দেশ নিয়ে ভাবনাচিন্তা বিলীন: ক্ষমতার উচ্ছিষ্টের অভিপ্রায়ে উন্মোচিত হচ্ছে রাজনৈতিক চরিত্র

ব্যাঙেরছাতা
দেশ নিয়ে ভাবনাচিন্তা বিলীন: ক্ষমতার উচ্ছিষ্টের অভিপ্রায়ে উন্মোচিত হচ্ছে রাজনৈতিক চরিত্র। ছবি - ব্যাঙেরছাতা


বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্র এখন এক জটিল গোলকধাঁধায় বন্দি। প্রতিদিন সকালে সংবাদপত্রের পাতায় যখন চোখ পড়ে, তখন উন্নয়নের খবরের চেয়ে বেশি প্রাধান্য পায় কোন দল কার সাথে জোট বাঁধল, কে কার হাত ছাড়ল, কিংবা ক্ষমতার সমীকরণে কে কার পিঠে ছুরি বসালো। সম্প্রতি দেশের প্রভাবশালী গণমাধ্যমগুলোতে প্রকাশিত সংবাদ—যেমন ইত্তেফাকের “দল-জোটে ভাঙাগড়ার খেলা” কিংবা বাংলাদেশ প্রতিদিনের “জোট নিয়ে এনসিপিতে ঝড়”—আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক নগ্ন রূপকে সামনে নিয়ে এসেছে। এই ভাঙাগড়ার খেলায় আজ যা সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত, তা হলো সাধারণ মানুষের ভাগ্য এবং দেশের দীর্ঘমেয়াদী ভবিষ্যৎ।

আদর্শের সমাধি ও সুবিধাবাদের নবযাত্রা

রাজনীতি একসময় ছিল ত্যাগের সমার্থক। ৫২-র ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে রাজনীতির মূল চালিকাশক্তি ছিল আদর্শ এবং দেশপ্রেম। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে এসে বাংলাদেশের রাজনীতি যেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পথে মোড় নিয়েছে। এখানে এখন ‘আদর্শ’ শব্দটির কোনো বাস্তব প্রয়োগ নেই। রাজনৈতিক দলগুলোর বর্তমান কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তাদের ইশতেহার কেবল লোকদেখানো একগুচ্ছ প্রতিশ্রুতি মাত্র।

যখন কোনো ছোট দল বা বড় দল কোনো জোটে যোগ দেয়, তখন তাদের প্রধান লক্ষ্য থাকে আগামী নির্বাচনে কয়টি আসন পাওয়া যাবে। এখানে আদর্শিক মিলের চেয়ে ‘গাণিতিক মিল’ বেশি প্রাধান্য পায়। ধরুন, একটি দল হয়তো কট্টর রক্ষণশীল আদর্শে বিশ্বাসী, অথচ তারা জোট করছে এমন এক দলের সাথে যারা সম্পূর্ণ উদারপন্থী। এই যে বৈপরীত্য, এটি স্পষ্ট করে দেয় যে তাদের লক্ষ্য জনকল্যাণ নয়, বরং ক্ষমতার মসনদ। এই সুবিধাবাদী রাজনীতি জনগণের মনে এক ধরণের তীব্র বিতৃষ্ণা তৈরি করছে, যা গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত।

জোট রাজনীতির অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা: এনসিপি ও সমসাময়িক প্রেক্ষাপট

সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে যে ‘এনসিপি’ বা জাতীয়তাবাদী জোটগুলোর কথা উঠে এসেছে, সেখানে ঝড় ওঠার মূল কারণটি কিন্তু দেশ সংস্কার বা জনগণের অধিকার আদায় নয়। বরং তা হলো নেতৃত্বের কর্তৃত্ব বজায় রাখা। জোটের ভেতরে যখন ভাঙন ধরে, তখন দেখা যায় মূল কারণটি হলো—কাকে কতটুকু প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।

এক পক্ষ মনে করছে তারা বঞ্চিত হচ্ছে, অন্য পক্ষ ভাবছে তাদের একচ্ছত্র ক্ষমতা খর্ব হচ্ছে। এই যে মনস্তাত্ত্বিক লড়াই, এটি দেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। কারণ, বিরোধী পক্ষ বা সরকারি পক্ষ যদি সারাক্ষণ নিজেদের ঘর সামলাতেই ব্যস্ত থাকে, তবে তারা দেশ পরিচালনা বা দেশ গঠনে মনোনিবেশ করবে কখন? এই যে “ভাঙাগড়ার খেলা”, এটি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে বিনষ্ট করছে এবং বিনিয়োগকারী থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিক সবার মধ্যেই অনিশ্চয়তার জন্ম দিচ্ছে।

ক্ষমতার অভিপ্রায়ে রাজনৈতিক চরিত্রের পরিবর্তন

একজন রাজনীতিবিদের মূল চরিত্র হওয়া উচিত জনসেবা। কিন্তু বর্তমানে রাজনৈতিক চরিত্রের এক অদ্ভুত বিবর্তন আমরা লক্ষ্য করছি। আজ যিনি এক দলের হয়ে তুখোড় বক্তৃতা দিচ্ছেন, কালই তিনি অন্য দলে যোগ দিয়ে পূর্বের দলের সমালোচনা করছেন। এই যে আদর্শের ডিগবাজি, এটি কোনোভাবেই সুস্থ রাজনীতির পরিচয় নয়।

রাজনীতি এখন আর নীতি-নির্ধারণী জায়গা নেই, বরং এটি পরিণত হয়েছে একটি লাভজনক পেশায়। দলবদল বা জোট পরিবর্তনের পেছনে অধিকাংশ সময়ই থাকে ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধা বা মামলার হাত থেকে বাঁচার আকুতি। যখন ক্ষমতার লোভ সত্যের চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়ায়, তখন দেশপ্রেম গৌণ হয়ে পড়ে। আজকের রাজনীতিতে ‘আমি’ শব্দটি ‘আমরা’ বা ‘দেশ’ শব্দের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।

জনবিচ্ছিন্ন রাজনীতি ও সাধারণ মানুষের হাহাকার

রাজনীতিবিদরা যখন জোট ভাঙাগড়ার খেলায় মত্ত, তখন দেশের সাধারণ মানুষের অবস্থা কী? দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে, বেকারত্বের অভিশাপে যুবসমাজ দিশেহারা, অথচ রাজনৈতিক আলোচনার মূল বিষয়বস্তু হলো—আগামী নির্বাচনে কে কার সাথে হাত মেলাবে।

রাজনীতি এখন জনগণের সমস্যা থেকে যোজন যোজন দূরে সরে গেছে। সাধারণ মানুষ চায় নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা এবং কর্মসংস্থান। কিন্তু রাজনৈতিক বিতর্ক ঘুরপাক খাচ্ছে নির্বাচন পদ্ধতি আর জোটের বিন্যাস নিয়ে। এই জনবিচ্ছিন্নতা একদিন রাজনৈতিক দলগুলোর জন্যই কাল হয়ে দাঁড়াবে। মানুষ যখন দেখবে তাদের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা তাদের জন্য কাজ না করে কেবল নিজের ক্ষমতার গদি রক্ষায় ব্যস্ত, তখন তারা রাজনীতির ওপর থেকেই আস্থা হারিয়ে ফেলবে।

নীতিনির্ধারণী শৃঙ্খল ও গণতান্ত্রিক সংকট

একটি সুস্থ গণতন্ত্রের জন্য শক্তিশালী বিরোধী দল এবং নীতিবান সরকার অপরিহার্য। কিন্তু ভাঙাগড়ার রাজনীতির কারণে দলগুলোর ভেতর কোনো স্থায়িত্ব নেই। আজ এক জোট শক্তিশালী তো কাল অন্য জোট। এর ফলে দেশে কোনো দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্ভব হয় না।

প্রতিটি নতুন জোট বা সরকার ক্ষমতায় এসে পূর্ববর্তী সরকারের ভালো কাজগুলোকেও নাকচ করে দেয় কেবল রাজনৈতিক বিদ্বেষের কারণে। ক্ষমতার এই অন্তহীন লড়াইয়ে প্রশাসনিক কাঠামো ভেঙে পড়ে। সরকারি কর্মকর্তারাও অনেক সময় দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েন, যা সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বড় বাধা। জোট রাজনীতির এই খেলা মূলত দেশের উন্নয়নের গতিকে মন্থর করে দিচ্ছে।

ডিজিটাল যুগের রাজনীতি ও অপপ্রচার

বর্তমান সময়ে এই রাজনৈতিক ভাঙাগড়ার খেলা কেবল রাজপথ বা বৈঠকেই সীমাবদ্ধ নেই, এটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়েছে। এক পক্ষ অন্য পক্ষকে আক্রমণ করছে, গুজব ছড়াচ্ছে এবং ব্যক্তিগত চরিত্রহনন করছে। রাজনৈতিক দলগুলোর আইটি সেল এখন জনগণের সমস্যা তুলে ধরার চেয়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে বেশি ব্যস্ত। ক্ষমতার এই লড়াইয়ে সত্য চাপা পড়ে যাচ্ছে মিথ্যার নিচে। এই যে চারিত্রিক অধঃপতন, এটি কেবল রাজনীতি নয়, পুরো সমাজ ব্যবস্থাকে কলুষিত করছে।

সংকট নিরসনের পথ ও তরুণ প্রজন্মের ভূমিকা

এই অন্ধকার থেকে উত্তরণের উপায় কী? এর একমাত্র সমাধান হতে পারে সুস্থ ও আদর্শিক রাজনীতির চর্চা। রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য স্পষ্টভাবে ঘোষণা করতে হবে এবং তা থেকে বিচ্যুত হওয়া যাবে না। জোট গঠনের ক্ষেত্রে কেবল আসন ভাগাভাগি নয়, বরং অভিন্ন কর্মসূচি থাকতে হবে।

সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করতে হবে তরুণ প্রজন্মকে। বর্তমানের মেধাবী তরুণরা রাজনীতিকে ঘৃণা করতে শুরু করেছে। এটি দেশের জন্য ভয়াবহ বিপদ। যদি শিক্ষিত ও নীতিবান তরুণরা রাজনীতিতে না আসে, তবে এই ভাঙাগড়ার খেলা চিরকাল চলতেই থাকবে। তরুণদের উচিত রাজনীতির এই পচা গলি থেকে দেশকে মুক্ত করে একটি মেধাভিত্তিক ও কর্মমুখী রাজনৈতিক ধারা তৈরি করা।

ভবিষ্যতের দায়বদ্ধতা

বাংলাদেশের রাজনীতি আজ এক ক্রান্তিলগ্ন অতিক্রম করছে। দল-জোটের এই গোলকধাঁধায় হারিয়ে যাচ্ছে সাধারণ মানুষের স্বপ্ন। আমাদের মনে রাখতে হবে, ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়, কিন্তু ইতিহাস ক্ষমাহীন। আজ যারা দেশ নিয়ে ভাবনাচিন্তা বাদ দিয়ে কেবল ক্ষমতার অভিপ্রায়ে নিজেদের রাজনৈতিক চরিত্র বিসর্জন দিচ্ছেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তাদের শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে না।

রাজনীতির মূল কেন্দ্রে দেশ এবং মানুষকে ফিরিয়ে আনা এখন সময়ের দাবি। যদি রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের সংশোধন না করে এবং এই সুবিধাবাদের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে না আসে, তবে ইতিহাস সাক্ষী আছে—এমন নেতৃত্ব অচিরেই ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হয়। দেশের মানুষ চায় শান্তি, চায় উন্নয়ন; আর এই উন্নয়নের পূর্বশর্ত হলো ক্ষমতার মোহ ত্যাগ করে প্রকৃত জনসেবায় আত্মনিয়োগ করা। রাজনীতি হোক মানুষের জন্য, কেবল গদির জন্য নয়।

কিংস পার্টি এনসিপির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে ব্যাঙেরছাতা ব্লগে পূর্বে প্রকাশিত আর্টিকেলটি পড়ুন:

প্রশাসনিক “পেশিশক্তি”র ছত্রছায়ায় গড়ে উঠা তারুণ্যের রাজনীতি বাংলাদেশে কতটুকু সফলতা পাবে?

আপনার মতামত বা প্রতিক্রিয়া কী তা কমেন্টে লিখে জানান। কমেন্ট বক্স সকলের জন্য উন্মুক্ত। 

মন্তব্যসমূহ