পুলিশ গার্লফ্রেন্ড- রোমান্টিক প্রেমের গল্প: দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ



পুলিশ গার্লফ্রেন্ড 
(রোমান্টিক প্রেমের গল্প)
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
নওরোজ বিপুল
নিজ কক্ষে কারীবকে নিয়ে আসলো নূমা। সামনের চেয়ারে বসতে বলল। কারীব বসলো। ডেস্কের বাঁ পাশে একটা গ্লাস রাখা আছে। পানি ভর্তি গ্লাসটা একটা প্রিচ দিয়ে ঢাঁকা। প্রিচটা নামিয়ে রাখলো নূমা। গ্লাসটা কারীবের দিকে ঠেলে দিলো। কারীব প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে নূমার দিকে তাকালো। নূমা বলল, ‘থানায় এসে খুব সম্ভব, আপনার গলা শুকিয়ে গেছে। পানিটুকু খান। ভালো লাগবে।’
থানায় কারীবের গলা মোটেও শুকিয়ে যায়নি। সে অপরাধী না। এই মেয়ে ওকে কেন ধরে নিয়ে সেটাও সে বোধগম্য নয়। পানি অবশ্য ওর পান করতে ইচ্ছে করছিল। সন্ধ্যার পর থেকে এককাপ চা পান করারও সুযোগ হয়নি। কোনো টি-স্টলে চা পান করতে গেলে, সাথে দুই এক গ্লাস পানিও পান করা হতো। নূমার দেয়া পানিটুকু পান করে, বেশ তৃপ্তি পেলো কারীব। গ্লাসটা ডেস্কের উপর নামিয়ে রাখলো। জিজ্ঞেস করলো, ‘আমি কি জানতে পারি, আমাকে কেন ধরে নিয়ে আসা হয়েছে?’
নিজের চেয়ারে হেলান দিলো নূমা। কারীবের প্রশ্নের জবাব দিলো না। জানতে চাইলো, ‘কী করেন আপনি?’
‘কী আর করবো, এই যে আপনার সামনে বসে আছি।’
সেই তখন থেকে ছেলেটা, নূমার প্রশ্নের উল্টোপাল্টা জবাব দিচ্ছে। নূমা ওকে বোঝাতে চাইছে একটা। সে বুঝছে একটা। জবাব দিচ্ছে আরেকটা। নূমা বলল, ‘আমার সামনে বসে থাকার কথা আমি জিজ্ঞেস করিনি।’
‘তাহলে?’
‘আপনার প্রফেশন কি?’
‘আমি সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার।’
‘কোথায় জব করেন?’
‘আপাতত কোথাও জব করছি না। আমার আর আমার ফ্রেন্ডের, ছোটখাটো একটা সফটওয়্যার ফার্ম আছে। আমরা বিদেশী ক্লায়েন্টের সাথে কাজ করি।’
‘গুড। আপনার বাবা কী করেন?’
‘নেই।’
‘নেই মানে?’
‘মৃত।’
‘ওহ্, স্যরি! আপনার মা কি হাউস ওয়াইফ?’
‘নেই।’
এবার ভ্রু-কুঁচকালো নূমা। জানতে চাইলো, ‘নেই বলতে?’
‘মৃত।’
‘বাবা-মা দুজনেই মৃত!’ নিজেকেই যেন বলল নূমা। আবার কারীবের কাছে চাইলো, ‘বর্তমানে আপনার গার্ডিয়ান কে?’
‘আমার বড় ভাই।’
‘কী করেন তিনি?’
‘ব্যাংকার।’
‘তাঁর নম্বরটা বলেন।’
‘বর্তমানে ভাইয়া দেশে নেই। অফিসিয়াল ট্যুরে দেশের বাহিরে।’
‘বাসায় আর কে আছে?’
‘ভাবী।’
‘আপনার ভাবীকে ফোন করে থানায় আসতে বলেন।’
‘স্যরি ম্যাম, এখন রাত প্রায় দেড়টা বাজে। এতরাতে আমি ভাবীকে থানায় আসতে বলতে পারবো না। আপনি আমার যা খুশি তাই করতে পারেন।’
‘থানায় এসে আপনাকে ছাড়িয়ে নিয়ে যেতে পারবে, তেমন কোনো ফ্রেন্ড আছে?’
‘থানায় এসে ছাড়িয়ে নিয়ে যাবে মানে কি, আপনি আমাকে ধরে এনেছেন কী অভিযোগে?’
নূমা আরো কিছু বলতে যাচ্ছিলো, পারলো না। আসলো ওর ড্রাইভার মতিন। ওর ডেস্কের ডান পাশে কারীবের বাইকের চাবিটা রাখলো। বলল, ‘স্যার, উনার বাইক ঠিক হয়ে গেছে।’
ইশারায় মতিনকে চলে যেতে বলল নূমা। সে চলে গেলো। কারীবের বাইকের চাবিটা হাতে নিলো নূমা। চাবির রিঙের ভেতর নিজের একটা আঙ্গুল ঢুকালো। কয়েকবার বনবন করে ঘুরালো। প্রায় ছুঁড়ে দিলো কারীবের সামনে। চট করে চাবিটা তুলে নিলো কারীব। বলল, ‘সার্ভিস চার্জ কতো দিতে হবে, নূমা স্যার?’
এবার আর হাসি আটকালো না নূমা। অট্টহাসি না হলেও কিছুটা শব্দ করে হাসলো সে। হাঁসির সময় মুখে হাত দিয়ে রাখলো। হাসি থামালো এক সময়। বলল, ‘আমার এটা একটা থানা। আপনার বাইক সারানোর গ্যারেজ নয় যে। আপনার সাহস তো কম না, আবার সার্ভিস চার্জ দিতে চাইছেন?’
‘না মানে, আমি ভাবলাম, আপনি হয়তো কোনো মেকানিক নিয়ে এসে সারিয়েছেন। তাই… আমি কি এবার যেতে পারি?’
‘না।’
‘না কেন?’
‘কাউকে আসতে হবে, আপনাকে ছাড়িয়ে নিয়ে যেতে হবে।’
‘বারবার ছাড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা বলছেন কেন বলেন তো? আমাকে আপনি ধরে কেন এনেছেন সেটাই তো বলছেন না!’
কারীবের প্রশ্নের সরাসরি কোনো জবাব দিলো না নূমা। বলল, ‘আপনার মোবাইল দেন।’
‘কেন, আমার মোবাইল দিয়ে আপনি কী করবেন?’
‘মোবাইলটা দিতে বলেছি।’
সুবোধ বালকের মতো পকেট থেকে মোবাইল ফোনটা বের করলো কারীব। ডেস্কের উপর রাখলো। ঠেলে পাঠিয়ে দিলো নূমার সামনে। নূমা মোবাইল ফোনটা হাতে তুলে নিলো। কারীবের রিসেন্ট কল লিস্ট চেক করলো। বলল, ‘নাযীর কে?’
‘আমার ফ্রেন্ড।’
‘কল লিস্টের প্রথম নাম, ধরে নিচ্ছি ঘনিষ্ট ফ্রেন্ড। তাকে কল দিলে এখন থানায় আসতে পারবে?’
মেজাজ গরম হয়ে গেলো কারীবের। প্রকাশ করতে পারলো না। এমনিতেই মহিলা যা জ্বালানো জ্বালাচ্ছে, এখন গরম মেজাজ প্রকাশ করতে গেলে আরো বিপদে পড়তে হবে। স্বাভাবিকভাবেই কারীব বলল, ‘কেন ঝামেলা করছেন, ম্যাম… স্যরি… স্যার? সে এখন ঘুমাচ্ছে, তাকে কেন…’
নিজের ঠোঁটে আঙ্গুল রাখলো নূমা। কারীবকে চুপ করতে ইঙ্গিত করলো। ততক্ষণে সে কারীবের নম্বরে কল দিয়েছে। রিঙ হচ্ছে। লাউড স্পিকার অন করে দিলো নূমা। তিন বার রিঙ হওয়ার পর নাযীর কল রিসিভ করলো। ঘুম জড়ানো কন্ঠে বলল, ‘কি রে বাইনচোত, আবার কল করছোত এত্তো রাইতে?’
কারীবের দিকে তাকালো নূমা। তাকানোর অর্থ, এই আপনার ফ্রেন্ড? কারীব জবাবে কিছু বলতে পারলো না। সে বিব্রতবোধ করলো। মোবাইল ফোনের দিকে তাকালো নূমা। বলল, ‘এক্সকিউজ মি, মাইন্ড ইউর ল্যাঙ্গুয়েজ!’
‘আরেহ্ শালারে!’ অপর প্রান্ত থেকে বলল নাযীর, ‘হালার পুতে এত্তো রাইতে মাইয়া লইয়া কী করতেছে, ফোনডা হ্যারে দেন তো!’
আবারো কারীবের দিকে তাকালো নূমা। কারীবের চেহারায় এবার আতঙ্ক ভর করেছে। এমনিতেই মহিলা ওকে নিয়ে যা করছে, এবার না জানি আরো কী করে! মনে মনে কারীব ভাবছে, কোনো শত্রুরও যেন এইরকম বন্ধু না হয়। নূমা আবার ফোনের দিকে তাকালো। ধমক দিয়ে বলল, ‘এই আপনাকে বললাম না, ল্যাঙ্গুয়েজ ঠিক করেন!’
এবার নাযীরের নরম কন্ঠ শোনা গেলো। বলল, ‘কে?’
নিজের পরিচয় দিলো নূমা। বলল, ‘আপনার হাতে আধাঘন্টা সময়। এর মধ্যে এসে ফ্রেন্ডকে ছাড়িয়ে নিয়ে যাবেন। তা না হলে, তাকে গ্রেফতার দেখিয়ে, আগামীকাল কোর্টে চালান করে দেবো।’
‘এক্সকিউজ মি, ম্যাম… হ্যালো…’
রেড বাটন চেপে নূমা কল কেটে দিলো। তাকালো কারীবের দিকে। বলল, ‘এই আপনার ফ্রেন্ড?’
‘জি ম্যাম… স্যরি… স্যার, এই আমার ফ্রেন্ড।’ বলল কারীব, ‘কল করে আমরা এমন গালাগালি করেই কথা শুরু করি। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের বন্ধুত্বের প্রমাণ পেয়ে যাবেন। দেখেন, সে এলো বলে!’
সত্যিই আসলো নাযীর। আধাঘন্টা অতিক্রান্ত হওয়ার আগেই সে আসলো। হন্তদন্ত হয়ে ঢুকলো নূমার কক্ষে। কোনো দিকে নজর নেই। বন্ধুকে দেখতে পেয়ে বলল, ‘কি রে দুস্ত, তুই এত্তো রাইতে থানায় ক্যান, তরে ধইরা আনছে কীলিগা, কী করছোত?’
নূমা সত্যিই মুগ্ধ হয়ে গেলো। বন্ধুর বিপদে রাত বেড়াতে যে ছুটে আসে সে-ই তো প্রকৃত বন্ধু। এই ছেলেও দেখতে বেশ সুদর্শন। ঘুম থেকে উঠে হয়তো চোখেমুখে পানিও দেয়নি। বন্ধুর বিপদের কথা শুনে ছুটে এসেছে। নাযীরের দৃষ্টি আকর্ষণ করলো নূমা। বলল, ‘এই যে হ্যালো, এদিকে কথা বলুন, এদিকে।’
এতক্ষণে নূমার দিকে খেয়াল করলো। অফিসারকে দেখে সে-ও মুগ্ধ হয়ে গেলো। কী সুন্দর পুতুলের মতো ফুটফুটে সুন্দরী একটা মেয়ে! এমন সুন্দরী একটা মেয়ে পুলিশ, আবার কর্কশভাবে কথা বলে। কেন, সুন্দরী মেয়ে- একটু মিষ্টি করে কথা বললে কী হয়! নাযীর অবশ্য কিছু বলল না। নূমা বলল, ‘আপনার ফ্রেন্ডকে যেখান থেকে নিয়ে এসেছি, সেটা আমার থানার আওতাধীন নয়। সুতরাং তাকে আমি গ্রেফতার দেখাতে পারি না।’
নূমার কাছ থেকে কথা প্রায় কেড়ে নিলো নাযীর। বলল, ‘আমার ফ্রেন্ড কী করেছে, ম্যাম? তাকে এভাবে… থানায়…’
এবার নাযীরের কথা কেড়ে নিলো নূমা। বলল, ‘কিছু করেনি। ইচ্ছে করেই আপনার ফ্রেন্ডকে আমি তুলে এনেছি।’ কারীবের দিকে তাকালো নূমা, ‘দিনকাল ইদানীং অনেক খারাপ যাচ্ছে। দূরের জার্নিতে গেলে, সময় মতো ফেরার চেষ্টা করবেন। রাত বেশি হলে পুলিশ এমন ঝামেলা করবেই। আপনারা যেতে পারেন।’
কোনো কথা বলল না কারীব, নাযীর দুজনেই। সুরসুর করে বের হয়ে যাচ্ছিলো ওরা। একেবারে দরজার কাছাকাছি গিয়ে নাযীর হঠাৎ দাঁড়ালো। নূমার দিকে ফিরলো। বলল, ‘ম্যাম, একটা কথা বলবো?’
‘হ্যাঁ, অবশ্যই।’
কারীবের দিকে একবার তাকালো। তারপর আবার তাকালো নূমার দিকে। বলল, ‘ম্যাম, আপনি খুব সুন্দর!’ ইঙ্গিত দেখালো কারীবকে, ‘আমার ফ্রেন্ডের মতোই!’
রূপের প্রশংসা শুনলে সব নারীই আহ্লাদে গদগদ হয়ে যায়। পুলিশের একজন উচ্চপদস্থ অফিসার হলেও, নূমা তো প্রথমে একজন উদ্ভিন্নযৌবনা নারী। রূপের প্রশংসায় সে-ও ভেতরে ভেতরে পুলকিত হলো। চেহারায় তা প্রকাশ হতে দিলো না। উল্টো চেহারায় রাগান্বিত হওয়ার একটা ছাপ ফুটিয়ে তুললো। গলা উঁচিয়ে প্রায় চিৎকার করে বলল, ‘এই, আশেপাশে কে আছো, এই দুইটাকে ধরে লকআপে ভরো।’
প্রায় সাথেই সাথেই চার পাঁচ জন কনস্টেবল ছুটে আসলো। সাথে থাকা বন্দুক তাক করলো নাযীর আর কারীবের দিকে। নাযীরের হাতটা ধরলো কারীব। নূমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘না না ম্যাম… স্যরি… স্যার, লকআপে ভরতে হবে না। আমরা চলে যাচ্ছি।’
কনস্টেবলরা সবাই নিজ অফিসারের দিকে তাকালো। নূমা বলল, ‘যেতে দাও।’
নাযীরকে প্রায় টানতে টানতে থানা থেকে বের করে নিয়ে আসলো কারীব। বলল, ‘শালা, আমারে ছাড়াইতে আইসা তো নিজেই ধরা খাইতেছিলি। সাহস তো কম না তর, পুলিশকে ইভ টিজিং করতে গেছোস!’
‘ইভ টিজিং আবার কেমতে হইলো?‘ বলল নাযীর, ‘যা সত্য তাই কইছি। পুলিশ হইছে বইলা কি, ছেড়ির যৌবন নাই?’
‘কী কথা যে কস্!’
‘ঠিকই কই। এই ছেড়ি তরে ধইরা আনছে কীলিগা বুঝতে পারছোস?’
‘বুঝিনাই। কী জন্য?’
‘বেডি তরে ধরছে, আমীন বাজার থিক্কা। নিয়া আইছে নিজের থানায়- হেইডা তো তার এখতিয়ার বহির্ভূত। সংশ্লিষ্ট থানায় হ্যান্ড ওভার না কইরা, তরে নিজ থানায় নিয়া আইছে। কীলিগা?’
‘কী জন্য?’
‘সংশ্লিষ্ট থানার কেউ যাতে তরে ডিস্টার্ব না করে, হের লাইগা লিফট দিয়া তরে নিজের লগে লইয়া আইছে। কারণ, প্রথম দেখায় বেডি তর প্রেমে পইড়া গেছে!’
‘এই যাহ্, কীসব ফালতু কথা কস্! পুলিশের লগে কে প্রেম করবো? চল, তাড়াতাড়ি ভাগি এইখান থিক্কা। তা না হইলে, আবার ধইরা লকআপে ভরবো!’
‘আমার কথার গুরুত্ব দিলি না, টের পাবি। পুলিশ বেডির নজরে পইড়া গেছোত, তর কপালে খারাপি আছে! ল, যাইগা!’
কারীবের বাইকটা ঠিকটাক করে, বাহিরে স্ট্যান্ড করে রাখা হয়েছে। বাইকে বসে সেল্ফ স্টার্ট বাটন চাপলো কারীব। একবার চাপতেই ইঞ্জিন স্টার্ট নিলো। কী একটা অদ্ভুত ব্যাপার হয়ে গেলো, বিনা পয়সায় বাইক তো ঠিকটাক করে নেয়া হলো, পাশাপাশি রাত বেড়াতে রাস্তায় দাঁড়িয়ে না থেকে, পুলিশের গাড়িতে লিফটও পাওয়া গেলো। অবশ্য, থানায় নিয়ে এসে অযথায় কিছুক্ষণ বসিয়ে রাখলো নূমা। বাসায় ফিরতে তাতে কিছুটা দেরি হলো। মাঝখান থেকে বন্ধু নাযীরকে কিছুটা হয়রানি করলো নূমা। কোনো অপরাধ নেই, কোনো অভিযোগ নেই, তারপরও সুন্দরী পুলিশ অফিসার ওকে থানায় ঘন্টার পর ঘন্টা বসিয়ে রাখলো। এই জন্যই হয়তো লোকে বলে, নারীর মন বোঝা বড় কষ্টকর।

পরবর্তী পর্বের জন্য অপেক্ষা করুন.......

পূর্ববর্তী পরিচ্ছেদ পড়ুন: পুলিশ গার্লফ্রেন্ড- প্রথম পরিচ্ছেদ


মন্তব্যসমূহ