গাজায় বহুজাতিক বাহিনী ও বাংলাদেশের আকস্মিক অংশগ্রহণ: একটি কূটনৈতিক ও নৈতিক বিশ্লেষণ
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকা গত কয়েক দশক ধরে বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম এক ট্র্যাজেডির নাম। ২০২৪ সালের শেষভাগ থেকে ২০২৫ এর শুরু পর্যন্ত ইসরায়েলি আগ্রাসনে গাজা যখন এক ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে, ঠিক তখনই আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন এক মেরুকরণ সৃষ্টি হয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ‘ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স’ (ISF) বা আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী গঠনের ঘোষণাকে কেন্দ্র করে। দীর্ঘ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের পক্ষে অটল থাকা বাংলাদেশ এই বাহিনীতে যোগ দেওয়ার যে আগ্রহ প্রকাশ করেছে, তা দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এক বিশাল প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। গত ১০ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে ওয়াশিংটনে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানের পক্ষ থেকে আসা এই ঘোষণাটি কেবল একটি সামরিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং বাংলাদেশের দীর্ঘকালীন পররাষ্ট্রনীতির এক আমূল পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করছে। একটি অনির্বাচিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের এমন এক স্পর্শকাতর এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রভাবসম্পন্ন সিদ্ধান্ত কেন নিতে হলো, তা এখন গভীর বিশ্লেষণের দাবি রাখে।
প্রেক্ষাপট: ট্রাম্পের ২০ দফা শান্তি প্রস্তাব ও আইএসএফ
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ২০ দফা শান্তি প্রস্তাবের একটি অন্যতম অংশ হলো গাজায় ‘ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স’ বা আইএসএফ মোতায়েন করা। এই বাহিনীর লক্ষ্য হিসেবে বলা হচ্ছে গাজায় শান্তি ফেরানো এবং যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা। কিন্তু এই প্রস্তাবের পরতে পরতে লুকিয়ে আছে ইসরায়েলের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ। প্রস্তাব অনুযায়ী, এই বাহিনী সরাসরি জাতিসংঘের একক কমান্ডে পরিচালিত না হয়ে একটি স্বাধীন আন্তর্জাতিক প্রশাসনিক সত্তা হিসেবে কাজ করবে, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘বোর্ড অফ পিস’।
বাস্তবতা হলো, এই বাহিনীর প্রতিটি পদক্ষেপ ইসরায়েল ও মিশরের সম্মতির ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে ইসরায়েল স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, গাজাকে অস্ত্রমুক্ত করা এবং হামাসকে সম্পূর্ণভাবে নিষ্ক্রিয় করাই তাদের মূল লক্ষ্য। দীর্ঘ ১৯ বছর ধরে গাজার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও সামাজিক ব্যবস্থা পরিচালনা করা হামাস স্বাভাবিকভাবেই এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের মতে, এটি গাজার ওপর একটি ‘আন্তর্জাতিক অভিভাবকত্ব’ চাপিয়ে দেওয়ার অপকৌশল মাত্র। এমন এক বিতর্কিত ও একপাক্ষিক মিশনে বাংলাদেশের অংশ হওয়ার প্রস্তাবটি তাই বিশ্বজুড়ে বিস্ময় সৃষ্টি করেছে।
বাংলাদেশের ঐতিহাসিক অবস্থান ও নীতিগত বিচ্যুতি
১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশ ফিলিস্তিনিদের ন্যায্য অধিকারের পক্ষে উচ্চকণ্ঠ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান থেকে শুরু করে পরবর্তী সকল সরকারই ১৯৬৭ সালের সীমান্ত অনুযায়ী পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে একটি স্বাধীন সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের দাবি জানিয়ে এসেছে। ইসরায়েলকে একটি ‘আগ্রাসী রাষ্ট্র’ হিসেবে গণ্য করে বাংলাদেশ কখনোই তাদের সাথে কোনো প্রকার কূটনৈতিক বা বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন করেনি। এমনকি বাংলাদেশি পাসপোর্টে দীর্ঘদিন ধরে ‘ইসরায়েল ব্যতীত সকল দেশের জন্য বৈধ’ লেখাটি আমাদের জাতীয় সংহতির প্রতীক হয়ে আছে।
কিন্তু বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষ থেকে গাজায় সেনা পাঠানোর এই আগ্রহ সেই দীর্ঘ ঐতিহ্যের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। যেখানে পাকিস্তান, সৌদি আরব, কাতার এবং জর্ডানের মতো বড় মুসলিম দেশগুলো এই বাহিনীতে যোগ দিতে সরাসরি ‘না’ করে দিয়েছে, সেখানে বাংলাদেশ কেন যেচে এই প্রস্তাব দিল? সৌদি আরব স্পষ্ট বলেছে, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ ছাড়া তারা কোনো বাহিনীতে অংশ নেবে না। পাকিস্তান জানিয়েছে, তারা হামাসকে নিরস্ত্র করার কোনো অভিযানে যাবে না। এই দেশগুলোর উদ্বেগের মূল কারণ হলো, তারা চায় না তাদের দেশের সেনাবাহিনী গাজাবাসীর কাছে ইসরায়েলি দখলদারিত্বের সহযোগী হিসেবে পরিচিত হোক। অথচ বাংলাদেশ সরকার এমন এক সময়ে এই সিদ্ধান্ত নিল যখন দেশের মানুষের আবেগ ও ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমর্থন ইতিহাসের যেকোনো সময়ের চেয়ে তুঙ্গে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষণ: ট্রাম্প প্রশাসনকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা?
বিশ্লেষকদের মতে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের এই আকস্মিক সিদ্ধান্তের পেছনে থাকতে পারে গভীর কোনো কূটনৈতিক বাধ্যবাধকতা বা কৌশল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ইউনুস সরকারের ওপর বিভিন্ন দিক থেকে চাপ বাড়ছিল। বিশেষ করে ২০২৫ সালের জুন-জুলাই থেকে ট্রাম্প প্রশাসন বাংলাদেশে দ্রুত একটি নির্বাচিত সরকার গঠনের জন্য তাগিদ দিয়ে আসছিল। এছাড়াও বাণিজ্য শুল্ক, ভিসা নীতি এবং ৫০০০ বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠানোর মতো ইস্যুগুলো সরকারের ওপর এক ধরনের মানসিক ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেছে।
অনেকের ধারণা, এই চাপ সামলাতে এবং ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করতেই গাজা মিশনে সেনা পাঠানোর এই ‘টোপ’ ব্যবহার করা হয়েছে। সরকারের মেয়াদ শেষ হতে যখন মাত্র এক মাস বা তার কিছু বেশি সময় বাকি, তখন এমন একটি প্রস্তাব দেওয়ার পেছনে ‘সেফ এক্সিট’ নিশ্চিত করার কোনো সুপ্ত আকাঙ্ক্ষা আছে কিনা—সেই প্রশ্নও জনমনে ঘুরপাক খাচ্ছে। অর্থাৎ, নিজেদের গদি বা অবস্থান সুরক্ষিত করতে কি বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের পররাষ্ট্রনীতিকে বিসর্জন দেওয়া হচ্ছে?
আভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও সামরিক প্রতিক্রিয়া
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ফিলিস্তিন ইস্যুটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। দেশের প্রতিটি রাজনৈতিক দল এবং সাধারণ মানুষ সবসময়ই গাজাবাসীর পাশে দাঁড়িয়েছে। অথচ এই সিদ্ধান্তের আগে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে কোনো প্রকার আলোচনা বা জাতীয় ঐকমত্য তৈরির চেষ্টা করা হয়নি। এমনকি খোদ উপদেষ্টা পরিষদের অনেক সদস্য এবং সশস্ত্র বাহিনী এই বিষয়ে আগে থেকে জানতেন না বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে।
সামরিক বাহিনীর জন্য এটি একটি নতুন চ্যালেঞ্জ। জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনে বাংলাদেশের গৌরবের ইতিহাস রয়েছে। কিন্তু ট্রাম্পের এই আইএসএফ মিশনটি জাতিসংঘের প্রচলিত ব্লু-হেলমেট মিশনের মতো নয়। এটি মূলত ইসরায়েলের নির্দেশনায় পরিচালিত একটি রাজনৈতিক ও সামরিক অভিযান। যদি বাংলাদেশি সৈন্যরা গাজায় গিয়ে ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে বাধ্য হয়, তবে তা বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে সংকটে ফেলবে। দেশের ভেতরেও এর চরম প্রতিক্রিয়া হতে পারে, যা গৃহবিবাদ বা বড় ধরনের আন্দোলনের রূপ নিতে পারে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের ভাষ্য ও বিশ্ব পরিস্থিতি
বিবিসি বাংলা থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যের আল-জাজিরা—প্রতিটি গণমাধ্যমই গাজায় এই নতুন বহুজাতিক বাহিনীর কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বাহিনীর মূল কাজ হবে হামাসকে নিরস্ত্র করা, যা ফিলিস্তিনিদের অভ্যন্তরীণ প্রতিরোধের শক্তিকে ধ্বংস করে দেবে। তুরস্ক এই বাহিনীতে যোগ দিতে চাইলেও ইসরায়েল তাদের নাকচ করে দিয়েছে, কারণ তুরস্ক ইসরায়েলের সমালোচক। পক্ষান্তরে বাংলাদেশের মতো একটি দেশের প্রস্তাবকে যুক্তরাষ্ট্র স্বাগত জানিয়েছে। এর অর্থ দাঁড়ায়, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র এমন সব দেশকে এই মিশনে চায় যারা তাদের আজ্ঞাবহ হয়ে কাজ করবে।
যদি বাংলাদেশ এই মিশনে অংশ নেয়, তবে ভবিষ্যতে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের দাবি থেকে আমরা নৈতিকভাবে বিচ্যুত হয়ে পড়ব। ওআইসি এবং অন্যান্য মুসলিম দেশের কাছেও বাংলাদেশের অবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ হবে। যেখানে কাতার এবং জর্ডান মনে করে সামরিক হস্তক্ষেপের চেয়ে রাজনৈতিক সংলাপ বেশি জরুরি, সেখানে বাংলাদেশের এই ‘জেচে গিয়ে’ প্রস্তাব দেওয়াটা কোনোভাবেই যুক্তিসঙ্গত মনে হচ্ছে না।
নৈতিকতা বনাম কৌশলগত সুবিধা
গাজায় শান্তি ফেরানোর প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। কিন্তু সেই শান্তি যদি ফিলিস্তিনিদের দমনের মাধ্যমে আসে এবং তাতে যদি বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর মতো একটি গৌরবময় প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করা হয়, তবে তা হবে আত্মঘাতী। একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাজ হলো সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর করা, দেশের মৌলিক পররাষ্ট্রনীতি বদলে দেওয়া নয়।
ফিলিস্তিনের মুক্তিকামী মানুষের রক্তের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে কোনো আন্তর্জাতিক বন্ধুত্বের ভিত মজবুত হতে পারে না। বাংলাদেশ যদি গাজায় সেনা পাঠাতে চায়, তবে তা অবশ্যই জাতিসংঘের সরাসরি তত্ত্বাবধানে এবং ফিলিস্তিনিদের সার্বভৌমত্বের নিশ্চয়তা সাপেক্ষে হওয়া উচিত। ট্রাম্প প্রশাসনকে খুশি করার জন্য বাংলাদেশের গৌরবময় ইতিহাসকে কলঙ্কিত করার সুযোগ নেই।
পরিশেষে বলা যায়, এই সিদ্ধান্তটি কেবল একটি সামরিক ঘোষণা নয়, এটি আমাদের জাতীয় বিবেকের পরীক্ষা। আগামী কয়েক সপ্তাহে সরকার এই বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেয় এবং রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিক্রিয়াই বা কী হয়, তার ওপর নির্ভর করবে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের কূটনৈতিক ভবিষ্যৎ। ফিলিস্তিন ইস্যুতে আমাদের অবস্থান সবসময়ই মজলুমের পক্ষে ছিল এবং থাকা উচিত। কোনো সাময়িক রাজনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে সেই চিরন্তন সত্যকে বিসর্জন দেওয়া হবে এক ঐতিহাসিক ভুল।
তথ্যসূত্র:
১. ডোনাল্ড ট্রাম্পের ২০ দফা শান্তি প্রস্তাব ও নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবনা।
২. বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার ওয়াশিংটন সফর ও স্টেট ডিপার্টমেন্টের সাথে বৈঠক সংক্রান্ত প্রতিবেদন।
৩. আল-জাজিরা ও বিবিসি বাংলায় প্রকাশিত বিশ্বনেতাদের ও হামাসের প্রতিক্রিয়া।
৪. বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পূর্ববর্তী বিভিন্ন বিবৃতি ও ঐতিহাসিক দলিলাদি।
নিজের সেফ এক্সিটের জন্য বাংলাদেশের মানুষের আবেগ অনুভূতির বাইরে গিয়ে ইউনুসের এমন একটি সিদ্ধান্তে আপনার মতামত বা প্রতিক্রিয়া কী তা কমেন্টে লিখে জানান। আপনার মতামত আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

মন্তব্যসমূহ