পুলিশ গার্লফ্রেন্ড- রোমান্টিক প্রেমের গল্প: সপ্তম পরিচ্ছেদ



নিজের একান্ত ব্যক্তিগত কিছু জিনিসপত্র কিনতে একদিন বের হলো নূমা। থানাতেই ছিল তখন। ওর কোনো ছুটি নেই। চব্বিশ ঘন্টার ডিউটি। এখন কিছুটা চাপ কম। পুলিশের কাজের চাপ কখনো কম থাকে না। বাংলাদেশ পুলিশের চাপ কম থাকার তো প্রশ্নই আসে না। এই দেশে যে কত ধরনের অপরাধ আর কতো ধরনের অপরাধী, পুলিশে চাকুরী করতে না আসলে নূমার তা জানা হতো না। প্রতিনিয়ত নতুন নতুন অপরাধের আইডিয়া বের করে অপরাধীরা। পুলিশেরও তাই আরাম আয়েশ করার ফুরসত নেই। এর মাঝেও নিজের জন্য কিছুটা সময় বের করতে হয়। নূমাও নিজের কিছু কেনাকাটা করার জন্য কিছুটা সময় বের করে নিলো। ডিউটি অফিসারের কাছে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে বের হলো সে।
থানা থেকে বের হয়ে প্রথমে বাসায় আসলো নূমা। ইউনিফর্ম পালটিয়ে নরমাল থ্রি-পিস পরলো সে। ইউনিফর্ম পরে কেনাকাটা করতে গিয়েও খুব বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয় ওকে। পুলিশ দেখলেই দোকানদারেরা সব ভয় পায়। ভাবে, টাকা না দিয়েই হয়তো জিনিসপত্র নিয়ে চলে যাবে। নরমাল পোশাক পরে বের হলে স্বাভাবিকভাবে কেউ ওকে চিনতে পারে না। শপিং মলে গিয়ে সে স্বাচ্ছন্দ্যে কেনাকাটা করতে পারে। পোশাকে নরমাল থাকলেও সে অলটাইম অন ডিউটিতেই থাকে। 
বাসা থেকে বের হয়ে, সিএনজি অটোরিকশাতে করে বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্সে আসলো নূমা। প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করলো। এক শো-রুম থেকে আরেক শো-রুমে ঘুরলো। একটা শো-রুম থেকে বের হয়ে, কী মনে করে দাঁড়ালো সে। বাম দিকে প্রায় পঞ্চাশ গজের মতো দূরে আরেকটা শো-রুমের দিকে তাকালো। শো-রুমটাতে মেল ফিমেল উভয়েরই পোশাক আশাক পাওয়া যায়। সেই জন্য অবশ্য নূমা সেদিকে তাকায়নি। তাকিয়েছে কারীবের জন্য। ঐ শো-রুমে ঢুকলো কারীব- সাথে সেই মেয়েটা- যে মেয়েটা সেই রাতে কারীবের বাইকের পেছনে বসে ছিল। 
সাক্ষাৎ না হলে ছেলেটার প্রতি কোনো গুরুত্বই থাকতো না নূমার, ওর দিকে দৃষ্টিও আকৃষ্ট হতো না। ইতিমধ্যেই ওর সাথে দুই বার সাক্ষাৎ হয়েছে। আজ তৃতীয় বারের মতো সাক্ষাৎ তো করা যেতেই পারে। সাথের মেয়েটাও নূমার কিছুটা আগ্রহের কারণ। মেয়েটাকে নূমার কাছে সুন্দর লাগে না। কতো সুন্দর একটা ছেলে, ওরকম একটা মেয়েকে নিয়ে কেন ঘুরছে? নূমার মতো সুন্দরী কোনো মেয়েকে নিয়ে ঘুরবে। মেয়েটার সাথে ওর সম্পর্ক কী, নূমার জানার খুব আগ্রহ হলো। সেই শো-রুমের দিকে পা বাড়ালো নূমা।
ভেতরে ঢুকলে, এক সেলসম্যান অভ্যর্থনা জানালো নূমাকে। হাসিমুখে সে বলল, ‘আসুন, ম্যাম। বলুন কিভাবে সহযোগিতা করতে পারি। আমাদের এখানে সবচেয়ে লেটেস্ট স্টাইলের ফ্যাশনেবল ওয়্যার পাবেন।’
জবাবে নূমা বলল, ‘দেখি।’
‘হ্যাঁ, শিউর, ম্যাম। প্লিজ।’
শো-রুমটা বিশাল আয়তনের। চারপাশে দৃষ্টি চালিয়ে, নূমা মূলত কারীবকে খুঁজলো? মালটা গেলো কোথায়? হ্যাঁ, ওকে দেখতে পেলো নূমা। ভেতরের দিকে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে পোশাক আশাক দেখছে। এখনো নূমাকে খেয়াল করেনি। খেয়াল যখন করলো, তখন কেন যেন ওর মধ্যে ভরকে যাওয়ার মতো একটা ভাব প্রকাশ পেলো। নূমার দিকে কয়েক মুহুর্ত তাকিয়ে থাকলো। পরক্ষণেই দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে, আড়ালে চলে গেলো। যতই আড়ালে যাও বাছাধন, আজ সিভিলে এসে তোমাকে পেয়েছি। সহজে ছাড়ছি না- মনে মনে বললো নূমা। 
পোশাক-আশাক দেখতে দেখতে সামনের দিকে এগুলো নূমা। কারীব যেদিকে আড়াল হয়েছে, সেদিকেই গেলো। সে-ও কারীবের দিকের আড়ালে ঢুকে পড়লো। কারীব সামনেই দাঁড়িয়ে আছে। আশেপাশে মেয়েটাকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। নূমা এগিয়ে গিয়ে একেবারে কারীবের পাশাপাশি দাঁড়ালো। হ্যাঙ্গারে ঝুলিয়ে রাখা কাপড় চোপর নেড়ে-চেড়ে দেখতে লাগলো। কারীবের উদ্দেশ্যে বলল, ‘কী ব্যাপার, আমাকে দেখে আপনি পালাচ্ছেন কেন? পুলিশ দেখে কিন্তু চোরেরা পালায়!’
জবাবে কারীব বলল, ‘আমি কোনো চোর না, ওকে? আর আপাকে দেখে আমি পালাবো কিসের জন্য?’
‘পালাচ্ছিলেন না?’
‘একদমই না।’
‘তাহলে আমাকে দেখে আপনি ভরকে গেলেন কেন, আর আড়ালেই বা আসলেন কেন?’
‘ভরকেও যাইনি আর আড়ালেও আসিনি। আমি মূলত, পুলিশের ঝামেলা থেকে দূরে থাকতে চাই।’
‘এই তো, আসল লাইনে চলে এসেছেন!’
‘আসল লাইনে চলে এসেছি মান?’
‘এই যে, পুলিশের ঝামেলা থেকে যারা দূরে থাকতে চায়, তারায় তো চোর!’
‘আপনি এখানে এসেও পুলিশি প্যাঁচের মধ্যে ফেলতে চাইছেন?’
এবার স্ব-শব্দে হাসলো নূমা। বলল, ‘না না, একদমই তেমন কিছু না। সেই রাতে বাইকের পেছনে দেখলাম। আজ আবার দুজন একসাথে শপিংয়ে- মেয়েটা কে, ওয়াইফ?’
‘কী বলছেন, ওয়াইফ হতে যাবে কেন? আমি আনম্যারেড!’
‘নিশ্চয় তাহলে গার্লফ্রেন্ড?’
‘আপনার ধারণা ভুল। সে আমার গার্লফ্রেন্ডও না।’
‘ওয়াইফও না, গার্লফ্রেন্ডও না- তাহলে তাকে বাইকের পেছনে নিয়ে, আবার শপিং মলে এসে ঘুরাঘুরি কেন?’
এবার কারীব হাসলো। আয়েশাকে নিয়ে কারীবের প্রতি নূমার এতো আগ্রহ কেন, তা সত্যিই কারীবের বোধগম্য হলো না। আজ নিয়ে নূমার সাথে কারীবের তৃতীয় সাক্ষাৎ। বন্ধু নাযীরের কথা কি সত্যি হতে যাচ্ছে নাকি? নূমা কি তাহলে কারীবের প্রেমে পড়ে গেছে! তাহলে তো সর্বনাশের মাথায় বারি! প্রথম সাক্ষাতে নূমা ওকে যা জ্বালানো জ্বালিয়েছে, প্রেমে পড়লে তো কারীবের জীবনটাকে সে তামাতামা করে ফেলবে। নিজেকে সাবধান করতে হলো কারীবের। নূমা আকর্ষণীয় রকমের সুন্দরী- তা ঠিক আছে। কিন্তু সে পুলিশ। পুলিশ কন্যার কাছ থেকে যতটা দূরে থাকা যায়, ততই ভালো। 
কারীবের হাসি দেখে নূমা বলল, ‘হাসছেন কেন?’
‘মেয়েটা আমার ভাতিজার হোম টিউটর। সেদিন ভাতিজাকে পড়িয়ে ফিরতে রাত হয়েছিল, ভাবী বললো ওকে হোস্টেলে পৌঁছে দিতে।’ বলল কারীব, ‘আজো ভাবীই আমাকে ওর সাথে পাঠিয়েছে। গ্রামের বসবাস করা মেয়ে, ঢাকায় এসেছে। এখনো ঠিকটাক মতো সবকিছু চিনে উঠতে পারেনি।’
‘ভাবী আবার কি ছেলের হোম টিউটরকে পার্মানেন্ট করে নিতে চাইছে নাকি?’
নূমার এই কথাটার মানে কারীব ঠিক বুঝতে পারলো। কিন্তু কথাটার মানে সরাসরি নূমার কাছেই জানতে চাইলো। বলল, ‘আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না।’
‘বলছিলাম যে, আপনার ভাবী বারবার মেয়েটার সাথে আপনাকে পাঠিয়ে দিচ্ছে, মেয়েটাকে কি ভাবী জা বানাতে চাইছে নাকি?’
এই কথাটায় শুনতে চাইছিল কারীব। সে বলল, ‘সেই সম্ভাবনা একেবারেই নাই।‘
‘কিভাবে বুঝলেন সম্ভাবনা নাই?’
‘ভাতিজার হোম টিউটরের পাশাপাশি মেয়েটার সাথে ভাবীর আত্মীয়তার সম্পর্ক আছে, সে ভাবীর দূর সম্পর্কের ভাইয়ের মেয়ে।’ বলল কারীব, ‘তাছাড়া, আত্মীয়তার মধ্যে নতুন সম্পর্ক গড়ার আগ্রহ আমারো নাই।’
‘গুড। আপনি এই মেয়েটাকে নিয়ে আর যেখানে সেখানে ঘুরে বেড়াবেন না!’
‘কোনো সমস্যা?‘
‘আমার কোনো সমস্যা না।’ বলল নূমা, ‘আপনার কোনো আগ্রহ নাই তাই বললাম। এভাবে ঘুরে বেড়ালে, আগ্রহ তৈরি হয়ে। তাছাড়া, মেয়েটা তেমন সুন্দরী না!’
‘কী বলছেন, এতো সুন্দর একটা মেয়ে!’
কারীবের সাথে কথা বলছে আর হ্যাঙ্গারে সাজিয়ে রাখা ড্রেসগুলো নেড়েচেড়ে দেখছে নূমা। কারীবের দিকে এবার সে কিছুটা বাঁকা দৃষ্টিতে তাকালো। কারীব সেই দৃষ্টি খেয়াল করলো না। আবার ড্রেস দেখতে লাগলো নূমা। বলল, ‘আপনার রুচি কোন লেভেলের বলেন তো? এই মেয়েকে সুন্দরী বলছেন? আপনি দেখতে হ্যান্ডসাম, লম্বাচওড়া একটা ছেলে। আপনার মেয়ে সঙ্গী হওয়ার দরকার…’ একটু থামলো নূমা। নিজের দীঘল কালো চুলের উপর হাত বুলালো। বলল, ‘... অত্যন্ত সুন্দরী একটা মেয়ে, যে লম্বায় অন্তত আপনার কানের গোড়া পর্যন্ত হবে!’
কারীব নিশ্চিত, এই পুলিশ গার্ল কারীবের প্রেমেই পড়ে গেছে। নূমা একেবারে ওর কাছাকাছিই দাঁড়িয়ে আছে। সে খেয়াল করলো, নূমা লম্বায় একেবারে কারীবের কান পর্যন্ত। মেয়েরা কারো প্রেমে পড়লে, সেটা কখনোই সরাসরি প্রকাশ করে না। আসলে করতে পারে না। তাদের বুক ফেটে যায় কিন্তু মুখ ফোটে না। প্রেমে পড়ার বিষয়টা তারা বিভিন্ন ইঙ্গিতে প্রকাশ করতে চায়। নূমার যে লম্বায় অন্তত আপনার কানের গোড়া পর্যন্ত হবে- এই কথাটা কারীবের প্রেমে পড়ার একটা ইঙ্গিত হতে পারে। যদি তেমন কিছু হয় তাহলে কারীবের সর্বনাশের শেষ থাকবে না। এমনিতে অবশ্য নূমাকে নিয়ে কারীবের কোনো সমস্যা নাই। অপরূপা সুন্দরী মেয়ে। যে কোনো ছেলেকে আকৃষ্ট করার মতো লোভনীয় দেহসৌষ্ঠবের অধিকারীনি। উদ্ভিন্নযৌবনা। ওকে নিয়ে কারীবের সমস্যাটা হলো, নূমা একজন পুলিশ। যতো সুন্দরীই হোক সে, পুলিশের সাথে কোনো ভাবেই কোনো রিলেশন করতে চায় না সে। অবশ্য, নূমা যে কারীবের প্রেমে পড়েই গেছে, তেমন কিছু নিশ্চিত করে বলা যায় না। কারীবের ভাবনা সঠিক না-ও হতে পারে। মেয়েরা যে কী উদ্দেশ্যে কী ইঙ্গিত দেয়, তা হয়তো তারা নিজেরাও বুঝতে পারে না। 
 
পরবর্তী পর্বের জন্য অপেক্ষা করুন...

পূর্ববর্তী পরিচ্ছেদ পড়ুন: পুলিশ গার্লফ্রেন্ড- প্রথম পরিচ্ছেদ

                               পুলিশ গার্লফ্রেন্ড- দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ 

                               পুলিশ গার্লফ্রেন্ড- তৃতীয় পরিচ্ছেদ

                               পুলিশ গার্লফ্রেন্ড- চতুর্থ পরিচ্ছেদ 

                               পুলিশ গার্লফ্রেন্ড- পঞ্চম পরিচ্ছেদ 

                               পুলিশ গার্লফ্রেন্ড- ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ  

 

মন্তব্যসমূহ