিক জটিলতা হ্রাস: শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি বিশেষ শাখা খোলা যেতে পারে যারা কেবল প্রকল্পের অনুমোদন ও অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়াটি দ্রুততম সময়ে সম্পন্ন করবে।

জাতীয় কৌশলপত্র: শিক্ষা খাতকে রাজনৈতিক ইস্যু না বানিয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদী 'জাতীয় শিক্ষানীতি ও উন্নয়ন কৌশলপত্র' প্রণয়ন করতে হবে, যা সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে পরিবর্তিত হবে না।

রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার পুনর্বিবেচনার সময়

পরিশেষে বলা যায়, শিক্ষায় প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় করা রাষ্ট্রের জন্য হয়তো সাময়িক কিছু বাজেট ঘাটতি কমাতে সাহায্য করবে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি একটি জাতিকে মেধা ও মননে পঙ্গু করে দেওয়ার সমান। ইটের পর ইট গেঁথে দালান তৈরি করা সহজ, কিন্তু একটি দক্ষ ও আধুনিক মননসম্পন্ন প্রজন্ম তৈরি করা সময়সাপেক্ষ এবং কঠিন কাজ। মেধার চেয়ে অবকাঠামোকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া একটি জাতির জন্য আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হতে পারে।

বাংলাদেশ এখন একটি ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। এই সময়ে মেধাভিত্তিক সমাজ গঠনের পরিবর্তে যদি শিক্ষা বাজেট থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া হয়, তবে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জনের শেষ সুযোগটিও আমরা হারিয়ে ফেলব। সরকারের উচিত দ্রুততম সময়ে সংশোধিত এই বরাদ্দের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা এবং শিক্ষা খাতকে প্রকৃত অর্থেই জাতীয় অগ্রগতির চালিকাশক্তি হিসেবে ঘোষণা করা। কারণ, একটি শিক্ষিত ও দক্ষ প্রজন্মই পারে একটি দেশকে সত্যিকারের উন্নত ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত করতে।

মন্তব্যসমূহ