নতুন শিক্ষাবর্ষ দোড়গোড়ায়: বই সংকটে ৭০ লাখ শিক্ষার্থী কী করবে?

ব্যাঙেরছাতা

বছরের শেষ প্রান্তের হিমেল হাওয়া বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের মনে এক অন্যরকম শিহরণ জাগায়। নতুন ক্লাসে ওঠার আনন্দ আর পহেলা জানুয়ারির ‘বই উৎসব’ যেন আমাদের সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের আসন্ন শিক্ষাবর্ষ ঘিরে যে আশঙ্কার কালো মেঘ ঘনীভূত হচ্ছে, তা গত কয়েক দশকের ইতিহাসে বিরল। যখন নতুন বছর শুরু হতে হাতে মাত্র ১০টি দিন বাকি, তখন দেশের মাধ্যমিক স্তরের প্রায় ৭০ লাখ শিক্ষার্থীর হাতে বই পৌঁছানো নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকের সংবাদ বিশ্লেষণ করলে একটি ভয়াবহ সত্য সামনে আসে—মার্চ মাসের আগে এই বিশাল সংখ্যক শিক্ষার্থী তাদের পাঠ্যবইয়ের ঘ্রাণ পাবে না। একটি উন্নয়নকামী রাষ্ট্রের জন্য শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই এমন বড় ধরনের হোঁচট কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, বরং একটি প্রজন্মের মেধাবিকাশে বড় অন্তরায়।

সংকটের বর্তমান চিত্র: পরিসংখ্যানের ভয়াবহতা

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)-এর সর্বশেষ তথ্য এবং মাঠ পর্যায়ের সরবরাহ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করলে যে চিত্রটি ফুটে ওঠে তা সত্যিই উদ্বেগজনক। মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য এবার সব মিলিয়ে প্রায় ২১ কোটি পাঠ্যবইয়ের প্রয়োজন। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, ডিসেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত এর মধ্যে মাত্র ৫ কোটি বই উপজেলা পর্যায়ে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে। অর্থাৎ, চাহিদার মাত্র ২৫ শতাংশ বই বর্তমানে বিতরণের জন্য প্রস্তুত। বাকি ১৫ কোটিরও বেশি বই এখনো ছাপাখানার মেশিনে কিংবা কাগজ সংকটের আবর্তে আটকে আছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, গত কয়েক বছর ধরে বই বিতরণে কিছুটা বিলম্ব হলেও এবারের মতো পরিস্থিতি আগে কখনো তৈরি হয়নি। গত ২০২৫ শিক্ষাবর্ষে এপ্রিল পর্যন্ত বই বিতরণ চলেছিল, কিন্তু ২০২৬ সালে সেই রেকর্ড ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। যদি মার্চের আগে বই না পৌঁছায়, তবে শিক্ষাবর্ষের প্রথম তিন মাস শিক্ষার্থীরা সম্পূর্ণ অভিভাবকহীন বা গাইড-নির্ভর পড়াশোনায় কাটাতে বাধ্য হবে।

কেন এই স্থবিরতা? সংকটের গভীরে অনুসন্ধান

পাঠ্যবই ছাপানো ও বিতরণে এই বিশৃঙ্খলার পেছনে কোনো একটি নির্দিষ্ট কারণ দায়ী নয়। বরং এটি প্রশাসনিক অদূরদর্শিতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং স্বার্থান্বেষী মহলের কারসাজির এক সম্মিলিত রূপ। সংবাদপত্রের বিশ্লেষণ থেকে প্রাপ্ত প্রধান কারণগুলো নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

দরপত্র বা টেন্ডার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা:

বই ছাপানোর স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ী মে-জুন মাসেই দরপত্র প্রক্রিয়া শেষ করার কথা। এবারও তা শুরু হয়েছিল, কিন্তু গত সেপ্টেম্বর মাসে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ হুট করেই আগের দরপত্র বাতিল করে দেয়। এরপর অক্টোবর মাসে পুনঃদরপত্র (Re-tender) আহ্বান করা হয়। এই তিন মাসের বিলম্বই মূলত পুরো কার্যক্রমকে খাদের কিনারায় ঠেলে দিয়েছে। বিশেষ করে নবম শ্রেণির বইয়ের কার্যাদেশ কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়াই আড়াই মাস আটকে রাখা হয়েছিল, যা এখন শাঁখের করাত হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কাগজ সিন্ডিকেট ও কমিশন বাণিজ্যের থাবা:

বই ছাপানোর প্রধান উপকরণ হলো কাগজ। অভিযোগ উঠেছে যে, এনসিটিবির একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট নির্দিষ্ট ৫টি পেপার মিলের বাইরে অন্য কোনো মিল থেকে কাগজ কেনার অনুমতি দিচ্ছে না। দেশে শতাধিক মানসম্মত কাগজ কল থাকা সত্ত্বেও মাত্র কয়েকটি মিলের ওপর নির্ভরতা কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে। ছাপাখানা মালিকদের দাবি, প্রতি টন কাগজে প্রায় ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত কমিশন বাণিজ্য চলছে। এই সিন্ডিকেটের কারণে কাগজের দাম বর্তমানে টন প্রতি ১ লাখ ১৭ হাজার টাকায় ঠেকেছে, যা উন্মুক্ত বাজার থাকলে ১ লাখ টাকার নিচে রাখা সম্ভব ছিল। এই বাড়তি খরচের বোঝা এবং কাগজের অভাব মুদ্রণ প্রক্রিয়াকে স্থবির করে দিয়েছে।

মুদ্রণ শ্রমিক ও কারিগরি সংকট:

ডিসেম্বর মাস হলো ছাপাখানাগুলোর জন্য সবচেয়ে ব্যস্ত সময়। কারণ এই সময়ে বাজারের নোট ও গাইড বই ছাপানোর ধুম পড়ে। ফলে সরকারি বই ছাপানোর জন্য দক্ষ বাইন্ডার বা শ্রমিক পাওয়া দুরুহ হয়ে পড়েছে। এছাড়া সামনের দিনগুলোতে রাজনৈতিক কর্মসূচি বা নির্বাচন সংক্রান্ত ব্যস্ততা বাড়লে শ্রমিকরা সেই কাজে বেশি আগ্রহী হবে, যা বই তৈরির গতিকে আরও কমিয়ে দেবে।

গাইড বই সিন্ডিকেটের প্রভাব:

শিক্ষানুরাগীদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ যে, পাঠ্যবই যত দেরিতে বাজারে আসবে, গাইড বই ব্যবসায়ীদের ব্যবসা তত রমরমা হবে। যখন জানুয়ারিতে শিক্ষার্থীরা বই পাবে না, তখন নিরুপায় হয়ে অভিভাবকরা বাজার থেকে চড়া দামে গাইড বই কিনতে বাধ্য হবেন। এনসিটিবির কিছু অসাধু কর্মকর্তার সাথে এই অশুভ চক্রের গোপন আঁতাত এই কৃত্রিম বিলম্বের পেছনে কাজ করছে কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি হয়ে পড়েছে।

শিক্ষার্থীদের ওপর এর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব

একটি শিক্ষাবর্ষের প্রথম তিন মাস হলো ভিত্তি গড়ার সময়। এই সময়ে বই না থাকা মানে হলো পুরো বছরটি অনিশ্চয়তার মধ্যে কাটানো।

শিখন ঘাটতি ও মানসিক চাপ: বই না থাকায় ক্লাসে শিক্ষকরা যথাযথভাবে পাঠদান করতে পারেন না। অথচ শিক্ষা ক্যালেন্ডার অনুযায়ী বার্ষিক পরীক্ষা বা মূল্যায়নগুলো কিন্তু ঠিক সময়েই হয়। ফলে শিক্ষার্থীরা সিলেবাস শেষ করতে পারে না এবং গভীর শিখন ঘাটতি নিয়ে পরবর্তী ক্লাসে উত্তীর্ণ হয়। এটি দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় মেধার মান কমিয়ে দেয়।

ঝরে পড়ার হার বৃদ্ধি: বিশেষ করে গ্রামাঞ্চল ও প্রান্তিক এলাকায় নতুন বই শিশুদের স্কুলে যাওয়ার প্রধান আকর্ষণ। বছরের শুরুতে বই না পেলে অনেক দরিদ্র শিক্ষার্থী পড়াশোনায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলে এবং কর্মসংস্থানে যুক্ত হয়ে যায়, যা দেশের ড্রপআউট রেট বাড়িয়ে দেয়।

শিক্ষা বৈষম্য: সচ্ছল পরিবারের সন্তানরা হয়তো পুরাতন বই সংগ্রহ বা প্রাইভেট টিউটরের মাধ্যমে পড়াশোনা চালিয়ে নিতে পারে, কিন্তু সরকারি বইয়ের ওপর নির্ভরশীল সাধারণ ঘরের সন্তানদের জন্য এটি অপূরণীয় ক্ষতি। এর ফলে সমাজে শিক্ষা ক্ষেত্রে এক ধরনের প্রকট বৈষম্য তৈরি হয়।

মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা ও তদারকির অভাব

বর্তমানে এনসিটিবির শীর্ষ পদে স্থায়ী নেতৃত্বের অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের পক্ষে বিশাল এই কর্মযজ্ঞ সামলানো কঠিন হয়ে পড়ছে। মাঠ পর্যায়ে ছাপাখানাগুলোতে এনসিটিবির যে ধরনের কঠোর নজরদারি থাকা প্রয়োজন ছিল, তা একেবারেই অনুপস্থিত। অনেক ক্ষেত্রে ছাপাখানাগুলো নিম্নমানের কাগজ ব্যবহার করছে কি না বা কাজ ফেলে রাখছে কি না, তা দেখার মতো কেউ নেই। কর্মকর্তারা যখন এসি রুমে বসে মিটিং করছেন, তখন সাধারণ শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে বইয়ের জন্য হাহাকার করছেন।

সংকট উত্তরণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ

এই গভীর খাদ থেকে উঠে আসার জন্য এখন আর সাধারণ পদক্ষেপে কাজ হবে না। সরকারকে ‘ক্রাশ প্রোগ্রাম’ হাতে নিতে হবে:

কাগজের বাজার উন্মুক্ত করা: সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে দেশের সব অনুমোদিত মিল থেকে দ্রুত কাগজ সংগ্রহের অনুমতি দিতে হবে। প্রয়োজনে আমদানির পথে থাকা কাগজের ওপর শুল্ক ছাড় দিয়ে দ্রুত ছাড়পত্র দিতে হবে।

বিশেষ টাস্কফোর্স নিয়োগ: মুদ্রণ ও বিতরণ কার্যক্রম তদারকি করতে সেনাবাহিনী বা বিশেষ দক্ষ টাস্কফোর্স নিয়োগ করা যেতে পারে, যারা প্রতিটি ছাপাখানায় উপস্থিত থেকে কাজ নিশ্চিত করবে।

ডিজিটাল কনটেন্টের প্রসার: যতদিন হার্ডকপি বই না পৌঁছাবে, ততদিন এনসিটিবির ওয়েবসাইটে প্রতিটি বইয়ের অধ্যায়ভিত্তিক মানসম্মত পিডিএফ এবং ভিডিও লেকচার প্রচার করতে হবে যাতে শিক্ষার্থীরা অন্তত স্মার্টফোনে পড়াশোনা শুরু করতে পারে।

জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ: যে সকল কর্মকর্তার অবহেলায় টেন্ডার প্রক্রিয়ায় বিলম্ব হয়েছে বা যারা সিন্ডিকেটের সাথে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।

শিক্ষা কোনো বাণিজ্যিক পণ্য নয়, এটি রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের সাংবিধানিক পাওনা। ২০২৬ সালের শুরুতে ৭০ লাখ শিক্ষার্থীর এই হাহাকার কেবল একটি প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, এটি আমাদের আগামীর সুন্দর বাংলাদেশের স্বপ্নে একটি বড় আঘাত। পহেলা জানুয়ারি ‘বই উৎসব’ কেবল লোকদেখানো উৎসবে সীমাবদ্ধ না রেখে, প্রকৃত অর্থে শিক্ষার্থীদের হাতে বই পৌঁছে দেওয়াই হোক সরকারের প্রধান লক্ষ্য। আমরা আশা করি, সরকার ও সংশ্লিষ্ট মহল সকল সংকীর্ণ স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দ্রুততম সময়ে বই সংকট নিরসনে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। অন্যথায়, এই শিখন ঘাটতির খেসারত জাতিকে কয়েক দশক ধরে দিতে হতে পারে। আমাদের সন্তানদের হাতে বই তুলে দিন, তাদের ভবিষ্যৎকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেবেন না।

মন্তব্যসমূহ