মব জাস্টিস বনাম আইনের শাসন: একটি নতুন বাংলাদেশের অস্তিত্ব রক্ষার চ্যালেঞ্জ

ব্যাঙেরছাতা

একটি রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড হলো তার বিচারিক কাঠামো এবং আইনের শাসন। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার “তথাকথিত” গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ এক নতুন সূচনার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়েছে। কয়েক দশকের স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থা, বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির জগদ্দল পাথর সরিয়ে দেশের মানুষ এক বৈষম্যহীন সাম্যের বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখেছে। কিন্তু এই মহৎ অর্জনের পর গত কয়েক মাস ধরে দেশের বিভিন্ন স্থানে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা 'মব জাস্টিস' বা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা সেই স্বপ্নের পথে এক বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে খাগড়াছড়ি, আর সবশেষ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ঘিরে যে ধরনের উত্তপ্ত পরিস্থিতি ও জনরোষের বহিঃপ্রকাশ দেখা গেছে—তা নাগরিক সমাজকে ভাবিয়ে তুলছে। প্রশ্ন উঠেছে, আমরা কি একটি নিয়মতান্ত্রিক রাষ্ট্র বিনির্মাণের পথে আছি, নাকি প্রতিশোধের রাজনীতি ও বিচারহীনতার এক নতুন চক্রে প্রবেশ করছি?

মব জাস্টিসের স্বরূপ ও বর্তমান প্রেক্ষাপট

মব জাস্টিস বলতে এমন এক পরিস্থিতিকে বোঝায় যেখানে একদল উত্তেজিত জনতা রাষ্ট্রের প্রচলিত আইনের তোয়াক্কা না করে নিজেরাই বিচারক ও জল্লাদের ভূমিকা পালন করে। গত কয়েক মাসে আমরা দেখেছি—পিটিয়ে মানুষ হত্যা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জোরপূর্বক শিক্ষকদের পদত্যাগ, মাজার বা ধর্মীয় উপাসনালয়ে হামলা এবং আদালত প্রাঙ্গণে আসামিদের ওপর শারীরিক আক্রমণ।

এই মব জাস্টিস কেবল শারীরিক সহিংসতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি এখন মানসিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়েও ছড়িয়ে পড়ছে। যখন কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়াই শুধুমাত্র রাজনৈতিক তকমা দিয়ে কাউকে সামাজিকভাবে বয়কট করা হয় বা আইনি প্রক্রিয়ার আগেই অপরাধী সাব্যস্ত করা হয়, তখন তা রাষ্ট্রীয় কাঠামোর জন্য হুমকিস্বরূপ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচার প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে যে ধরনের উত্তেজনা তৈরি হয়েছে এবং প্রসিকিউটরদের মন্তব্যকে কেন্দ্র করে যে প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে, তা এই মব কালচারের একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল দিক উন্মোচন করে।

ট্রাইব্যুনাল, প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম ও 'মব' বিতর্ক

সাম্প্রতিক গত ২৪ ঘণ্টার সংবাদপত্রের পাতা উল্টালে দেখা যায়, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামের একটি মন্তব্য ঘিরে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে। ট্রাইব্যুনালের মতো একটি সংবেদনশীল জায়গায় বিচারপ্রক্রিয়া চলাকালীন বাইরে 'মব' বা উত্তেজিত জনতার অবস্থান এবং তাদের চাপের মুখে বিচারিক কার্যক্রমের স্বচ্ছতা রক্ষা করা কতটুকু চ্যালেঞ্জিং, তা নিয়ে তিনি সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন।

এর প্রতিক্রিয়ায় রাজনৈতিক অঙ্গন ও সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ কেউ বলছেন, বিপ্লবের অংশীদারদের 'মব' বলাটা অসম্মানজনক। কিন্তু আইনগত ও সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, বিপ্লব পরবর্তী সময়ে রাজপথের শক্তি যখন বিচারালয়ের ভেতরে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে, তখন তাকে আইনি পরিভাষায় 'মব ইনফ্লুয়েন্স' বা মব জাস্টিসের ছায়া বলা হয়। এটি কোনোভাবেই বিপ্লবের চেতনাকে খাটো করা নয়, বরং বিপ্লবকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার একটি যৌক্তিক দাবি। যদি বিচার প্রক্রিয়ায় আইনের বদলে রাস্তার আবেগ প্রধান হয়ে ওঠে, তবে সেই বিচার আন্তর্জাতিক মহলে গ্রহণযোগ্যতা হারাবে, যা প্রকারান্তরে জুলাই বিপ্লবের শহীদদের রক্তের প্রতি অসম্মান বয়ে আনবে।

বিচারহীনতার দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত ও বর্তমান ক্ষোভের উৎস

বাংলাদেশের ইতিহাসে বিচারহীনতার সংস্কৃতি এক গভীর ক্ষত। গত ১৫ বছর ধরে সাধারণ মানুষ দেখেছে কীভাবে বিচার বিভাগকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। ভুক্তভোগীরা থানায় গিয়ে মামলা করতে পারেননি, আদালতে গিয়ে ন্যায়বিচার পাননি। এই দীর্ঘদিনের অবদমিত ক্ষোভ যখন গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বিস্ফোরিত হয়, তখন মানুষের মধ্যে এক ধরনের 'তাৎক্ষণিক বিচার' (Instant Justice) পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়।

মানুষ মনে করছে, গতানুগতিক আইনি প্রক্রিয়ায় বিচার পেতে দীর্ঘ সময় লাগবে অথবা অপরাধীরা ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে যাবে। এই অবিশ্বাস থেকেই মব জাস্টিসের জন্ম। কিন্তু আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, স্বৈরাচারের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার অর্থ হলো—অবিচার থেকে মুক্তি, অন্য কোনো অবিচার দিয়ে তাকে প্রতিস্থাপন করা নয়। মব জাস্টিস আসলে সেই বিচারহীনতারই অন্য একটি রূপ, যা আরও বেশি বিপজ্জনক।

সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব: সমাজ কোন দিকে যাচ্ছে?

মব জাস্টিসের ফলে সমাজ এক ধরনের চরম অনিশ্চয়তা ও ভীতির সংস্কৃতির দিকে ধাবিত হচ্ছে। যখন সাধারণ মানুষ দেখে যে আইন নিজের হাতে তুলে নিলে কোনো শাস্তি হয় না, তখন অপরাধপ্রবণ গোষ্ঠীগুলো এই সুযোগটি ব্যবহার করতে শুরু করে। বর্তমানে বিভিন্ন ব্যক্তিগত শত্রুতা মেটাতে বা জমি সংক্রান্ত বিরোধ সমাধানেও মানুষ 'মব' ব্যবহার করছে। এর ফলে:

১. নিরাপত্তাহীনতা: নাগরিকরা নিজেদের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিতবোধ করছেন।

২. পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা: আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যখন দেখে মবের ভয়ে তারা কাজ করতে পারছে না বা উল্টো রোষানলে পড়ছে, তখন তারা এক ধরনের নিষ্ক্রিয়তা প্রদর্শন করে।

৩. মানবাধিকার লঙ্ঘন: বিনা বিচারে বা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে কাউকে শাস্তি দেওয়া মানবাধিকারের চূড়ান্ত অবমাননা।

বিশেষ করে গুজব ও ভুয়া তথ্যের (Misinformation) বিস্তার মব জাস্টিসকে উসকে দিচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া উসকানিমূলক পোস্ট একটি বিশাল জনতাকে সহিংস করে তুলছে, যা নিয়ন্ত্রণ করা কোনো রাষ্ট্রের পক্ষেই এককভাবে সম্ভব নয় যদি না সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে ওঠে।

আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পথে বড় বাধাগুলো

মব জাস্টিস রোধ করে আইনের শাসন কায়েম করার পথে বেশ কিছু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে:

প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা: বছরের পর বছর রাজনৈতিক ব্যবহারের ফলে পুলিশ ও বিচার বিভাগ তাদের নৈতিক অবস্থান হারিয়েছে। পুনর্গঠন ছাড়া মানুষের আস্থা ফেরানো কঠিন।

রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব: রাজনৈতিক দলগুলো প্রায়ই নিজেদের স্বার্থে উত্তেজিত জনতাকে ব্যবহার করে। যখন কোনো দল মব জাস্টিসকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সমর্থন দেয়, তখন আইন গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে।

আবেগের কাছে যুক্তির পরাজয়: বিপ্লব পরবর্তী সময়ে মানুষের আবেগ অত্যন্ত তীব্র থাকে। এই আবেগকে পুঁজি করে একদল সুবিধাভোগী আইনকে পাশ কাটাতে চায়।

সমাধানের পথ: একটি নতুন সামাজিক চুক্তি

বাংলাদেশকে যদি সত্যিকার অর্থেই এক নতুন পথে চালিত করতে হয়, তবে মব জাস্টিসের সংস্কৃতিকে সমূলে উপড়ে ফেলতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন বহুমুখী পদক্ষেপ:

ক) বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ:

 আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল থেকে শুরু করে নিম্ন আদালত—প্রতিটি স্তরে বিচারকদের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। বিচার প্রক্রিয়া যেন কোনোভাবেই জনতার চাপের কাছে মাথা নত না করে।

খ) দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা: 

মানুষের তাৎক্ষণিক বিচারের আকাঙ্ক্ষাকে প্রশমিত করতে হলে দীর্ঘসূত্রিতা কমাতে হবে। বড় বড় অপরাধের ক্ষেত্রে প্রকাশ্য ট্রায়াল এবং নিয়মিত আপডেট প্রদানের মাধ্যমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।

গ) আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্রিয়তা: 

পুলিশকে দলীয় লেজুড়বৃত্তি থেকে মুক্ত করে পেশাদার বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। মব জাস্টিস যারা করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে কেউ আইন হাতে তুলে নেওয়ার সাহস না পায়।

ঘ) গণমাধ্যমের ভূমিকা: 

গণমাধ্যমকে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রচারের মাধ্যমে গুজব প্রতিরোধ করতে হবে। মব জাস্টিসের কুফল সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরি করতে হবে।

ঙ) রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব: 

প্রতিটি রাজনৈতিক দলকে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করতে হবে যে, তাদের কোনো কর্মী যদি মব জাস্টিসের সঙ্গে জড়িত হয়, তবে তাকে দল থেকে বহিষ্কার ও আইনের হাতে তুলে দেওয়া হবে।

“তথাকথিত” জুলাই বিপ্লব আমাদের যে সুযোগ এনে দিয়েছে, তা শত বছরে একবার আসে। এই সুযোগের অপব্যবহার করে আমরা যদি আইনের শাসন জলাঞ্জলি দিয়ে মব জাস্টিসকে প্রশ্রয় দিই, তবে ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না। মব জাস্টিস কেবল একজন ব্যক্তি বা একটি গোষ্ঠীকে আঘাত করে না, এটি আঘাত করে রাষ্ট্রের ভিত্তিপ্রস্তরকে। আমরা চাই এমন একটি বাংলাদেশ যেখানে অপরাধীর শাস্তি হবে সুনিশ্চিত, কিন্তু তা হবে আইনের যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।

উত্তেজিত জনতা বিপ্লব করতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারে না। রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজন সুশৃঙ্খল আইন, মানবিক বিচারব্যবস্থা এবং নাগরিকদের সহনশীলতা। মব জাস্টিসকে না বলে আইনের শাসনকে গ্রহণ করাই হোক আজকের অঙ্গীকার। তবেই আমরা শহীদদের রক্তের প্রতি সঠিক সম্মান প্রদর্শন করতে পারব এবং একটি গণতান্ত্রিক ও স্থিতিশীল বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব।

এই বিষয়ে আপনার মতামত বা প্রতিক্রিয়া কী তা কমেন্টে লিখে জানান। আপনার মতামত আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 

মন্তব্যসমূহ