পুলিশ গার্লফ্রেন্ড- রোমান্টিক প্রেমের গল্প: অষ্টম পরিচ্ছেদ
পুলিশ গার্লফ্রেন্ড
(রোমান্টিক প্রেমের গল্প)
অষ্টম পরিচ্ছেদ
নওরোজ বিপুল
(রোমান্টিক প্রেমের গল্প)
অষ্টম পরিচ্ছেদ
নওরোজ বিপুল
}{}{}{}{}{}{}{}{}{}{}{}{}{}{}{}{}{}{}{}{}{}{}{}{}{}{}{
মেয়েকে স্কুলে দিয়ে এগারোটার পর বাসায় ফিরলো আসমিনা। সে আর্নিকে স্কুলে দিয়ে আসে। ছুটির সময় কারীব গিয়ে নিয়ে আসে। আর্নিকে পছন্দের স্মার্ট ওয়াচটা কিনে দিয়েছে কারীব। সাথে একটা ব্লুটুথ ডিভাইসও কিনে দিয়েছে। ওয়াচের সাথে ডিভাইস কানেক্ট করে, এই ঘর থেকে ঐ ঘরে চাচা-ভাতিজি কথা বলে। আর্নি তাতে মহা মহা খুশি।
ছেলে জ্যোতিকে স্কুলে আনা-নেয়া করতে হয় না। সে নিজেই যাওয়া-আসা করে। মেয়েকে স্কুলে দিয়ে ফিরে এলে, কারীবই দরজা খুলে দিলো। এই সময় কারীব বাসাতেই থাকে। বাসায় বসে বসে নিজের কাজ করে। সে দরজা খুলে দিলে আসমিনা ভেতরে আসলো। বলল, ‘কোনো খবর শুনছিস?’
মেয়ের স্কুল থেকে ফিরে আসার সময়, আসমিনা প্রতিদিন নতুন কোনো না কোনো একটা খবর নিয়েই আসে। কারীব তাই অলস ভঙ্গিতে জানতে চাইলো, ‘শুনিনি। বলো, কী খবর শোনাবে?’
‘সোসাইটির জি-ব্লক এ্যাপার্টমেন্টে, সৌমিতা নামে যে একটা মেয়ে থাকে, চিনিস?’
‘হ্যাঁ, চিনি তো। বাহিরে যাওয়া-আসার সময় গেটে দুই একবার দেখাও হয়েছিল। কথাও হয়েছে দুই একবার। সে আবার কী করেছে?’
‘মেয়েটা গত রাতে সুইসাইড করেছে! পুলিশ এসে পুরো সোসাইটি ঘিরে রেখেছে।’
‘কী বলো, ছোট একটা মেয়ে। সবেমাত্র অনার্সে ভর্তি হয়েছিল বলে শুনেছি। এতো ছোট একটা মেয়ে…’
‘ছোট বলেই তো সমস্যা রে, ভাই। কী যে সমস্যা এই বয়সী মেয়েদের! আমরাও ঐ বয়সটা পার করে এসেছি। আমাদের তো কখনো কোনো সমস্যা হয়নি।’
কারীব দরজার দিকে এগুলো। আসমিনা ভেতরে এসে দরজা আটকিয়ে দিয়েছিল। দরজা খুলতে হাতলটা ধরলো কারীব।
আসমিনা বলল, ‘এই দাঁড়া, তুই কোথায় যাইতেছিস?’
‘ব্যাপারটা একটু ভালো করে জেনে আসি।’
‘কোনো দরকার নাই।’ হাত তুলে কারীবের ঘর দেখালো আসমিনা, ‘যা, নিজের ঘরে গিয়ে ঢোক।’
‘আরেহ্ ভাবী, তুমি চিন্তা করো না তো!’ বলল কারীব। ততক্ষণে দরজা খুলেছে সে, ‘আমি ব্যাপারটা জেনেই চলে আসবো।’
‘কথা শুনলে তো হতোই!’ বলল আসমিনা, ‘ঐ এ্যাপার্টমেন্টের দিকে একদম যাবি না। দূর থেকে দেখে চলে আসবি।’
‘আচ্ছা, দূর থেকেই দেখে চলে আসবো।’
বের হয়ে দরজা টেনে দিলো কারীব। নিচে চলে আসলো। ওদের এ্যাপার্টমেন্ট বি-ব্লক। সোসাইটির ভেতরে অনেকগুলো এ্যাপার্টমেন্ট আছে। কোন এ্যাপার্টমেন্টের কোন ফ্ল্যাটে, কখন কী ঘটনা ঘটছে, সোসাইটিতে বসবাসকারী কেউই সেই সবের কোনো খবর রাখে না। জি-ব্লকের একটা এ্যাপার্টমেন্টে আজ সুইসাইডের মতো ঘটনা ঘটেছে। পুলিশকে পুরো সোসাইটি ঘিরে থাকতে দেখতে পেলো কারীব। জি-ব্লক ওদের এ্যাপার্টমেন্টে থেকে কিছুটা দূরে। পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করছে কারীব। একপা দুইপা করে এগুচ্ছে এদিক থেকে ওদিক।
কিছুদূর গিয়েই কারীব দাঁড়িয়ে গেলো। সামনে আর এগুলো না। জি-ব্লকের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে নূমা। নিজের অফিসার আর কনস্টেবলদেরকে কী কী সব নির্দেশনা দিচ্ছে। সুন্দরী পুলিশ আইটেম গার্লকে দেখে, কারীব ভেবেছিল, যতদূর পর্যন্ত এসেছে, এখান থেকেই ফিরে যাবে। ফিরে যাওয়ার জন্য ঘুরেও দাঁড়িয়েছে কিন্তু যাওয়ার জন্য পা বাড়াতে পারলো না। পেছন থেকে নূমা ওকে ডাকলো, ‘এই এই এই দাঁড়ান, দাঁড়ান!’
কারীব দাঁড়িয়েই ছিল। নূমাকে ডাকতে শুনে ঘুরলো। নূমা বলল, ‘এইদিকে আসেন।’
ইতস্তত করতে করতে নূমার কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়ালো কারীব। আজ কিছুটা সেজেগুজে বের হয়েছে নূমা। ঠোঁটে লিপইষ্টিকের গাঢ় প্রলেপ। চোখে চিকন করে দেয়া কাজল। পুরো মুখমণ্ডলে মেকাপের হালকা প্রলেপ। মেয়েরা গৃহিনী হোক কিংবা পুলিশ- সাজুগুজু তারা করবেই। মেয়েদের এটা প্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্য। নূমা এমনিতেই অনেক সুন্দরী একটা মেয়ে। সাজুগুজু করে ওকে আরো বেশি সুন্দর লাগছে। নূমা খেয়াল করলো, কারীব ওর বুকের দিকে তাকাচ্ছে। অজান্তেই ওর হাতটা, ইউনিফর্মের কলারে উঠলো। উপরের একটা বোতাম খোলা। কলালের দুই প্রান্ত টেনে একত্র করার চেষ্টা করলো। বলল, ‘এখানে কী করছেন আপনি?’
‘আমি আবার এখানে কী করবো?‘ পালটা প্রশ্ন করলো কারীব, ‘আমার বাসা এখানে?’
‘এখানে বাসা? কোন এ্যাপার্টমেন্টে?’
‘ব্লক-বি।’
‘কোন ফ্ল্যাট?’
‘নাইন বাই টু।’
পকেট থেকে ছোট্ট নোটবুকটা বের করলো নূমা। কারীবের এ্যাড্রেস ইনফরমেশন নোট করে রাখলো। ওদিকে চারজন নারী কনস্টেবল‘ লাশ বহনকারী একটা ব্যাগের চারপ্রান্ত ধরে নিয়ে বের হলো। স্বাভাবিকভাবেই ব্যাগের ভেতর সৌমিতা নামের মেয়েটার ডেডবডি আছে। ফুটফুটে সুন্দরী একটা মেয়ে। কয়েক দিন মেয়েটার সাথে কথা হলো। কারীব আসছিল, সৌমিতা সোসাইটি থেকে বের হচ্ছিলো। গেটে দেখা হয় দুজনের। বেশ হেসেহেসে কারীবের সাথে কথা বলছিল মেয়েটা। অথচ পুলিশ এসে আজই মেয়েটার ডেডবডি বের করে নিয়ে যাচ্ছে। কারীব লাশ বাহী ব্যাগটার দিকেই তাকিয়ে ছিল।
নূমা ওর দৃষ্টি আকর্ষণ করলো। জানতে চাইলো, ‘চিনতেন মেয়েটাকে?’
‘পরিচয় ছিল।’
‘নিশ্চয় এতক্ষণে জেনেছেন, মেয়েটা সুইসাইড করেছে?’
‘কিছুক্ষণ আগে শুনলাম। কোনো কারণ কি জানতে পেরেছেন, ম্যাম… স্যরি…স্যার…?’
নূমাকে ম্যাম সম্বোধন করে, স্যরি বলে আবার স্যার সম্বোধন করে কারীব। সাক্ষাতের প্রথম দিন থেকেই ব্যাপারটা খেয়াল করছে নূমা। সে স্পষ্ট বুঝতে পারে, কারীব এটা নূমার সাথে শয়তানি করেই করে। সে কারীবের প্রশ্নের জবাবে বলল, ‘বাপ-মা‘কে জিজ্ঞাসাবাদ করে জানলাম, কোনো এক ছেলের রিলেশন ছিল। প্রেগন্যান্ট হয়ে পড়েছিল। তাতে বাপ-মা দুজনেই মেয়েটাকে বকাবকি আর মারধর করেছে। মেয়েটা ব্যাপারটা নিতে না পেরে সুইসাইড করেছে।’
কারীব বেশি কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাতে গেলো না। কোন প্রতিক্রিয়া দেখাতে গিয়ে, নূমা আবার কিসের মধ্যে ফাঁসিয়ে দেয়, কে জানে? শুধু একটা শব্দ উচ্চারণ কলো, ‘ওহ্!’
‘মেয়েটার বাবা-মা, ছেলেটার নাম বলতে পারেননি। মেয়েটাও নাম বলেনি। আমরা ছেলেটাকেই খুঁজছি।’ বলল নূমা, ‘সেই ছেলে আবার আপনি না তো?’
কারীব জানতো, নূমা এই রকম একটা প্যাঁচ মারবে। সেই জন্যই ওকে দেখা মাত্রই সরে পড়তে চেয়েছিল। কিন্তু ওর নজরে কারীব ঠিকই পড়ে গেছে। নূমার প্রশ্নের জবাবে সে বলল, ‘কী উল্টাপাল্টা কথা বলছেন, আমি সেই ছেলে হতে যাবো কেন? মেয়েটার সাথে আমার শুধু হাই হ্যালো ধরনের পরিচয় ছিল।’
‘মেয়েটা অল্প বয়সী সুন্দরী। একই সোসাইটির বাসিন্দা আপনারা, অনেক কিছু তো ঘটেও থাকতে পারে।’ শোল্ডার বেল্টের সাথে ছোট্ট নোটবুকটা গুঁজে রেখেছিল নূমা। সেটা টেনে নিলো। কলম হাতেই ছিল। নোটবুকটা খুললো। বলল, ‘আপনার মোবাইল ফোন নম্বরটা বলেন।’
এই সেরেছে! নম্বর নিয়ে নূমা আবার কী করে কে জানে? কারীব বলল, ‘আমার নম্বর নিয়ে আপনি কী করবেন?’
‘কোনো তথ্যের প্রয়োজন হলে, আপনাকে পিবিআই হেড কোয়ার্টারে ডাকবো।’
‘পিবিআই?’
‘হ্যাঁ, আমার বর্তমান পোষ্টিং পিবিআই হেড কোয়ার্টারে। এই সুইসাইডের তদন্তের দায়িত্ব আমাকে দেয়া হয়েছে।’
‘কিন্তু আমাকে এই সবের মধ্যে কেন জড়াচ্ছেন?’
কারীবের প্রশ্নের কোনো জবাব দিলো না নূমা। বলল, ‘সেই রাতের মতো আজো কি থানায় তুলে নিয়ে যাবো?’
‘মাথা খারাপ নাকি, একদম না।’
‘তাহলে নম্বরটা বলেন।’
‘প্লীজ ম্যাম… স্যরি… স্যার… ছাড়ুন না, আমাকে কেন এই ঘটনার সাথে জড়াতে চাইছেন?’ বলল কারীব, ‘এখানে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।’
নূমা বুঝতে পারছে, নম্বর চাওয়াতে কারীব খুব ভয় পেয়ে গেছে। নূমা ভয়টা কাটিয়ে দিলো না। বলল, ‘নম্বরটা বলতে বলেছি। না, বললেই বরং আপনি বেশি ঝামেলায় পড়বেন।’
কারীব বুঝতে পারলো, এই মেয়ে ওর নম্বর না নিয়ে ছাড়বে না। নম্বর দিতে কারীব কেন ভয় পাচ্ছে? সৌমিতার সাথে তো ওর কোথায় সম্পর্কই নাই। নম্বর হয়তো নূমা নিয়ে রাখবে। সৌমিতার সম্পর্কে ওর কিছু জানা আছে কি না, তা জানতে হয়তো নূমা ওকে ডাকতে পারে। প্রয়োজন না হলে না-ও ডাকতে পারে। বেশি আর কিছু না ভেবে, মোবাইল ফোন নম্বর বলে দিলো কারীব। নূমা নোট করে রাখলো। বলল, ‘তদন্তের প্রয়োজনে আপনাকে আমি ডাকতে পারি। কল করে কখনো যদি মোবাইল ফোন বন্ধ পাই, তাহলে এসে গ্রেফতার করে নিয়ে যাবো। আর আমাকে না জানিয়ে ঢাকার বাহিরে কোথাও যাবেন না।’
‘এটা কেমন কথা হলো, যাওয়ার সময় আপনাকে কোথায় পাবো যে, বলে যাবো?’
‘আপনার কথায় যুক্তি আছে, আমার নম্বর নেন।’ নিজের নম্বর বলল নূমা। নম্বর মোবাইল ফোনে সেইভ করলো কারীব। নূমা বলল, ‘কোথাও যাওয়ার প্রয়োজন হলে, আমাকে কল করে, পারমিশন নিয়ে তারপর যাবেন।’
নূমা আর অপেক্ষা করলো না। গাড়ির দিকে পা বাড়ালো। পেছন দিক থেকে কারীব একেবারেই খেয়াল করতে পারলো না, নূমার ঠোঁটে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠেছে। অন্য কেউ খেয়াল করার আগেই, হাসিটা সে আবার মিলিয়ে নিলো। গাড়িতে এসে বসলো। ড্রাইভার গাড়ি ছেলে দিলো।
চলতে চলতে নূমা মনে মনে ভাবলো, কিছুটা ভয় পেলেও, অন্যান্য ছেলের তুলনায় এই ছেলের ভেতর কিছুটা হলেও সাহস আছে। ছেলেরা যেখানে নূমার দিকে তাকাতেই ভয় পায়, সেখানে এই ছেলে সামনে দাঁড়িয়ে, বারবার নূমার বুকের দিকে তাকাচ্ছে। এই ব্যাপারটায় খুব ভালো লেগেছে নূমার। এমন একটা লুকানো সাহসী ছেলেই তো এতদিন খুঁজেছে সে। পাশাপাশি ছেলেটার ভেতর অনেক বোকামিও আছে। কেমন কৌশলে ওর মোবাইল ফোন নম্বরটা নূমা নিয়ে নিলো, পাশাপাশি নিজের নম্বরটাও দিলো, তা কারীব বুঝতেই পারলো না। প্রথম সাক্ষাতের সময়েই ওর নম্বর, ঠিকানা লিখে রাখা উচিৎ ছিল নূমার। তা করার সুযোগ হয়নি। আজ নম্বর যখন পাওয়া গেছে, তখন ছেলেটাকে ফাঁসানোর মিশনটা এবার নূমাকে শুরু করতে হবে।
ছেলে জ্যোতিকে স্কুলে আনা-নেয়া করতে হয় না। সে নিজেই যাওয়া-আসা করে। মেয়েকে স্কুলে দিয়ে ফিরে এলে, কারীবই দরজা খুলে দিলো। এই সময় কারীব বাসাতেই থাকে। বাসায় বসে বসে নিজের কাজ করে। সে দরজা খুলে দিলে আসমিনা ভেতরে আসলো। বলল, ‘কোনো খবর শুনছিস?’
মেয়ের স্কুল থেকে ফিরে আসার সময়, আসমিনা প্রতিদিন নতুন কোনো না কোনো একটা খবর নিয়েই আসে। কারীব তাই অলস ভঙ্গিতে জানতে চাইলো, ‘শুনিনি। বলো, কী খবর শোনাবে?’
‘সোসাইটির জি-ব্লক এ্যাপার্টমেন্টে, সৌমিতা নামে যে একটা মেয়ে থাকে, চিনিস?’
‘হ্যাঁ, চিনি তো। বাহিরে যাওয়া-আসার সময় গেটে দুই একবার দেখাও হয়েছিল। কথাও হয়েছে দুই একবার। সে আবার কী করেছে?’
‘মেয়েটা গত রাতে সুইসাইড করেছে! পুলিশ এসে পুরো সোসাইটি ঘিরে রেখেছে।’
‘কী বলো, ছোট একটা মেয়ে। সবেমাত্র অনার্সে ভর্তি হয়েছিল বলে শুনেছি। এতো ছোট একটা মেয়ে…’
‘ছোট বলেই তো সমস্যা রে, ভাই। কী যে সমস্যা এই বয়সী মেয়েদের! আমরাও ঐ বয়সটা পার করে এসেছি। আমাদের তো কখনো কোনো সমস্যা হয়নি।’
কারীব দরজার দিকে এগুলো। আসমিনা ভেতরে এসে দরজা আটকিয়ে দিয়েছিল। দরজা খুলতে হাতলটা ধরলো কারীব।
আসমিনা বলল, ‘এই দাঁড়া, তুই কোথায় যাইতেছিস?’
‘ব্যাপারটা একটু ভালো করে জেনে আসি।’
‘কোনো দরকার নাই।’ হাত তুলে কারীবের ঘর দেখালো আসমিনা, ‘যা, নিজের ঘরে গিয়ে ঢোক।’
‘আরেহ্ ভাবী, তুমি চিন্তা করো না তো!’ বলল কারীব। ততক্ষণে দরজা খুলেছে সে, ‘আমি ব্যাপারটা জেনেই চলে আসবো।’
‘কথা শুনলে তো হতোই!’ বলল আসমিনা, ‘ঐ এ্যাপার্টমেন্টের দিকে একদম যাবি না। দূর থেকে দেখে চলে আসবি।’
‘আচ্ছা, দূর থেকেই দেখে চলে আসবো।’
বের হয়ে দরজা টেনে দিলো কারীব। নিচে চলে আসলো। ওদের এ্যাপার্টমেন্ট বি-ব্লক। সোসাইটির ভেতরে অনেকগুলো এ্যাপার্টমেন্ট আছে। কোন এ্যাপার্টমেন্টের কোন ফ্ল্যাটে, কখন কী ঘটনা ঘটছে, সোসাইটিতে বসবাসকারী কেউই সেই সবের কোনো খবর রাখে না। জি-ব্লকের একটা এ্যাপার্টমেন্টে আজ সুইসাইডের মতো ঘটনা ঘটেছে। পুলিশকে পুরো সোসাইটি ঘিরে থাকতে দেখতে পেলো কারীব। জি-ব্লক ওদের এ্যাপার্টমেন্টে থেকে কিছুটা দূরে। পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করছে কারীব। একপা দুইপা করে এগুচ্ছে এদিক থেকে ওদিক।
কিছুদূর গিয়েই কারীব দাঁড়িয়ে গেলো। সামনে আর এগুলো না। জি-ব্লকের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে নূমা। নিজের অফিসার আর কনস্টেবলদেরকে কী কী সব নির্দেশনা দিচ্ছে। সুন্দরী পুলিশ আইটেম গার্লকে দেখে, কারীব ভেবেছিল, যতদূর পর্যন্ত এসেছে, এখান থেকেই ফিরে যাবে। ফিরে যাওয়ার জন্য ঘুরেও দাঁড়িয়েছে কিন্তু যাওয়ার জন্য পা বাড়াতে পারলো না। পেছন থেকে নূমা ওকে ডাকলো, ‘এই এই এই দাঁড়ান, দাঁড়ান!’
কারীব দাঁড়িয়েই ছিল। নূমাকে ডাকতে শুনে ঘুরলো। নূমা বলল, ‘এইদিকে আসেন।’
ইতস্তত করতে করতে নূমার কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়ালো কারীব। আজ কিছুটা সেজেগুজে বের হয়েছে নূমা। ঠোঁটে লিপইষ্টিকের গাঢ় প্রলেপ। চোখে চিকন করে দেয়া কাজল। পুরো মুখমণ্ডলে মেকাপের হালকা প্রলেপ। মেয়েরা গৃহিনী হোক কিংবা পুলিশ- সাজুগুজু তারা করবেই। মেয়েদের এটা প্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্য। নূমা এমনিতেই অনেক সুন্দরী একটা মেয়ে। সাজুগুজু করে ওকে আরো বেশি সুন্দর লাগছে। নূমা খেয়াল করলো, কারীব ওর বুকের দিকে তাকাচ্ছে। অজান্তেই ওর হাতটা, ইউনিফর্মের কলারে উঠলো। উপরের একটা বোতাম খোলা। কলালের দুই প্রান্ত টেনে একত্র করার চেষ্টা করলো। বলল, ‘এখানে কী করছেন আপনি?’
‘আমি আবার এখানে কী করবো?‘ পালটা প্রশ্ন করলো কারীব, ‘আমার বাসা এখানে?’
‘এখানে বাসা? কোন এ্যাপার্টমেন্টে?’
‘ব্লক-বি।’
‘কোন ফ্ল্যাট?’
‘নাইন বাই টু।’
পকেট থেকে ছোট্ট নোটবুকটা বের করলো নূমা। কারীবের এ্যাড্রেস ইনফরমেশন নোট করে রাখলো। ওদিকে চারজন নারী কনস্টেবল‘ লাশ বহনকারী একটা ব্যাগের চারপ্রান্ত ধরে নিয়ে বের হলো। স্বাভাবিকভাবেই ব্যাগের ভেতর সৌমিতা নামের মেয়েটার ডেডবডি আছে। ফুটফুটে সুন্দরী একটা মেয়ে। কয়েক দিন মেয়েটার সাথে কথা হলো। কারীব আসছিল, সৌমিতা সোসাইটি থেকে বের হচ্ছিলো। গেটে দেখা হয় দুজনের। বেশ হেসেহেসে কারীবের সাথে কথা বলছিল মেয়েটা। অথচ পুলিশ এসে আজই মেয়েটার ডেডবডি বের করে নিয়ে যাচ্ছে। কারীব লাশ বাহী ব্যাগটার দিকেই তাকিয়ে ছিল।
নূমা ওর দৃষ্টি আকর্ষণ করলো। জানতে চাইলো, ‘চিনতেন মেয়েটাকে?’
‘পরিচয় ছিল।’
‘নিশ্চয় এতক্ষণে জেনেছেন, মেয়েটা সুইসাইড করেছে?’
‘কিছুক্ষণ আগে শুনলাম। কোনো কারণ কি জানতে পেরেছেন, ম্যাম… স্যরি…স্যার…?’
নূমাকে ম্যাম সম্বোধন করে, স্যরি বলে আবার স্যার সম্বোধন করে কারীব। সাক্ষাতের প্রথম দিন থেকেই ব্যাপারটা খেয়াল করছে নূমা। সে স্পষ্ট বুঝতে পারে, কারীব এটা নূমার সাথে শয়তানি করেই করে। সে কারীবের প্রশ্নের জবাবে বলল, ‘বাপ-মা‘কে জিজ্ঞাসাবাদ করে জানলাম, কোনো এক ছেলের রিলেশন ছিল। প্রেগন্যান্ট হয়ে পড়েছিল। তাতে বাপ-মা দুজনেই মেয়েটাকে বকাবকি আর মারধর করেছে। মেয়েটা ব্যাপারটা নিতে না পেরে সুইসাইড করেছে।’
কারীব বেশি কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাতে গেলো না। কোন প্রতিক্রিয়া দেখাতে গিয়ে, নূমা আবার কিসের মধ্যে ফাঁসিয়ে দেয়, কে জানে? শুধু একটা শব্দ উচ্চারণ কলো, ‘ওহ্!’
‘মেয়েটার বাবা-মা, ছেলেটার নাম বলতে পারেননি। মেয়েটাও নাম বলেনি। আমরা ছেলেটাকেই খুঁজছি।’ বলল নূমা, ‘সেই ছেলে আবার আপনি না তো?’
কারীব জানতো, নূমা এই রকম একটা প্যাঁচ মারবে। সেই জন্যই ওকে দেখা মাত্রই সরে পড়তে চেয়েছিল। কিন্তু ওর নজরে কারীব ঠিকই পড়ে গেছে। নূমার প্রশ্নের জবাবে সে বলল, ‘কী উল্টাপাল্টা কথা বলছেন, আমি সেই ছেলে হতে যাবো কেন? মেয়েটার সাথে আমার শুধু হাই হ্যালো ধরনের পরিচয় ছিল।’
‘মেয়েটা অল্প বয়সী সুন্দরী। একই সোসাইটির বাসিন্দা আপনারা, অনেক কিছু তো ঘটেও থাকতে পারে।’ শোল্ডার বেল্টের সাথে ছোট্ট নোটবুকটা গুঁজে রেখেছিল নূমা। সেটা টেনে নিলো। কলম হাতেই ছিল। নোটবুকটা খুললো। বলল, ‘আপনার মোবাইল ফোন নম্বরটা বলেন।’
এই সেরেছে! নম্বর নিয়ে নূমা আবার কী করে কে জানে? কারীব বলল, ‘আমার নম্বর নিয়ে আপনি কী করবেন?’
‘কোনো তথ্যের প্রয়োজন হলে, আপনাকে পিবিআই হেড কোয়ার্টারে ডাকবো।’
‘পিবিআই?’
‘হ্যাঁ, আমার বর্তমান পোষ্টিং পিবিআই হেড কোয়ার্টারে। এই সুইসাইডের তদন্তের দায়িত্ব আমাকে দেয়া হয়েছে।’
‘কিন্তু আমাকে এই সবের মধ্যে কেন জড়াচ্ছেন?’
কারীবের প্রশ্নের কোনো জবাব দিলো না নূমা। বলল, ‘সেই রাতের মতো আজো কি থানায় তুলে নিয়ে যাবো?’
‘মাথা খারাপ নাকি, একদম না।’
‘তাহলে নম্বরটা বলেন।’
‘প্লীজ ম্যাম… স্যরি… স্যার… ছাড়ুন না, আমাকে কেন এই ঘটনার সাথে জড়াতে চাইছেন?’ বলল কারীব, ‘এখানে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।’
নূমা বুঝতে পারছে, নম্বর চাওয়াতে কারীব খুব ভয় পেয়ে গেছে। নূমা ভয়টা কাটিয়ে দিলো না। বলল, ‘নম্বরটা বলতে বলেছি। না, বললেই বরং আপনি বেশি ঝামেলায় পড়বেন।’
কারীব বুঝতে পারলো, এই মেয়ে ওর নম্বর না নিয়ে ছাড়বে না। নম্বর দিতে কারীব কেন ভয় পাচ্ছে? সৌমিতার সাথে তো ওর কোথায় সম্পর্কই নাই। নম্বর হয়তো নূমা নিয়ে রাখবে। সৌমিতার সম্পর্কে ওর কিছু জানা আছে কি না, তা জানতে হয়তো নূমা ওকে ডাকতে পারে। প্রয়োজন না হলে না-ও ডাকতে পারে। বেশি আর কিছু না ভেবে, মোবাইল ফোন নম্বর বলে দিলো কারীব। নূমা নোট করে রাখলো। বলল, ‘তদন্তের প্রয়োজনে আপনাকে আমি ডাকতে পারি। কল করে কখনো যদি মোবাইল ফোন বন্ধ পাই, তাহলে এসে গ্রেফতার করে নিয়ে যাবো। আর আমাকে না জানিয়ে ঢাকার বাহিরে কোথাও যাবেন না।’
‘এটা কেমন কথা হলো, যাওয়ার সময় আপনাকে কোথায় পাবো যে, বলে যাবো?’
‘আপনার কথায় যুক্তি আছে, আমার নম্বর নেন।’ নিজের নম্বর বলল নূমা। নম্বর মোবাইল ফোনে সেইভ করলো কারীব। নূমা বলল, ‘কোথাও যাওয়ার প্রয়োজন হলে, আমাকে কল করে, পারমিশন নিয়ে তারপর যাবেন।’
নূমা আর অপেক্ষা করলো না। গাড়ির দিকে পা বাড়ালো। পেছন দিক থেকে কারীব একেবারেই খেয়াল করতে পারলো না, নূমার ঠোঁটে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠেছে। অন্য কেউ খেয়াল করার আগেই, হাসিটা সে আবার মিলিয়ে নিলো। গাড়িতে এসে বসলো। ড্রাইভার গাড়ি ছেলে দিলো।
চলতে চলতে নূমা মনে মনে ভাবলো, কিছুটা ভয় পেলেও, অন্যান্য ছেলের তুলনায় এই ছেলের ভেতর কিছুটা হলেও সাহস আছে। ছেলেরা যেখানে নূমার দিকে তাকাতেই ভয় পায়, সেখানে এই ছেলে সামনে দাঁড়িয়ে, বারবার নূমার বুকের দিকে তাকাচ্ছে। এই ব্যাপারটায় খুব ভালো লেগেছে নূমার। এমন একটা লুকানো সাহসী ছেলেই তো এতদিন খুঁজেছে সে। পাশাপাশি ছেলেটার ভেতর অনেক বোকামিও আছে। কেমন কৌশলে ওর মোবাইল ফোন নম্বরটা নূমা নিয়ে নিলো, পাশাপাশি নিজের নম্বরটাও দিলো, তা কারীব বুঝতেই পারলো না। প্রথম সাক্ষাতের সময়েই ওর নম্বর, ঠিকানা লিখে রাখা উচিৎ ছিল নূমার। তা করার সুযোগ হয়নি। আজ নম্বর যখন পাওয়া গেছে, তখন ছেলেটাকে ফাঁসানোর মিশনটা এবার নূমাকে শুরু করতে হবে।
পরবর্তী পর্বের জন্য অপেক্ষা করুন...
পূর্ববর্তী পরিচ্ছেদ পড়ুন: পুলিশ গার্লফ্রেন্ড- প্রথম পরিচ্ছেদ
পুলিশ গার্লফ্রেন্ড- দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
পুলিশ গার্লফ্রেন্ড- তৃতীয় পরিচ্ছেদ
পুলিশ গার্লফ্রেন্ড- চতুর্থ পরিচ্ছেদ
পুলিশ গার্লফ্রেন্ড- পঞ্চম পরিচ্ছেদ
পুলিশ গার্লফ্রেন্ড- ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ
পুলিশ গার্লফ্রেন্ড- সপ্তম পরিচ্ছেদ

মন্তব্যসমূহ