আদর্শিক দেউলিয়াত্ব বনাম ক্ষমতার মোহ: এনসিপি-জামায়াত জোটের ব্যবচ্ছেদ
![]() |
| আদর্শিক দেউলিয়াত্ব বনাম ক্ষমতার মোহ: এনসিপি-জামায়াত জোটের ব্যবচ্ছেদ। ছবি - ব্যাঙেরছাতা |
বাংলাদেশের রাজনীতিতে গত কয়েক দশকে আদর্শিক চ্যুতি একটি নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। কিন্তু চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে যখন 'নতুন ধারার রাজনীতি' এবং 'আদর্শিক সংস্কারের' স্লোগান দিয়ে তরুণদের নেতৃত্বে জাতীয় নাগরিক পার্টি (NCP)-র জন্ম হলো, তখন সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল আকাশচুম্বী। তবে আজ ২৮ ডিসেম্বর, ২০২৫ তারিখে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে ১০ দলীয় নির্বাচনী জোটে এনসিপি-র আনুষ্ঠানিক অংশগ্রহণ সেই প্রত্যাশার কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দিয়েছে। যে দলটির উত্থান হয়েছিল বৈষম্যহীন আর অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে, সেই দলটিই আজ ১৯৭১-এর যুদ্ধাপরাধী আর স্বাধীনতা বিরোধী অপশক্তি জামায়াতে ইসলামীর সাথে কাঁধে কাঁধ মেলাল। এটি কেবল একটি নির্বাচনী কৌশল নয়, বরং এটি একটি আদর্শিক পরাজয়।
ঐতিহ্যের বিসর্জন: জামায়াতের হাত ধরল 'নতুন প্রজন্ম'
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করা জামায়াতে ইসলামী আজ পর্যন্ত তাদের সেই ভূমিকার জন্য নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করেনি। বরং তারা কৌশলে বারবার ক্ষমতার অংশীদার হতে চেয়েছে। আজ বিকেলের সংবাদ সম্মেলনে জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান যখন এনসিপি-র সাথে জোটের ঘোষণা দিচ্ছিলেন, তখন দৃশ্যত মনে হচ্ছিল এটি একটি 'মজবুত নির্বাচনী সমঝোতা'। কিন্তু গভীরে তাকালে দেখা যায়, এটি স্রেফ আসন ভাগাভাগির এক নোংরা খেলা।
আরও পড়ুন:
দেশ নিয়ে ভাবনাচিন্তা বিলীন: ক্ষমতার উচ্ছিষ্টের অভিপ্রায়ে উন্মোচিত হচ্ছে রাজনৈতিক চরিত্র
এনসিপি দাবি করে তারা তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধিত্ব করে। অথচ সেই তরুণরাই জুলাই বিপ্লবে 'পুরানো সিস্টেম' ধ্বংসের স্লোগান দিয়েছিল। জামায়াতের সাথে জোটের মাধ্যমে এনসিপি কি সেই সিস্টেমেরই অংশ হয়ে গেল না? যে দলটি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের স্পর্শকাতর বিষয়গুলোতে বরাবরই নীরব বা উদাসীন, তাদের জন্য জামায়াতের মতো কট্টরপন্থী দলের সাথে হাত মেলানো হয়তো খুব একটা কঠিন ছিল না। কিন্তু প্রশ্ন হলো, দেশের সাধারণ মানুষের কাছে এর জবাবদিহি কী?
কিংস পার্টির স্বরূপ এবং প্রশাসনিক মদদ
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা শুরু থেকেই এনসিপি-কে একটি 'কিংস পার্টি' হিসেবে আখ্যায়িত করে আসছিলেন। কিংস পার্টি বলতে আমরা বুঝি এমন এক রাজনৈতিক শক্তি, যা জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থনে নয়, বরং প্রশাসনিক বা বিশেষ মহলের পেশিশক্তির ওপর ভর করে টিকে থাকে। এনসিপি-র ক্ষেত্রে এই সত্যটি আজ আরও স্পষ্ট। কোনো তৃণমূল ভিত্তি ছাড়াই তারা যেভাবে রাজনৈতিক চালচিত্রের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে চাইছে, তা মূলত প্রশাসনিক আশ্রয়েরই বহিঃপ্রকাশ।
জামায়াতের দীর্ঘদিনের ক্যাডার ভিত্তিক শক্তি আর এনসিপি-র প্রশাসনিক সুবিধা—এই দুইয়ের মিশেলে তৈরি এই জোট মূলত একটি 'সুবিধাবাদী চক্র'। এখানে কোনো আদর্শ নেই, নেই দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের কোনো অঙ্গীকার। আছে শুধু ক্ষমতায় টিকে থাকার এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা।
দলের অভ্যন্তরে বিস্ফোরণ: নৈতিকতার প্রশ্ন
এনসিপি-র এই জোট গঠন কোনোভাবেই নিরবচ্ছিন্ন ছিল না। জামায়াতের সাথে হাত মেলানোর এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে আজ সকালেই দলটির শীর্ষ নেতৃত্বে ধস নেমেছে। দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব তাসনিম জারা এবং যুগ্ম আহ্বায়ক তাজনূভা জাবীন অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে পদত্যাগ করেছেন। তারা সরাসরি অভিযোগ তুলেছেন যে, এই জোট কেবল কয়েকটি আসনের লোভে করা হয়েছে।
তাজনূভা জাবীনের ফেসবুক স্ট্যাটাসটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, এটি আদর্শের লড়াই নয়, এটি বিশ্বাসের সাথে প্রতারণা। ১২৫টি আসনে মনোনয়ন সংগ্রহের নাটক সাজিয়ে শেষ মুহূর্তে মাত্র ৩০টি আসনের সমঝোতায় জামায়াতের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে এনসিপি। এই যে 'মাইনাসের রাজনীতি' এবং তড়িঘড়ি করে জোট গঠন—এটি প্রমাণ করে যে এনসিপি একটি অগণতান্ত্রিক ও সিন্ডিকেট ভিত্তিক দলে পরিণত হয়েছে।
সামান্তা শারমিনের প্রতিবাদ এবং আদর্শিক দৈন্যতা
এনসিপি-র জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন যদিও পদত্যাগ করেননি, তবে তার বক্তব্যে এই জোটের নগ্ন রূপ ফুটে উঠেছে। তিনি আজ স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, "কতিপয় আসনের বিনিময়ে এনসিপি-র কিছু মানুষ দলের মূল আকাঙ্ক্ষা থেকে বিচ্যুত হয়েছে।" তার এই সাহসী উচ্চারণ প্রমাণ করে যে, দলের ভেতরেই নৈতিকতার বড় ধরনের সংকট চলছে।
তবে বিশ্লেষকগণ মনে করেন, সামান্তা শারমিনদের মতো নেতাদের এই ক্ষোভ কেবল 'ড্যামেজ কন্ট্রোল'-এর অংশ হতে পারে। কারণ যে দলের মূল নেতৃত্বে নাহিদ ইসলাম-এর মতো ব্যক্তিরা রয়েছেন, তাদের সম্মতি ছাড়া এত বড় একটি জোট হওয়া অসম্ভব। ফলে এটি স্পষ্ট যে, এনসিপি-র আদর্শ কেবল মুখের কথা, কাজের ক্ষেত্রে তারা চূড়ান্ত সুবিধাবাদী।
স্বাধীনতার চেতনা বনাম রাজনৈতিক উদাসীনতা
বাংলাদেশের স্বাধীনতার লড়াই নিয়ে এনসিপি-র কোনো আবেগ কিংবা অনুভূতির কোনো প্রকাশ কখনো দেখা যায়নি। তাদের রাজনীতিতে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ একটি 'বাই-প্রোডাক্ট' মাত্র। এই উদাসীনতাই তাদের জামায়াতের মতো একটি দলের সাথে জোটবদ্ধ হতে প্ররোচিত করেছে। জামায়াত যেখানে প্রকাশ্যে বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধ মনোভাব পোষণ করে, সেখানে এনসিপি-র মতো একটি দলের তাদের সাথে মিত্রতা করা মূলত শহীদের রক্তের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা।
সমালোচকদের মতে, এনসিপি মূলত একটি 'ডি-পলিটিসাইজড' প্রজন্ম তৈরি করতে চায়, যাদের কাছে জাতীয় পরিচয় বা স্বাধীনতার চেতনার চেয়ে 'কৌশলগত সুবিধা' অনেক বড়। এই ধরনের রাজনীতি দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য এক বড় হুমকি।
সামাজিক ফ্যাসিজম ও উগ্রবাদের পুনরুত্থান
এনসিপি-জামায়াত জোট কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং এটি একটি সামাজিক সংকটেরও সূচনা করছে। জামায়াত ও তাদের ছাত্র সংগঠন শিবিরের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে যে তারা জুলাই অভ্যুত্থানের স্পিরিট ব্যবহার করে ভিন্নমতাবলম্বীদের চরিত্রহনন করছে। বিশেষ করে এনসিপি-র নারী নেত্রীদের ওপর অনলাইনে যে ধরনের আক্রমণ চালানো হয়েছে, তাতে জামায়াতের উগ্র মানসিকতাই প্রকাশ পায়। অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো, সেই আক্রমণের শিকার নেত্রীদের দলই আজ আক্রমণকারীদের সাথে নির্বাচনী চুক্তিতে সই করেছে। এটি এক ধরনের 'স্টকহোম সিনড্রোম', যেখানে নির্যাতিত ব্যক্তি তার নির্যাতনকারীর প্রতিই টান অনুভব করে।
মধ্যপন্থী রাজনীতির মৃত্যু
এনসিপি যখন গত ২৮ ফেব্রুয়ারি আত্মপ্রকাশ করে, তখন তারা নিজেদের 'মধ্যপন্থী' রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে দাবি করেছিল। কিন্তু আজকের পর সেই দাবি সম্পূর্ণ অসার। উগ্র ধর্মভিত্তিক রাজনীতির ধারক জামায়াতের সাথে জোটবদ্ধ হওয়ার পর তাদের 'মধ্যপন্থা' এখন চরমপন্থার ছায়াতলে বিলীন। এর ফলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে তৃতীয় শক্তির যে সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল, তা শুরুতেই অঙ্কুরে বিনষ্ট হলো।
ভোটারদের প্রত্যাখ্যান এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
আগামী ফেব্রুয়ারিতে নির্ধারিত নির্বাচনে সাধারণ ভোটাররা এই জোটকে কীভাবে নেবে, তা দেখার বিষয়। তবে তরুণ ভোটার যারা 'নতুন বাংলাদেশ'-এর স্বপ্নে বিভোর ছিল, তাদের কাছে এনসিপি এখন একটি পরিত্যক্ত নাম। আদর্শ বিসর্জন দিয়ে কেবল কৌশল দিয়ে নির্বাচনে জেতা গেলেও মানুষের মন জেতা যায় না। এনসিপি-র এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত তাদের রাজনৈতিক মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করবে বলেই বিশ্লেষকদের ধারণা।
রাজনীতিতে কৌশল অনিবার্য, কিন্তু সেই কৌশল যখন আদর্শকে গিলে ফেলে, তখন তা বিষে পরিণত হয়। এনসিপি ও জামায়াতের এই জোট মূলত এক অন্ধকারাচ্ছন্ন রাজনীতির স্মারক। যে দলটি তরুণের শক্তিতে বলীয়ান হওয়ার কথা ছিল, তারা আজ প্রশাসনিক পেশিশক্তি আর স্বাধীনতা বিরোধীদের সহযাত্রী। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এটি একটি কালো দিন হিসেবেই চিহ্নিত থাকবে। এই সুবিধাবাদী জোট কি শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের বৈতরণী পার হতে পারবে? নাকি সময়ের আবর্তে ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হবে? উত্তর হয়তো খুব শীঘ্রই পাওয়া যাবে, তবে এনসিপি-র ওপর থেকে মানুষের বিশ্বাসের যে চ্যুতি ঘটল, তা পূরণ হওয়া অসম্ভব।
কিংস পার্টি এনসিপির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে ব্যাঙেরছাতা ব্লগে পূর্বে প্রকাশিত আর্টিকেলটি পড়ুন:
প্রশাসনিক “পেশিশক্তি”র ছত্রছায়ায় গড়ে উঠা তারুণ্যের রাজনীতি বাংলাদেশে কতটুকু সফলতা পাবে?
আপনার মতামত বা প্রতিক্রিয়া কী তা কমেন্টে লিখে জানান। কমেন্ট বক্স সকলের জন্য উন্মুক্ত।

মন্তব্যসমূহ